দিলীপ কুমারেরও মন পড়ল সুচিত্রার দিকে। কিন্তু বিবাহিতা সুচিত্রা নিজের চারপাশে একটা সম্ভ্রমের গণ্ডি সবসময় টেনে রাখতেন।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 7 July 2025 13:41
বিমল রায় ১৯৫৪ সাল নাগাদ ভাবলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দেবদাস' কাহিনির চলচ্চিত্র রূপ দেবেন। দেবদাসের নামভূমিকায় তিনি দিলীপ কুমারকে নির্বাচন করেন। ঐ সময় দাঁড়িয়ে দিলীপ কুমারের মতো আদর্শ ব্যর্থ প্রেমিকের রোল কেউ যে করতে পারতেন না তা বলাই বাহুল্য।
চন্দ্রমুখীর রোলে বোম্বের বড় নাম বৈজয়ন্তীমালা। বৈজয়ন্তীমালা ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে যে ভাবে তালিমপ্রাপ্ত তাতে চন্দ্রমুখীর জন্য বেস্ট চয়েস। আর নায়িকা পার্বতীর চরিত্রে ভাবলেন মীনা কুমারীকে বিমল রায়। কিন্তু মীনাকুমারীর হাতে তখন এতই ছবি তিনি ডেট দিতে পারলেন না বিমল রায়কে। এরপর মধুবালাকে চয়েস করেন বিমল রায়। কিন্তু মধুবালা-দিলীপ কুমারের পূর্বঘটিত বিবাদের কারণে মধুবালা ছেড়ে দেন পার্বতীর রোল। বোম্বের দুই স্টার নায়িকা যে রোল ছেড়ে দিল সে রোল আর কার পক্ষেই বা করা সম্ভব! মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন বিমল রায়। ঠিক পরমুহূর্তেই তাঁর মনে এল ভাগ্নে-বউয়ের নাম।

যে বাঙালি এবং যে বুঝবে শরৎচন্দ্রের নায়িকা চরিত্রের জীবন বেদনা। কে তাঁর ভাগ্নে-বউ? শিল্পপতি আদিনাথ সেনের শ্যালক হতেন বিমল রায়। বিমল রায়ের বোনকে বিয়ে করেছিলেন আদিনাথ। কিন্তু বেশিদিন তাঁদের ঘর করা হয়নি। কারণ স্ত্রী অকালে মারা যান। আদিনাথ আবার বিবাহ করেন। বোন মারা গেলেও ভগ্নীপতি আদিনাথের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বিমলবাবুর। আদিনাথ সেনের দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে-মেয়েরাও তাঁকে মামা বলেই ডাকতেন। আদিনাথ পুত্র দিবানাথ সেনের বউ হলেন রমা, সবাই যাকে সুচিত্রা সেন হিসেবে চেনে।
সুচিত্রা তখন টালিগঞ্জের নায়িকা। তবু বিমল রায়ের দেওয়া সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেননি সুচিত্রা। চলে যান বোম্বে। কাস্টিং দিলীপ কুমার-সুচিত্রা সেন-বৈজয়ন্তীমালা-মোতিলাল।
'দেবদাস'ই হল সুচিত্রা সেনের প্রথম হিন্দি ছবি। ১৯৫৫তে দেবদাস সুপারহিট করে এবং আজও দেবদাস যতবারই হোক বিমল রায়ের 'দেবদাস' সর্বকালের সেরা। ছবিটি জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবিও হয়। উত্তম কুমারের আগেই সুচিত্রা সেন কালজয়ী হিন্দি ছবিতে সাফল্য পান। এ কথাও বলা উচিত, হিন্দি ছবি চয়েসে সুচিত্রা অনেক বেশি সচেতন ছিলেন উত্তমের থেকে। যদিও হিন্দি উচ্চারণ সুচিত্রার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু অপূর্ব রূপগরিমায় সুচিত্রা বলিউড নায়িকাদের ভিত নাড়িয়ে দেন। অন্তত বৈজয়ন্তীমালা তো ভীষণভাবে প্রভাব খাটিয়েছিলেন সুচিত্রা সেনের বিরুদ্ধে।

