তাঁর মুখ থেকেই শুনেছিলাম তাঁর জীবন সংগ্রামের কাহিনি। যা কোনও বায়োস্কোপের গল্পর থেকে কম নয়। একেবারেই কানন দেবীর ছোটবেলার গল্পের সঙ্গে মিলে যায় বাসন্তীর মেয়েবেলা।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 13 August 2025 17:33
নাম বাসন্তী হলেও জীবনে তাঁর কখনও বসন্তের ছোঁয়া লাগেনি। জন্ম থেকেই সংগ্রামের শুরু। বাসন্তীর শৈশবের সংগ্রাম যেন কানন দেবীর প্রারম্ভিক জীবনের নীল নকশা। বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়ের (Basanti Chatterjee) পরিচয় শুধুমাত্র 'গোয়েন্দা গিন্নি'র ঠাম্মা নন, পেশাদার রঙ্গমঞ্চ থেকে স্বর্ণযুগের চলচ্চিত্রে দাপিয়ে অভিনয় করেছিলেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। অথচ তাঁর যৌবনের কাজ গুলি চাপা পড়ে গিয়েছে এ যুগের দর্শকদের কাছে। মৃত্যু তাঁকে বিরামহীন অসুস্থতা থেকে মুক্তি দিল কিন্ত তাঁর মৃত্যু প্রমাণ করে গেল সন্তান থেকেও একা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের লড়াইয়ের গল্প। সেই ছোট্ট থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ৮৮ টা বছর লড়তে হল বাসন্তীকে।
বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার বহুবার কথা হয়েছিল। জীবন ওঁকে এতটুকু শান্তি দেয়নি কিন্তু ওঁর গলায় ছিল চিরকাল সাহস। এমন সাহসী দাপুটে অভিনেত্রীর (Actress) যুগ শেষ হল তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। বাসন্তী দেবীর মধ্যে ছায়া দেবী, রাজলক্ষ্মী দেবী, গীতা দের দাপটের ছাপ পাওয়া যেত। সেই দাপটের শেষ উত্তরসূরী যেন ছিলেন বাসন্তী।

তাঁর মুখ থেকেই শুনেছিলাম তাঁর জীবন সংগ্রামের কাহিনি। যা কোনও বায়োস্কোপের গল্পর থেকে কম নয়। একেবারেই কানন দেবীর ছোটবেলার গল্পের সঙ্গে মিলে যায় বাসন্তীর মেয়েবেলা।
আদি বাড়ি দুমকাতে। তবে বাসন্তীর বাবারা থাকতেন বাঁকুড়াতে। কিন্তু খুব ছোটবেলায় পিতৃহারা হন বাসন্তী। বাবা-মায়ের এক সন্তান ছিলেন বাসন্তী। বাবার মৃত্যুর পর পৈতৃক ভিটে ছেড়ে মা-মেয়ে চলে আসেন মামার বাড়ি। কিন্তু মামার বাড়ি এসে মামাদের কিল চড় জুটল তাঁদের। দিদিমা থাকলেও তাঁর কোনও ক্ষমতা ছিল না। মামারা তাঁদের বোন আর বোনঝির দায়িত্ব নিলেন না। নিরুপায় হয়ে এক তুতো বোনের বাড়ি আশ্রয় নেন মা-মেয়ে। কিন্তু বিনে পয়সায় কে খাওয়াবে তাঁদের। আশ্রয়টুকু পাওয়া গেলেও বাসন্তীর মাকে নিতে হল বাড়ি বাড়ি রান্নার কাজ। মাঝেমধ্যে ঠিকে ঝির কাজও করতে হত। বাঁকুড়ার সম্ভ্রান্ত বাড়ির বউয়ের ভাগ্য বদলে গেল স্বামীর মৃত্যুতে। এদিকে বাসন্তীর পড়াশোনার পাঠও চুকে গেল চিরতরে। খেতেই যেখানে পেতেন না তাঁরা, সেই সংসারে পড়াশোনা তো বিলাসিতা।

