সুচিত্রা ছিলেন সংসারে এক সন্ন্যাসিনী। নিজের জন্য প্রায় কোনও কিছুরই প্রয়োজন হত না তাঁর।

গুরু পূর্ণিমায় সুচিত্রা। গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 July 2025 19:43
নিঃসীম একাকীত্বের মধ্যে দিয়ে তিনি তিমির অভিসারিনী। নায়িকার গ্ল্যামার জীবনকে ছুড়ে ফেলে অন্তরাল জীবনে তাঁর একমাত্র আলাে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ। সেই আঁধারঅভিসারিকা, আলােক-সন্ধানী নারীর নাম সুচিত্রা সেন। যদিও নিজের কাছে শুধুই তিনি রমা সেন। ঠিক তাঁর 'উত্তর ফাল্গুনি'র সংলাপের মতো মহানায়িকা সরে যাবে, সুচিত্রা সেন লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাবে কিন্তু রমা বেঁচে থাকবে অন্দরে অন্তরে। রমার জীবনের একমাত্র গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ।
প্রতি গুরু পূর্ণিমায় সুচিত্রা রামকৃষ্ণ সাধনা করতেন পুজোয় শুধু নয়, মননে, চেতনায় আরাধনায়। অন্তরালে নিজের মানস জগৎকে আরও উন্মুক্ত করেছিলেন তিনি। এই ধরনের অন্তরীণ হতে আম-বাঙালি কখনওই পারবে না।
একদিন রামকৃষ্ণই সুচিত্রাকে ধ্যানের মধ্যে বললেন, তােকে মা-ই অনেক দুঃখ যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে পুড়িয়ে নেবেন। তখন দেখবি এই জগৎ থেকে তুই আলাদা হয়ে গিয়েছিস। একা হয়ে যাবি। লােকে ভাববে, এ কেমন জীবন! একা থাকে কী করে! তখন তাে আলাে দেখছিস। থাকবি অন্য এক আনন্দের মধ্যে।'
সত্যি দীর্ঘ চার দশক অন্তরাল জীবন যেন সুচিত্রা সাধনা। সুচিত্রা একবার বলেছিলেন, ঘরোয়া আড্ডায়, "দেবকী বাবুর 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য' ছবি করে আমার জীবন দর্শন পাল্টে যায়।" দেবকী কুমার বসুর 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য' ছবিতে বিষ্ণুপ্রিয়ার রোল করেছিলেন সুচিত্রা। সেই 'হা কৃষ্ণ' বলে সুচিত্রার ডাকেই যেন ছিল তাঁর পরবর্তী অন্তরাল জীবনের সূচনা।

সুচিত্রা সেনের অদ্ভুত পরিবর্তন হয় স্বামী বীরেশ্বরানন্দজির (Swami Bireswaranandaji) সংস্পর্শে এসে। স্বামী বীরেশ্বরানন্দজির কাছে যখনই আসতেন খুব বিনয় ও ভক্তি নিয়ে আসতেন সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)। ভরত মহারাজের কাছেও তিনি আসতেন। ভরত মহারাজের কাছে ‘সুচিত্রা সেন’ নাম বলতেন না। নাম বলতেন ‘মনোরমা’-– এটা তাঁর আসল নাম। মহারাজের কাছে অনেকক্ষণ বসতেন তিনি। আলাদা করেই কথা বলতেন, একদম শিশুর মতো। মহারাজের জন্য ফুল, ফল নিয়ে আসতেন। প্রথমে জানতেন না, কীভাবে সাধুদের কাছে আসতে হয় এবং কী করতে হয়। ধীরে ধীরে সাধিকা হয়ে ওঠেন মিসেস সেন। বেলুড় মঠে এসে তিনি ঠাকুরের মন্দিরে প্রণাম করে ভরত মহারাজ, প্রেসিডেন্ট মহারাজকে প্রণাম করতেন এবং তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন।