দিলীপ কুমারেরও মন পড়ল সুচিত্রার দিকে। কিন্তু বিবাহিতা সুচিত্রা নিজের চারপাশে একটা সম্ভ্রমের গণ্ডি সবসময় টেনে রাখতেন। দিলীপ কুমার সুচিত্রা সেনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেছিলেন "আমি তখন 'জুগনু' সফল হওয়ার পর 'যোগন', 'দাগ', 'দিদার'-এর মতো বেশ কয়েকটা ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছি। একটু আধটু নামডাকও হয়েছে। আমার আগে সায়গল সাহেব 'দেবদাস'-এর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ছবিটা জনপ্রিয়ও হয়েছিল। ফলে সেই সময় এমন একটা চরিত্রের প্রস্তাব পেয়ে আর ফেরাতে পারিনি। পরিচালক বিমল রায় যখন নায়িকা হিসেবে সুচিত্রা সেনের কথা বলেন তখন আমি তাঁকে চিনতাম না। বিমল দা বলেছিলেন, মেয়েটা সবে অভিনয়ে এসেছে। খুব ভালো অভিনয় করছে। সুচিত্রা ছিলেন অসম্ভব ব্যক্তিত্বশালী মহিলা। আমি যাঁদের সঙ্গে অভিনয় করেছি, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম সেরা। সুচিত্রা খুবই পরিশীলিত ও লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। মার্জিত, অল্প কথার মানুষ। কিন্তু ক্যামেরা যখনই 'ফোকাস' করত, সঙ্গে সঙ্গে জীবন্ত হয়ে উঠতেন।

বিমল রায় ও দিলীপ কুমারের এহেন সুচিত্রা-প্রীতি পছন্দ হয়নি বৈজয়ন্তীমালার। তিনিই যে ইন্ডাস্ট্রির প্রথমা সেখানে একজন আঞ্চলিক নায়িকাকে কেন এত প্রাধান্য দেওয়া হবে! বৈজয়ন্তীমালা সটান বিমল রায়ের কাছে আপিল করেন 'দেবদাস' ছবিতে তাঁর রোল পার্বতীর তুলনায় বাড়িয়ে দিতে। বিমল রায় বৈজয়ন্তীমালার মুখের ওপর জবাব দেন "শরৎচন্দ্রের দেবদাস বইটা কি পড়েছ? জানো কিছু বাংলা ভাষার সাহিত্য? যেমন লেখক লিখেছেন তাঁর সৃষ্ট চরিত্রচিত্রণ তেমনই থাকবে। না পোষালে ছবি ছেড়ে দাও।"
হেন কথায় বেশ আহত হন বৈজয়ন্তীমালা। তিনি দেখেন এমন ছবি হাতছাড়া হওয়া মানে নিজের ক্ষতি তাই তিনি আর এ প্রসঙ্গ তোলেননি। অন্যদিকে যখন দিলীপ কুমার এক নিশিবাসরে সুচিত্রাকে নিমন্ত্রণ করেন, তখন আরো ঈর্ষা বেড়ে যায় বৈজয়ন্তীমালার। যেন সুচিত্রা বলিউড ডিভার সাম্রাজ্য টলিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখেন এমনই আঁচ করেছিলেন বৈজয়ন্তীমালা। যখন ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা অভিনেতা দিলীপ কুমার, সেরা সহ অভিনেতা মোতিলাল চুনিলাল চরিত্রে ও সেরা সহ অভিনেত্রী বৈজয়ন্তীমালা বিজয়ী হিসেবে পুরস্কার পান, তখন বৈজয়ন্তীমালা চন্দ্রমুখীর জন্য সহ-অভিনেত্রীর পুরস্কার প্রত্যাখান করেন।

কারণ ফিল্মফেয়ারে নায়িকার মনোনয়নে ছিলেন সুচিত্রা সেন। বৈজয়ন্তী দাবি করেন কেন নায়িকা নন সহ নায়িকা হতে যাবেন তিনি? এক আঞ্চলিক অভিনেত্রী নায়িকার মনোনয়ন পায় কি করে? তিনিও চন্দ্রমুখীর রোলে নায়িকা হবার যোগ্য! এই যুক্তিতে ফিল্মফেয়ার গ্রহণ করেননি বৈজয়ন্তীমালা। তাঁর বিশ্বাস ছিল সুচিত্রা সেনের মতোই তাঁর চরিত্রও ছবিতে নায়িকার প্রাধান্য পাবার যোগ্য। সুচিত্রা ফিল্মফেয়ার না জিতলেও অকুণ্ঠ সম্মান পেয়েছিলেন সর্বভারতীয় স্তরে এবং পার্বতীর ঐ সাদা খোলের লালপাড় শাড়ির আঁচল লুটিয়ে দেবদাসের কাছে ছুটে যাওয়ার দৃশ্য কাল্ট হয়ে গেল চলচ্চিত্র ইতিহাসে। পরবর্তীকালে যতগুলি ভাষায় 'দেবদাস' হয়েছে প্রতিটিতে ঐ পার্বতী সুচিত্রার ভূলুণ্ঠিত আঁচল দৃশ্যের অনুকরণ করা হয়। যখন সঞ্জয় লীলা বনশালি 'দেবদাস' করেন তখনও কিন্তু মাধুরী দীক্ষিত সহঅভিনেত্রীর ক্যাটাগরি পান এবং ঐশ্বর্য রাই নায়িকার ক্যাটাগরি।