ভারতের হিন্দু কবি রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি এদেশে গাওয়ার অর্থ দেশদ্রোহিতা।

হিন্দুত্বের ধ্বজা উচ্চে তুলে রাখতে এই হুমকিকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশজুড়ে ঘৃণা ছড়িয়েছে সমগ্র দলের উপর।
শেষ আপডেট: 5 November 2025 15:36
এদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গাওয়া এখন ‘অপরাধ’! কারণ কী? কারণ, সেই গান অধুনা ‘শত্রুদেশ’ বা সোজাসাপটা বলা ভাল, মুসলিম অধ্যুষিত দেশ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বলে। অতএব, ভারতের হিন্দু কবি রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি এদেশে গাওয়ার অর্থ দেশদ্রোহিতা। অসমের স্বঘোষিত ‘নীতি-পুলিশ’ হিমন্ত বিশ্বশ্বর্মার মত অন্তত তাই। অথচ, ‘তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত’ বিশ্বশর্মার মতো মানুষের এমনটা করা উচিত ছিল না। কিন্তু, দুর্দৈবের ফলে কংগ্রেস ছেড়ে তিনি এখন মুসলিম বিদ্বেষী দলের অসমের সর্বাধিনায়ক। তাই রাজ্যে হিন্দুত্বের ধ্বজা উচ্চে তুলে রাখতে তাঁর এই হুমকিকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশজুড়ে ঘৃণা ছড়িয়েছে সমগ্র দলের উপর।
আর সে কারণেই সম্ভবত আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি গানটি এখন বাঙালির মুখে মুখে ঘুরছে। রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির প্রাণের সঙ্গে বাঁধা। আগেকার আকাশবাণী-দূরদর্শনের যুগে প্রায় প্রতিদিনই সকাল-সন্ধেয় শোনা যেত রবীন্দ্রসঙ্গীত। সুচিত্রা মিত্রর কণ্ঠে এই গানটির জনপ্রিয়তা এখনও তুঙ্গে। কিন্তু, একটি রাজনৈতিক বিতর্ক এখন গানটিকে রাতারাতি ভাইরাল করে দিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি লিখেছিলেন একটি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে। আর তা হল, অবিভক্ত বাংলার মর্যাদা-সম্মানকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া যাবে না। ঠিক যেমনটি এবারেও আপামর বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছে সেই একই প্রতিবাদে। সোনার বাংলার যে ছবি রবীন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন, তা সমগ্র বাংলাদেশকে নিয়ে। যাকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে চেয়েছিল ইংরেজ। সেই সময় যেমন বাঙালির অন্তরে ঘা দিয়েছিল সাহেবরা। আজকের দিনেও তেমনই বাঙালিরা এই গান নিয়ে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। ঘরে ঘরে, রাস্তায় রাস্তায় বাজছে আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি। কারণ, একমাত্র বাঙালিই পারে আমার প্রতিবাদের ভাষা, আমার প্রতিরোধের আগুনকে গানের সুরে ঝরিয়ে দিতে।
আর সেকারণেই রবীন্দ্রনাথের বহু পুরনো একটি গান এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্সে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথের গানের কেশাগ্র স্পর্শ করাটা একমাত্র ঘাতকের কাজ। তাই কোনও রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে নয়, সাধারণ বাঙালি সোনার বাংলা গানটি বাজিয়ে বাজিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। যাঁরা ভাল করে কোনওদিন শোনেননি গানটি, তাঁরাও আজ অন্তত প্রথম দু কলি গেয়ে রিল করছেন। কেউ বা গানটি এমনি বাজিয়ে পোস্ট করে দিচ্ছেন।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তার কিছুকাল আগে লেখা হয়েছিল, পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদার রবীন্দ্রনাথের দেখা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি। সুরও ছিল সংগৃহীত। শিলাইদহের ডাকঘরের ডাকহরকরা গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ বাউল গানের সুর লাগিয়েছিলেন এই গানে। এসব ইতিহাস এখন বেশিরভাগ মানুষেরই জানা। পরে এই গানটিকেই মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত করেন। যা নিয়ে এতকাল গর্ব করতাম আমরাও।
এদেশে যদি এখনও ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা’ গানের ধুন বাজাতে বাজাতে মিলিটারি ব্যান্ড যেতে পারে, তাহলে হিমন্তের মনে সোনার বাংলা নিয়ে ‘বিষবেদনা’ কেন?
এই গানটির কবি ইকবাল তো ভারতভাগের সময় পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। এবং মহম্মদ আলি জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের অন্যতম আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন। পাকিস্তান সরকার তাঁকে জাতীয় কবির স্বীকৃতি দিয়েছিল। ১৯৪৫ সালে পণ্ডিত রবিশঙ্করকে অনুরোধ করা হয় ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’-য় সুরারোপ করার জন্য। পরবর্তীতে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয় গানটি। পুনের ইয়েরাওয়াদা জেলে থাকাকালীন গান্ধীজি একশো বারের বেশি গাইতেন ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’। ১৯৮৪ সালে ভারতের প্রথম মহাকাশচারী রাকেশ শর্মাকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, মহাশূন্য থেকে ভারতের সৌন্দর্য সম্পর্কে, তখন গানের ভাষাতেই দিয়েছিলেন তাঁর উত্তর।
আমার সোনার বাংলা গানটি গাওয়ায় অসমের ৭৪ বছর বয়সি কংগ্রেস কর্মী বিধুভূষণ দাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এর প্রতিবাদ জানিয়েছে কংগ্রেস ও তৃণমূল দুই দলই। শুধু নীরব রয়ে গিয়েছে সিপিএম। এখনও সেভাবে প্রতিবাদে মাঠে নামেনি কমিউনিস্ট দল। প্রশ্ন উঠেছে, এ রাজ্যে বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচার বা রাজনৈতিক প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের গলায় 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি' শোনা গিয়েছে বহুবার। তাহলে এই গান কেন হঠাৎ করে হিমন্ত-নজরে (পড়ুন বিষ-নজরে) পড়ল?
রবীন্দ্রনাথের এই গানই এখন হয়ে উঠেছে আপামর বাঙালির প্রতিবাদের হাতিয়ার। সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই গান। বিভিন্ন জায়গায় প্রগতিশীল মানুষ, রবীন্দ্রভক্তরা এই গান গেয়ে মিছিল করে বেড়াচ্ছেন। যে গান একদিন হিন্দু-মুসলমান বিভেদের বিরুদ্ধে বজ্র হয়ে দেখা দিয়েছিল, সেভাবেই আজ এই গান রবীন্দ্র-বিরোধী তথা স্বাজাত্যবোধ বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে এক অনন্য স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, কবিই বলে গিয়েছিলেন, ‘তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।‘