ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আর দু-পাশে সারদা মা এবং স্বামী বিবেকানন্দর ছবি। ঠাকুরের সামনে গলায় আঁচল দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সুচিত্রা প্রণাম করলেন।

রামকুমারের গান পছন্দ করতেন সুচিত্রা। গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 29 June 2025 14:27
'ওগো যমুনায় জল আনতে যাচ্ছ সঙ্গে নেই কো কেউ
(তুমি) কাদের কুলের বউ গো তুমি কাদের কুলের বউ?
যাচ্ছ তুমি হেসে হেসে কাঁদতে হবে অবশেষে আর কলসী তোমার যাবে ভেসে ঐ লাগলে জলের ঢেউ আর লাগলে প্রেমের ঢেউ'
এই গান মানেই বাঙালির কাছে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। এসব গান কিন্তু গাইলেই হয়না, তাঁর মেজাজটাও চাই। পুরোনো কলকাতার বাবুদের জলসা, শোভাবাজার রাজবাড়ির ঝাড়বাতির আলো, মল্লিকদের মার্বেল প্যালেসের আভিজাত্য, ছাতুবাবু লাটুবাবুদের গৌরবগাথা, জুঁই ফুল, গ্যাসবাতি, আতর, গোলাপ আর উত্তর কলকাতার বনেদি খাবার-দাবারের গন্ধ যেন রামবাবুর গানে ম ম করত।

বাংলা টপ্পা আর পুরাতনী গানের সঙ্গেই পুরোনো কলকাতার ইতিহাসও সমান দক্ষতায় মানুষের কাছে তুলে ধরতেন তিনি। রসিকদের আসরে 'ওগো যমুনায় জল আনতে যাচ্ছ' গানকে ইংরাজি করে গাইতেন রামকুমার। তার রূপ হত তখন আরো মজার। রামকুমার হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছেন,
"হুস ফ্যামিলি বিলংস টু ম্যাডাম হুস ফ্যামিলি বিলংস টু গোয়িং টু ব্রিং ইয়ামুনা ওয়াটার নো ওয়ান উইথ ইউ ম্যাডাম হুস ফ্যামিলি বিলংস টু
গোয়িং আর ইউ লাফিং লাফিং ইউ উইল রিটার্ন ক্রায়িং ক্রায়িং ডাউন দ্য পিচার উইল বি গোয়িং ওয়েভ অফ লাভ অ্যাট ইউ ম্যাডাম হুস ফ্যামিলি বিলংস টু।"
মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের আধ্যাত্মিক জীবন চিরকালই বাঙালির চর্চায় থেকেছে। ভক্তিমূলক গান ভীষণ পছন্দ করতেন সুচিত্রা সেন। দেবকী কুমার বসুর 'ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য' ছবিতে বিষ্ণুপ্রিয়ার চরিত্রে অভিনয় করার পর থেকেই সুচিত্রার ভিতর আধ্যাত্মিকতার উন্মেষ ঘটে। বাংলার টপ্পা সম্রাট রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গান খুবই পছন্দ করতেন সুচিত্রা।

