ইংল্যান্ডের মহারানি ভিক্টোরিয়ার (১৮৭৬-১৯০১) স্মৃতিতে কলকাতার ময়দান এলাকায় ১৯০৬ সাল থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে গড়ে উঠেছিল শ্বেতশুভ্র ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।

রানি ভিক্টোরিয়া।
শেষ আপডেট: 25 October 2025 16:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইংল্যান্ডের মহারানি ভিক্টোরিয়ার (১৮৭৬-১৯০১) স্মৃতিতে কলকাতার ময়দান এলাকায় ১৯০৬ সাল থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে গড়ে উঠেছিল শ্বেতশুভ্র ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। যা এখনও কলকাতার অন্যতম গর্ব। কিন্তু, কজন জানেন রানি ভিক্টোরিয়া ছিলেন একসময় গোটা পৃথিবীর মাদক সাম্রাজ্যেরও সাম্রাজ্ঞী! যদি প্রশ্ন করা হয়, এই গ্রহে মাদক ব্যবসায় সর্বকালের কুখ্যাত কিংপিন কে? অনেকেই হয়তো ভাববেন পাবলো এসকোবার অথবা এল চাপোর নাম। কিন্তু, সেটা ঠিক নয়। এইসব লোকের জন্মেরও ১০০ বছর আগে, এক ভয়ানক শক্তিশালী মহিলা ছিলেন। যিনি প্রভাব-প্রতিপত্তি দিয়ে ড্রাগ ব্যবসাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, এইসব এসকোবার বা চাপোর মতো কুখ্যাতদেরও কারবার তাঁর সামনে গলির ডিলারের সমতুল ঠেকবে।
তিনি কোনও নির্জন জঙ্গল ঘেরা এলাকায় বন্দুকধারী প্রহরীবেষ্টিত অবস্থায় লুকিয়ে থাকতেন না। কারণ কেউ তাঁর সামনে, ধারেকাছে আসত না। এমনকী তাঁর অসাধু উপায়ে রোজগার রাজস্ব দিতেও লাগত না। কারণ, তিনি তাঁর রোজগারে টাকায় গোটা দেশ চলত। তিনি হলেন রানি ভিক্টোরিয়া, ইংল্যান্ডের সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতিপত্তিশালী সাম্রাজ্ঞী। ভিক্টোরিয়া নিজেও নানান মাদকের অনুরাগী ছিলেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে রাজদণ্ড হাতে আসার পর থেকেই নিয়মিত মাদক সেবন করতেন।
ভিক্টোরিয়ার প্রিয় নেশা ছিল আফিমের। কিন্তু তিনি তা পাইপে করে টানতেন না। উনিশ শতকের ব্রিটেনে আফিমের আরক পান করাটাই ছিল দস্তুর। এইভাবে নেশা করলে খুব দ্রুত ব্যথা-বেদনা ও হতাশা মুক্তি ঘটত। রোজ সকালে রানি ভিক্টোরিয়া বেশ খানিকটা আফিম এইভাবেই সেবন করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, রাজকীয় কৈশোরকালের দিন শুরু করার আভিজাত্যই ছিল এটা।
রানি ভিক্টোরিয়ার আরেকটি প্রিয় ছিল-কোকেন। সেই আমলে একেবারে নতুন এবং অবৈধও নয়। ইউরোপীয়রা সদ্য এই নেশা করতে শিখছে। ভিক্টোরিয়া কোকেনের চুয়িং গাম চিবোতেন। এতে দাঁত ও মাড়ির যন্ত্রণা নিমেষে উধাও হতো এবং বিদ্যুৎগতিতে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলত। ভিক্টোরিয়া তাঁর ডাক্তারের পরামর্শে ভাংও পান করতেন। এতে তাঁর রজঃস্বলা দশায় উপশম হতো। এমনকী ক্লোরোফর্মের নেশাও ছিল তাঁর। একটি ভিজে রুমালে সামান্য ক্লোরোফর্ম মিশিয়ে তিনি প্রায় ৫৩ মিনিট মুখ ঢাকা দিয়ে রাখতেন। নিজেই বলেছেন, এই মুহূর্তটি কল্পনারও অতীত। “Queen Victoria, I think by any standard, she loved her drugs” বইতে একথা লিখেছেন ঐতিহাসিক-লেখক টোনি ম্যাকমোহন।
১৮৩৭ সালে সিংহাসনে বসার পর তিনি লক্ষ্য করেন, ব্রিটিশরা প্রচণ্ড চা-পান করে। কিন্তু সেটা সমস্যার নয়, সমস্যা হল এই চা আমদানি করা হয় চিন থেকে। গড়পরতা ব্রিটিশ পরিবার আয়ের ৫ শতাংশ ব্যয় করে চিনা চা কিনতে। এতে চিন বড়লোক হয়ে যাচ্ছে এবং ব্রিটেনের কড়ি খসে যাচ্ছে। ব্রিটিশরা তখন ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় নামতে শুরু করে আফিম ব্যবসা। কারণ ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতে তখন প্রচুর জমিতে আফিম চাষ হয়। অত্যন্ত কার্যকরী ব্যথানাশক হওয়ার ফলে চিন বেশি দাম দিয়ে হলেও ইংল্যান্ডের থেকে আফিম কিনতে থাকে।
রাতারাতি চিনের সঙ্গে বাণিজ্য বৈষম্য দূর হয়ে যায়। ভিক্টোরিয়ার আমলেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বার্ষিক রাজস্বের প্রায় ১৫-২০ শতাংশই আসতে থাকে আফিম রফতানি থেকে। ভিক্টোরিয়ার যখন ২০ বছর বয়স, তখন আড়াই মিলিয়ন পাউন্ডের আফিম ভর্তি একটি জাহাজ সমুদ্রে ডুবিয়ে দেয় চিন। তাতেই রেগে গিয়ে রানি ভিক্টোরিয়া চিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেন। ইতিহাসে একেই প্রথম আফিম যুদ্ধ বলে মানা হয়। ব্রিটিশ রাজশক্তির আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় চিন। চিনের রাজতন্ত্র এই অবস্থায় ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে একপেশে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয় এবং আফিম রফতানির আরও দরজা খুলে দেওয়া হয়।
এইভাবে চিনের মতো একটি প্রাচীন সভ্যতাকে সদ্য তরুণী রানি হাঁটু মুড়ে বসতে বাধ্য করে গোটা পৃথিবীতে মাদক ব্যবসা ফলাও করে ছড়িয়েছিলেন। ভিক্টোরিয়া ভারত থেকে উৎপন্ন আফিম বেচে ফয়দা তুললেও কোকেনে কাউকে হাত দিতে দেননি। টাইম পত্রিকায় প্রকাশিত স্যাম কেলির লেখা- ‘Human History On Drugs: An Utterly Scandalous but Entirely Truthful Look at History Under the Influence' বইয়ের অংশ বিশেষে রয়েছে, রানি ভিক্টোরিয়া বিশ্বাস করতেন, কোকেন তেমন মারাত্মক ক্ষতিকর নয়। চিন কেন কাউকেই কোকেন বেচতে রাজি হননি রানি। শুধু আফিমেই বুঁদ করে রেখেছিলেন গোটা দুনিয়ার মাদক সাম্রাজ্যকে।