ছবির নাম রাজবধূ। সব ঠিক হয়ে গেল। দর্শকরাও প্রহর গুনতে লেগেছেন। কিন্তু এক অমোঘ নিয়তি তা হতে দিল না। দর্শকের চোখের জলের শ্রাবণ নামল অন্য ভাবে। ২৪ জুলাই, ১৯৮০।

গ্রাফিক্স শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 18 August 2025 20:06
মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রের নট রূপে লেজেন্ড হলেন উৎপল দত্ত। বিশেষ করে বাংলার নাট্যমঞ্চকে তিনি আন্তর্জাতিক স্থানে পৌঁছে দেন। বিনোদন জগতে বিদেশি সংস্কৃতির হাওয়া এনেছিলেন তিনি। ১৯ অগস্ট ১৯৯২ সালে প্রয়াত হন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তবে ১৯৮০ সালে উত্তমকুমারের প্রয়াণের পর মহানায়কের ছেড়ে যাওয়া একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্রে কাজ করেছিলেন উৎপল দত্ত। আর তাঁর সঙ্গে ছিলেন সুচিত্রা সেনের কন্যা মুনমুন সেন। ভাবলে চমক লাগে যে উত্তম-মুনমুনকে ভেবেই এই ছবির কাহিনি ভেবেছিলেন পরিচালক পার্থপ্রতিম চৌধুরী।
বাংলা ছবি এক নতুন ইতিহাস রচনা করার মুখে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে উত্তম ছবি করতে চলেছেন সুচিত্রার মেয়ের সঙ্গে। স্বয়ং মুনমুন সেন তখনকার সেই হটকেক খবরকে মান্যতাও দিয়েছিলেন। ওঁরা করতেন শ্বশুর বউমার চরিত্র। কিন্তু চরিত্র দুটো বন্ধুর মতো। যেখানে শ্রদ্ধা থাকলেও ভয় নেই, ভালবাসা ও স্নেহ আছে। উত্তম কুমার পিয়ানো বাজাচ্ছেন আর মুনমুন গাইছেন, “দীনহীনে কেহ চাহে না, তুমি তারে রাখিবে জানি গো। আর আমি যে কিছু চাহি নে, চরণতলে বসে থাকিব।” গাইবেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও অরুন্ধতী হোম চৌধুরী।

ছবির নাম রাজবধূ। সব ঠিক হয়ে গেল। দর্শকরাও প্রহর গুনতে লেগেছেন। কিন্তু এক অমোঘ নিয়তি তা হতে দিল না। দর্শকের চোখের জলের শ্রাবণ নামল অন্য ভাবে। ২৪ জুলাই, ১৯৮০। বাংলার প্রিয় মহানায়ক উত্তমকুমারের মহাপ্রয়াণ ঘটল। উত্তমকে নিয়ে পরিকল্পনা করা বহু ছবিই না হওয়া হয়ে গেল। তার মধ্যেই একটি বিশেষ ছবি ছিল পার্থপ্রতিম চৌধুরীর এই ছবিটি, যা উত্তম কুমার ও মুনমুন সেন করতেন। সেটিই হতো উত্তম কুমারের সঙ্গে মুনমুনের নায়িকা রূপে প্রথম বাংলা ছবি। কিন্তু উত্তমের আকস্মিক প্রয়াণ বদলে দিল সব।
পার্থপ্রতিমের আগের ছবি 'যদুবংশ'তে অভিনয় করে উত্তম কুমার নিজের অভিনয়ের নতুন দিক খুঁজে পান। যেখানে নন-মেকআপ, ডিগ্ল্যামারাইজড লুকে প্রথম উত্তম কুমার অভিনয় করে সুখ পেয়েছিলেন। তাই ওঁর পার্থপ্রতিমের 'রাজবধূ' না করার কোনও কারণ ছিলনা। আর যেখানে রমার মেয়ে ওঁর বিপরীতে। কিন্তু মহানায়ক চলে যাওয়ার পরে সেই ভাবা চিত্রনাট্য মুলতুবি থেকে গেল তখনকার মতো।