কিন্তু মা চেয়েছিলেন মেয়ে নাচ গান শিখুক। ঠিক এমন ভাবেই লোকের বাড়ি কাজ করে সংসার চালাতে হয়েছিল কানন দেবীর পালিকা মাকে। সেখান থেকে গান, নাচ শিখে একদিন কানন হয়ে ওঠেন শীর্ষস্থানিয়া নায়িকা। বাসন্তীর ভাগ্য অত সুপ্রসন্ন ছিল না। মা তাঁকে নাচ শিখতে পাঠালেন চিৎপুরের যাত্রাদলের ডান্সার বিনয় ঘোষের কাছে। নাচ শেখাবার পয়সা তো নেই! বলা হল 'এই বাচ্চা মেয়েটি খেতে পায় না। ওকে একটু নাচ শিখতে নিন।' শেষ অবধি নাচের ক্লাসে সুযোগ পেলেন তিনি।
নাচ শিখে ঘরে পয়সাও এল। তখনকার দিনে পেশাদার রঙ্গমঞ্চে নাটক শুরু হবার আগে নাচ হত সেই নাচের দলে নাচ করতেন বাসন্তী। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে কোনও নাটকের মাঝে কোরাস নাচের সুযোগ পেতেন।
এমনই একদিন বাসন্তী চোখে পড়ে যান অভিনেত্রী গীতা দের। গীতা দে বলেন বাসন্তীকে 'ছোট খাট্টো দেখতে, এত সুন্দর তুই, গলাটা এত মিষ্টি, তাহলে অফিস ক্লাবে নাটক করিস না কেন?' সেই গীতা দের হাত ধরে অফিস ক্লাবের নাটকে যোগ দিলেন বাসন্তী। বলতে গেলে বাসন্তীর গুরু মা ছিলেন গীতা দে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, বহুকাল পরে ইটিভি বাংলা চ্যানেলে 'অতি উত্তম' সিরিজে 'মৌচাক' টেলিছবি হয়েছিল। উত্তমকুমারের ছবির গল্প। সেখানে বসের বউ গীতা দের রোলটা বাসন্তী চট্টোপাধ্যায় করেন টেলিফিল্মে।

অফিস ক্লাবে যোগ দিয়ে রোজ দু'বেলা খাবার অন্তত জুটত তাঁদের।
অফিস ক্লাবে নাটক করতে করতে স্টার থিয়েটারে ডাক এল। বাসবী নন্দীর অনুপস্থিতিতে তাঁর রোল করতেন বাসন্তী। সেখান থেকেই এল চলচ্চিত্রে সুযোগ। 'রোদন ভরা বসন্ত', 'হার মানা হার','আমি সে ও সখা' প্রভৃতি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। উত্তম-সুচিত্রার সেই দৃশ্য ভাবুন! পাহাড়ি সান্যাল ছবি আঁকেন বড় আর্টিস্ট। তাঁর বাড়িতে আশ্রিতা সুচিত্রা সেন। সুচিত্রাকে প্রথম দেখে উত্তম ছবি আঁকছেন আর গাইছেন 'তোমার দেহের ভঙ্গিমাটি যেন বাঁকা সাপ'। সেই গানের দৃশ্যেই পাহাড়ি সান্যালের পুত্রবধূর চরিত্রে ঘোমটা দেওয়া বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়ের দেখা মেলে। তখন তিনি যুবতী।