একবার মিসেস সেনের বন্ধু প্রযোজক ও পরিবেশক অসিত চৌধুরী রামকুমারবাবুকে সুচিত্রা সেনের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে শ্রীমতী সেনের অনুরোধে তাঁকে গান গাইতে হয়েছিল।
রামকুমারবাবু একসময় গৌরীপুরের মহারাজা ব্রজেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরীর বাড়িতে গান গাইতে যেতেন। গৌরীপুরের মহারাজার বাড়ি বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে, সুচিত্রা সেনের বাড়ির পাশেই। অসিতবাবু তো রামকুমার চট্টোপাধ্যায়কে শ্রীমতি সেনের বাড়িতে নিয়ে আসেন। আবার রামবাবু ছিলেন সুচিত্রা সেনের অভিনয়ের ভক্ত। কিন্তু কখনও সুচিত্রার সঙ্গে রামকুমারের আলাপ হয়নি। পর্দাতেই রামকুমারের সুচিত্রা-দর্শন আর রেকর্ডেই রামকুমারের গান শুনে সুচিত্রার ভালো লাগা। বর্তমানে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের অভিজাত 'বেদান্ত' আবাসন, সেখানেই ছিল সুচিত্রা সেনের রাজপ্রাসাদসম অট্টালিকা। রামকুমার জানাচ্ছেন "একটা লম্বা টানা বারান্দায় গানের ব্যবস্থা হয়েছিল। সার দিয়ে চেয়ার পাতা। তাতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের দু-চারজন চেনা মানুষকে দেখতে পেলুম, অন্যদের ঠিক চিনি না। সুচিত্রা আমাকে গাইবার জন্য বললেন। দেখলুম মেঝের ওপর একটা ফরাস পাতা। তাতে আমার বসার ব্যবস্থা হয়েছে। আমি ফরাসে গিয়ে বসলুম। আর সুচিত্রা কী করলেন শুনুন, চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে চট্ করে নীচে আমার কাছে এসে বসলেন। তাই দেখে চেয়ারে যাঁরা বসেছিলেন প্রত্যেকেই চেয়ার থেকে উঠে নীচে বসলেন। সুচিত্রার এই ব্যাপারটা আমার খুব ভাল লেগেছিল।
সুচিত্রা আমাকে 'কাকা' বলে সম্বোধন করেছিলেন। ওঁর চেয়ে বয়সে আমি অনেক বড়। সুচিত্রা বয়স্কদের কতটা সম্মান দিতে হয় জানতেন। তবে দুঃখের বিষয় অনেকের মধ্যেই এ জিনিসটা নেই। স্টার নায়িকা সেদিন মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে-বৌয়ের মতো সাধারণ তাঁতের শাড়ি পরে বসেছিলেন। আমি একটার পর একটা ভক্তিগীতি গেয়ে যেতে লাগলুম। গানের সঙ্গে মাঝে মাঝে উনিও মাথা দোলাচ্ছিলেন। অদ্ভুত একটা ভক্তিভাব লক্ষ্য করেছিলাম তাঁর চোখে-মুখে। গান শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে যান। না, কী গান গাইব সে ব্যাপারে সুচিত্রা একটা কথা বলেননি। শুধু শুনে গিয়েছেন।"
অতিথি অভ্যাগত চলে যাবার পরও সেদিন রামকুমার ছিলেন সুচিত্রার বাড়ি। দীর্ঘক্ষণ শ্রীরামকৃষ্ণ ও উত্তর কলকাতার আদি ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে কথা হয় তাঁদের। এরপর সুচিত্রা তাঁর ঠাকুরের আসন দেখাতে ঠাকুরঘরে নিয়ে যান রামকুমারকে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আর দু-পাশে সারদা মা এবং স্বামী বিবেকানন্দর ছবি। ঠাকুরের সামনে গলায় আঁচল দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সুচিত্রা প্রণাম করলেন। ঈশ্বরচিন্তায় প্রাণমন সমর্পিত নাহলে এরকমটি হয় না। রামকুমার হলেন উত্তর কলকাতার রসিক মানুষ। তিনিও একটু মজা করা ছাড়লেননা মহানায়িকার সঙ্গে। রাম বাবু সুচিত্রাকে জিজ্ঞেস করলেন "ঠাকুরকে কি ভোগ দেওয়া হয়?"
![Puratani | A Bengali Literature Books By Best Selling Author Ramkumar Chattopadhyay | Trending [Hardcover] Ramkumar Chattopadhyay : Ramkumar Chattopadhyay: Amazon.in: Books](https://m.media-amazon.com/images/I/31bFX-YYPGL._AC_UF1000,1000_QL80_.jpg)
সুচিত্রা বললেন "ঠাকুরের প্রিয় খাবার তো জিলিপি আর ঠাকুরের ভোগ আমি নিজেই রাঁধি।" রামকুমার তখন বললেন "ঠাকুর তো পেটরোগা ছিলেন, তাই বেশি মশলা দেওয়া খাবার হিসেবে না দেওয়াই ভাল। কখনও কখনও একটু শিঙি মাছের ঝোল রেঁধে দেওয়া যেতে পারে।" সুচিত্রা রাগ করেননি। সুচিত্রা সেন রাশভারী হলেও তিনি পছন্দ করতেন রসিক মানুষ। তাই তাঁর মনে ধরেছিল রামবাবুর সেন্স অফ হিউমার। সেদিনকার কোনও ছবিই আজ আর ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই। কারণ অনেক ফটোগ্রাফার এলেও তাঁদের পত্রপাঠ বিদায় জানিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। যা দেখে ব্যথিত হয়েছিলেন রামকুমার।

ঐসময় সুচিত্রার বাড়িতে সরস্বতী আর লক্ষ্মী পুজোর বিশাল আয়োজন হত। পরে একবার সুচিত্রা তাঁর বাড়িতে সরস্বতী পুজোতে রামকুমারকে গান গাইবার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নিজে ফোন করে রামবাবুকে নিমন্ত্রণ করেন সুচিত্রা। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় রামকুমারের আরেক জায়গায় গাইবার কথা। সুচিত্রা সেনের অনুরোধ তিনি রাখতে পারেননি। রামকুমার বলেছিলেন, "সরস্বতী পুজোর দিন সুচিত্রার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে গান শোনাতে পারিনি। আগে কথা দেওয়া ছিল অন্য অর্গানাইজারদের। আমার খুব খারাপ লেগেছিল সুচিত্রাকে নিরাশ করায়। তাঁর মত টপ্পা আর ভক্তিগীতির এত সমঝদার শ্রোতাও বেশি পাওয়া যায় না। সুচিত্রা আমার ওপর রাগ করেছেন কিনা জানি না। তারপর আমাকে আর কখনও ফোন করেননি।"