সুচিত্রা মানসিক শান্তি লাভের পথ পেয়েছিলেন ঠাকুর (শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব) এবং মায়ের (শ্রী শ্রী সারদা দেবী) কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে। উনি এটা বুঝেছিলেন, চিত্ত বৈকল্য থেকে বের করে এনে তাঁকে মানসিক শান্তি ও স্থৈর্য দিতে পারে একমাত্র ঠাকুর ও মায়ের শরণ। স্বার্থপর দুনিয়ার মাঝে উনি উপলব্ধি করেছিলেন মায়ের কথা, 'যদি শান্তি চাও, কারও দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের।' সুচিত্রা বলতেন, 'নিজেকে যদি ভাল করে রাখতে চাও, তবে গায়ে হলুদ জল মেখে থাকো।' মানে ঠাকুরের শরণাপন্ন হয়ে থাকা এবং সেই আবহে নিজের মনটাকে আবিষ্ট করে রাখা। যেটা সুচিত্রা সেন খুব ভাল বুঝেছিলেন।
১৯৭৮ সালে 'প্রণয় পাশা' ফ্লপ হওয়ার পর অভিনয় জীবন থেকে সরে নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যান সুচিত্রা সেন। ভরত মহারাজ সুচিত্রা সেনকে বলেছিলেন 'মা লোভ করিস না'! মহারাজের কাছে অঝোরে কেঁদেছিলেন সেদিন সুচিত্রা। সেই কান্নাতেই ঝরে গিয়েছিল গ্ল্যামারের চটক, খুঁজে পেলেন রামকৃষ্ণলোকের আলো।
সুচিত্রা (Suchitra Sen) ছিলেন সংসারে এক সন্ন্যাসিনী। নিজের জন্য প্রায় কোনও কিছুরই প্রয়োজন হত না তাঁর। শোওয়ার ঘরে তাঁর মুখ্য আসবাব বলতে ছিল কেবল একটা স্প্রিঙের খাট। বেশ বড়, ফাঁকা ফাঁকা সে ঘর। জানলা খুলে দিলে সেই ঘর থেকে হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যেত শিউলি গাছের ডাল। আর সেই ঘরের জানলার নীচে প্রশ্রয় পেয়েছিল বোগেনভেলিয়া। এই শোওয়ার ঘরের সঙ্গেই ছিল ঠাকুর ঘর। সেখানে বেদিতে রামকৃষ্ণ, সারদা আর বিবেকানন্দের বেশ বড় ছবি। সব সময়ে সেই ঠাকুরঘরে ধূপের ধোঁয়া হয়ে জেগে থাকত রমার অস্তিত্ব। সেই ঘরে সুচিত্রা সেনের চিহ্নটুকুও ছিল না। নিজের একটা ছবিও রাখতেন না রমা। আগের সেই জীবন থেকে মুক্তি।
২০১২ সালের কথা। তখন সুচিত্রা অসুস্থ। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রবীণ সন্ন্যাসী স্বামী বিমলাত্মানন্দ সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, "২০১২ সালে গরমের দিনে একবার রাত ১২টার সময় মঠে এসেছিলেন সুচিত্রা। কিন্তু জিটি রোডের উপর মন্দিরের বন্ধ গেট খুলতে প্রথমে রাজি হননি দারোয়ান। আসলে তিনিও সর্বদা নিজেকে আড়াল করে রাখা মহানায়িকাকে চিনতেই পারেননি। পরে মঠের এক মহারাজকে ফোন করে সুচিত্রা জানান তাঁর আসার কথা। তখন সেই মহারাজ গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসেন।” বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে, প্রায় সারা রাত সারদাদেবীর মন্দিরের সামনে বসে ছিলেন সুচিত্রা। খুব ভোরে কেউ জানার আগেই তিনি নিঃশব্দে চলে গিয়েছিলেন।
অসুস্থ হয়ে বেলভিউ ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন থাকাকালে নিজের বিছানার বালিশের নিচে মা সারদার ছবি রাখতেন সুচিত্রা সেন। মৃত্যুর সময় সুচিত্রার বালিশের তলায় ছিল শ্রীরামকৃষ্ণ আর সারদা মায়ের ছবি। সেই নিঃসীম একাকীত্বের হাত ধরেই সুচিত্রা খোলস ছেড়ে রমা পাড়ি দিলেন রামকৃষ্ণলোকে।