বিকেল গড়িয়েছে। অস্তমিত সূর্য সব রঙ ঢেলে দিয়েছে আকাশে। সন্ধে নামতে দেরি নেই আর। বৃন্দাবনে ব্যাকুল পাখ-পাখালি। গোপিনীদের ব্যস্ততাও তুঙ্গে। মোহন বাঁশি বাজিয়ে শ্রীকৃষ্ণ (Shree Krishna) যে ডাক দিয়েছে তাদের।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 5 November 2025 10:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কৈলাশে ধ্যানস্থ দেবাদিদেব। অপরূপ নিঃস্তব্ধ প্রকৃতি। সেখানে বহমান স্রোতস্বিনী একমাত্র শব্দের উৎস। কোথা থেকে যেন ভেসে এল অপূর্ব বাঁশির সুর। কে বাজায় এমন মোহন বাঁশি! ধ্যান ভঙ্গ হয় মহাদেবের (Rash Purnima 2025)। বুঝতে পারেন, এতো সেই সুর! চঞ্চল হয়ে ওঠেন মহাদেব।
বিকেল গড়িয়েছে। অস্তমিত সূর্য সব রঙ ঢেলে দিয়েছে আকাশে। সন্ধে নামতে দেরি নেই আর। বৃন্দাবনে ব্যাকুল পাখ-পাখালি। গোপিনীদের ব্যস্ততাও তুঙ্গে। মোহন বাঁশি বাজিয়ে শ্রীকৃষ্ণ (Shree Krishna) যে ডাক দিয়েছে তাদের। রাসলীলা শুরু। সেই বাঁশির সুরে আবার সমাধিস্ত হচ্ছেন মহাদেব। তাঁকে যে পৌঁছতেই হবে!
কিন্তু বৃন্দাবনের (Vrindavan) রাসলীলায় শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অন্য পুরুষের প্রবেশ! সে যে অসম্ভব। নিধিবনে পথ আগলে দাঁড়ালেন যোগমায়া। "এ বনে তো শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের প্রবেশাধিকার নেই। আপনি যদি গোপিনীর রূপ নেন, তবেই আপনার পক্ষে ভেতরে যাওয়া সম্ভব।"
থমকে গেলেন মহাদেব (Mahadev)। তা কী করে সম্ভব! উপায় বাতলে দিলেন সেই যোগমায়া। বললেন, বৃন্দাদেবীর শরণ নিন। তিনিই আপনাকে উপায় বলে দেবেন।" বৃন্দাদেবী উপায় বলে দিলেন দেবাদিদেবকে। তাঁর পরামর্শে বৃন্দাবনের মন সরোবরে ডুব দিলেন। ডুব দিয়ে উঠতেই বদলে গেল সব। সুন্দরী গোপিনী রূপে নিজেকে দেখে অবাক হলেন। এরপরেই বৃন্দাদেবী মহাদেবকে নিয়ে এলেন রসস্থলীতে। রাধা কৃষ্ণের ভুবনমোহিনী প্রেমে মজলেন তিনি।
গোপিনীদের সঙ্গে লীলাখেলায় মাতলেন শ্রীকৃষ্ণ। প্রহর অতিক্রান্ত। বিশ্রান্ত গোপিনীরা তখন সামান্য বিশ্রামে। কিন্তু সেদিন কেমন যেন তার কাটল শ্রীকৃষ্ণের। কেমন যেন মনে হচ্ছে সবকিছু ঠিক নেই। অন্য কোনও পুরুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাচ্ছেন তিনি। দেবী ললিতাকে ডেকে বললেন, ‘‘সব গোপিনীদের ঘোমটা খুলে একবার দেখোতো, ছদ্মবেশে কোনও পুরুষ ঢুকে পড়ল কিনা!’’
কৃষ্ণ আজ্ঞা পালন করলেন ললিতা। নাহ! কোনও পুরুষতো নেই গোপিনীদের দলে। তবে একজন গোপিনীকে তিনি পেয়েছেন, যাঁর ত্রিনয়ন। সঙ্গে সঙ্গে পুরো বিষয়টা স্পষ্ট হল শ্রীকৃষ্ণের কাছে। উচ্চহাস্যে দেবাদিদেবকে স্বাগত জানালেন তিনি। বললেন, ‘‘গোপিনী রূপে আপনাকে দেখে আমি পরম প্রীত হয়েছি। কিন্তু গৃহস্থের তো রাসলীলা দেখার কথা নয়, তা দেখেই যখন ফেলেছেন, তখন আজ থেকে আপনিই হবেন দ্বাররক্ষক। আপনার অনুমতি নিয়ে তবেই গোপিনীরা আসতে পারবেন নিধিবনের লীলাখেলায়।’’ সেই থেকে শিব বাধা পড়লেন বৃন্দাবনে। গোপেশ্বররূপে।
বৃন্দাবনের এই গল্পের মতো রাস উৎসব ঘিরে নানা কথা ছড়িয়ে রয়েছে এই বাংলাতেও। শান্তিপুরের যে রাস নিয়ে ভক্তদের উন্মাদনার শেষ নেই, তাকে ঘিরেও এমন নানা গল্প আছে। ভক্তদের বিশ্বাস, শান্তিপুরের অদ্বৈত আচার্য ছিলেন মহাদেব ও বিষ্ণুর যুগল অবতার। প্রায় চারশো বছর আগে তিনি নারায়ণ পুজো করে এখানকার রাসযাত্রার সূচনা করেন। প্রথমদিকে বড় গোস্বামী বাড়ি ও বিগ্রহবাড়িগুলোতেই পালিত হতো রাস। একবার মন্দির থেকে চুরি হয়ে যায় রাধারমন জিউর বিগ্রহ। পরে অদ্বৈত আচার্যের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী যশোর থেকে তা উদ্ধার করেন। এরপর সিদ্ধান্ত হয়, রাধার সঙ্গে যুগলরূপে শ্রীকৃষ্ণের পুজো করা হবে। সেই দিন রাধারানির বিগ্রহ স্থাপন করে শুরু হয় শান্তিপুরের রাসযাত্রা।
শান্তিপুরের মতো নবদ্বীপের রাসও শাক্ত রাস হিসেবেই পরিচিত। কথিত, চৈতন্যদেবের আমল থেকে রাস উৎসব শুরু হয়েছিল নবদ্বীপে। চৈতন্য পূর্ববর্তী সময়ে নবদ্বীপে তান্ত্রিকদের দাপট প্রকট হয়েছিল চৈতন্য পরবর্তী সময়েও। চৈতন্যদেবের অবস্থানকালে তাঁরা কিছুটা কোণঠাসা হলেও, তিনি নবদ্বীপ ছাড়তেই হারানো জমি দখল করে নিয়েছিল তান্ত্রিকরা। যেহেতু রাজা বল্লাল সেন থেকে শুরু করে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রত্যেকেই শক্তির উপাসক ছিলেন, তাই রাজ অনুগ্রহ লাভ সহজ হয়েছিল। এটাও বলা হয় বৈষ্ণব রাসকে দমিয়ে শাক্ত রাসের চল হয়েছিল রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতাতেই।তবে শক্তির উপাসক হলেও বিষ্ণুর প্রতিও ছিলেন শ্রদ্ধাশীল।
নানা ইতিহাস আর বিশ্বাসের মোড়কে আজও সজীব এই রাস উৎসব। বৃন্দাবনের রাসই হোক, আর শান্তিপুরে রাস, বহিরঙ্গে রঙের তারতম্য থাকলেও, মানুষের বিশ্বাস আর ভক্তিতে পার্থক্য করা নেহাত সহজ কাজ নয়।