রঙ্গমঞ্চের নট নবকুমার বাসন্তীকে বলেছিলেন 'সিনেমায় ছোট রোল করবি না। ছোট রোল করলে বড় রোলে জীবনেও সুযোগ পাবি না।' তারপর থেকে সব সিনেমার অকিঞ্চিতকর রোল ফিরিয়ে দিতেন বাসন্তী। বাসন্তী দেবীর মুখেই শুনেছিলাম এই নবকুমার প্রণয় ঘটিত কারণে স্টার থিয়েটারের ভিতর গলায় দড়ি দিয়ে মারা যান। পাঁচ বছর অপেক্ষা করার পর বাসন্তী থিয়েটারে 'শর্মিলা' নাটকে নাম করেছিলেন। বাড়ির তিন ছেলে, তিন বউকে নিয়ে গল্প। তিন ছেলে তিন জাতের বৌ বিয়ে করেছিল। মাদ্রাজি বড় বউয়ের চরিত্রে বাসন্তী আর বড় ছেলে হন শৈলেন মুখোপাধ্যায়। মেজ ছেলে প্রেমাংশু বসু বিয়ে করেন অন্তজ শ্রেণীর নীলিমা দাসকে, সতীন্দ্র ভট্টাচার্য ছোট ছেলে মেম বউ জ্যোৎস্না বিশ্বাসকে বিয়ে করেন। তবে নাটকের নায়িকা ছিলেন বাড়ির মেয়ে সুব্রতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বিপরীতে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। দেব নারায়ণ গুপ্তর এই নাটকে অভিনয় করে প্রথম খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বাসন্তীর। এই নাটকের রিভিউ যেদিন বেরল সর্বাগ্রে বাসন্তী বড় বউয়ের নামটাই ছিল।
বাসন্তী ঘোষ ছিল তাঁর আসল নাম। পুলিশ অফিসারকে বিয়ে করে হন বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়। সার্জেন থেকে অফিসার হন তাঁর বর। সন্তানও হয়। কিন্তু কী ভাবে যেন সব তাঁর এলোমেলো হয়ে গেল। স্বামীর মৃত্যুর পর আরও দুর্দশার শুরু। সন্তান বলতে তাঁর ড্রাইভার ছিল সব। ড্রাইভার নিজের টাকায় বাসন্তী দেবীর চিকিৎসাও করাতেন। পুলিশ অফিসার বর হয়েও বরণ ভাগ্য বাসন্তীর হল না। যা বেশ অবিশ্বাস্যকর!

সাদা কালো যুগের পর আর বহু বছর অভিনয় করেননি তিনি। ফিরলেন রাতুল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'দাহ' ছবি দিয়ে। যা তাঁর কামব্যাক ছবি বলা যায়। মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন দেবশ্রী রায়। তবে আবার তাঁর পরিচিতি বাড়ল তরুণ মজুমদারের 'আলো' ছবিতে গ্রাম্য খুড়িমার চরিত্র করে। এরআগে তরুণ মজুমদার 'ঠগিনী' ছবিতে বাসন্তীকে দেখে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। পরে সেই পরিচালককেই শেষ বয়সে বাসন্তীকে নিতে হল।
তবে এরমাঝে একাধিক সিরিয়ালে কাজ করেছেন বাসন্তী। শ্রীরামকৃষ্ণ থেকে গোয়েন্দা গিন্নি বিশাল তাঁর সিরিয়াল সফর।
আসলে তাঁর সময়ে একাধিক বড় বড় চরিত্রাভিনেত্রী ছিলেন গীতা দে, গীতা নাগ, অনামিকা সাহা আরও কতজন। যাদের আলোকে কম কাজ পেতেন বাসন্তী।
পাইকপাড়ার ইন্দ্রলোক আবাসনে একাই থাকতেন তিনি। সন্তানের ভরসা সেবা একেবারেই পাননি। ঐ ড্রাইভার আর টলিপাড়ার কিছু অভিনেতা অভিনেত্রী ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, মৈত্রেয়ী মিত্র টাকা তুলে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন।

বাস্তবজীবনে একেবারেই তিনি সেলিব্রিটিসুলভ আচরণ করতেন না। পাড়ার কালীপুজোতে বেদিতে সামান্য ঘরপোশাক পরেই উনি সব বৃদ্ধাদের সঙ্গে বসে থাকতেন।
বহু রোগ ভোগ, বহু অর্থ খরচ করে শেষ অবধি একাধিক রোগের থেকে মুক্তি পেলেন বাসন্তী। এত কষ্টের মাঝে কর্কট রোগ বারবার আক্রমণ করেছে তাঁকে। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি নিয়েও চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে শুটিং ফ্লোরে যেতেন।

সব কষ্টের অবসান হল তাঁর মৃত্যু দিয়ে। এমন দাপুটে মনখোলা অভিনেত্রীর মৃত্যু সত্যি বড় ক্ষতি। কিন্তু বেঁচে থাকতে কটা ভাল কাজ তিনি পেয়েছেন? বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু শহরে একা বৃদ্ধাদের অসহায়তার কথাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।