সে সময়ে মুনমুন সেনের ছবির জগতে আসা সমর্থন করেননি সুচিত্রা। তাই অনেক পরে, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে ফিল্ম লাইনে এসেছেন মুনমুন। কিন্তু মা সুচিত্রা যদি দেখতেন তাঁর নায়ক ‘উতু’র সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করছে মেয়ে মুনমুন, মন কি গলত না মহানায়িকার? জানার সুযোগ রইল না।
যাই হোক, শেষমেশ পার্থপ্রতিম চৌধুরীর সেই 'রাজবধূ' ছবির শ্যুট হল, রিলিজ করল ১৯৮২সালে। উত্তম কুমার মারা যাওয়ার কারণে তাঁর না করা চরিত্রটি করলেন উৎপল দত্ত। আর ছবিতে তাঁর পুত্রবধূর রোল করলেন মুনমুন। এছাড়াও ছিলেন ছায়া দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক ও শমিত ভঞ্জ। টিমটা দেখলে বোঝা যায়, এঁরা সকলে ছিলেন উত্তমের সহকর্মী, সহযোদ্ধা, বন্ধু বা অভিভাবক। সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।
উৎপল দত্ত 'রাজবধূ' ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন বনেদী বাড়ির কর্তা ও শ্বশুরের ভূমিকায়। দীর্ঘকাল বিপত্নীক বৃদ্ধটি বনেদী বড়লোক, রক্তে ঐতিহ্যের স্রোত, রুচির ছাপ সাজপোশাকে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী অকালে মারা যাবার পরে গোটা বাড়ি ছন্নছাড়া। বিধবা দিদি ছায়া দেবী এই ভদ্রলোকটিকে দেখাশোনা করেন। একমাত্র পুত্র বাইরে। আর আছেন বাল্যকালের বাঙাল বন্ধু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।

ছবিতে উৎপল দত্ত আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-- দুই বন্ধুর সখ্য ও কমেডি দৃশ্যগুলো অমলিন নিখাদ হাস্যরসে পরিপূর্ণ। আসলে দুজনেই তো তুখোড় অভিনেতা। সেই বাঙাল বন্ধুর নতুন পুত্রবধূ খুব ভাল-ভাল বাঙাল পদ রান্না করে। সেই সব দেখে এই বৃদ্ধটি, যে রোলে উৎপল দত্ত অভিনয় করছেন, তাঁরও ইচ্ছে হয় নতুন বৌমা আনার। ছেলে আর তার দাদা এই ইচ্ছের কথা শুনে তাঁদের অফিসের পিএ-কে বৌমা সাজিয়ে বাবার কাছে হবু বৌমা বলে নিয়ে চলে যান এবং উৎপল তাঁকেই নিজের বৌমা ভেবে বসেন। সেই রোলেই মুনমুন অভিনয় করেন। এভাবেই এগোয় গল্প।
মুনমুনের প্রথম ছবি ছিল 'রবি সোম'। সেখানে ছোট রোল ছিল, নায়িকা নয়। 'রাজবধূ'তে প্রথম নায়িকা। মুনমুন প্রথম ছবিতে কিছুটা আড়ষ্ট, কিন্তু সদ্য ফোটা ফুলের মতোই ফ্রেশ এবং সুন্দর।
উৎপল দত্ত কিন্তু ১৯৭১ সালে সুচিত্রা সেনের বিপরীতে তুখোড় ভিলেনের রোল করেছিলেন বিজয় বসুর 'ফরিয়াদ' ছবিতে। সেই ভিলেন উৎপল যখন 'রাজবধূ'তে সুচিত্রার মেয়ে মুনমুনের শ্বশুর হয়ে এলেন, তখন যেন তিনি মুনমুনের নিজেরই পিতা। এই দুই ভিন্নধর্মী চরিত্র উৎপল দত্ত বলেই সম্ভব হয়েছিল। উৎপল দত্তর এই ছবিতে অভিনয় আজও দেখলে মন ভাল হয়ে যায়। রাজবধূ ছবির আসল আকর্ষণ মুনমুনের চেয়েও বেশি উৎপল দত্ত। উত্তমের বিকল্প হিসেবে উৎপল যেন এই ছবিতে যথার্থ।
উৎপল ও মুনমুনের 'রাজবধূ' ছবি দর্শকরাও ভালই গ্রহণ করেছিল। মূল কারণ একটাই, আশির দশকে সুচিত্রা সেন রুপোলি পর্দা থেকে সরে গিয়েছেন। তাঁর মেয়ে কেমন? মায়ের মতো দেখতে? অভিনয় পারে? অনেকে আবার সুচিত্রাকেই দেখছে ভেবে হলে ভিড় করেছিল।
মুনমুন সেনের লিপে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একটা গানও ছিল ছবিতে। তবু ছবিটা ল্যান্ডমার্ক হয়নি প্রচারে। পরবর্তীকালেও জায়গা পায়নি ইতিহাসে। কিন্তু উত্তম এবং মুনমুন এই ছবিটি করলে তা আরও ল্যান্ডমার্কিং হত হয়ত।