টলিউডের পরিচিত স্টাইলিস্ট স্যান্ডি ব্রেন টিবিতে আক্রান্ত হয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন। কীভাবে হয় ব্রেন টিবি, কী কী উপসর্গ দেখা দেয় এবং কেন এত বিপজ্জনক, জানুন বিস্তারিত।

চিকিৎসক অমিত ঘোষ বাঁদিকে, ডানদিকে স্যান্ডি (গ্রাফিক্স- দিব্যেন্দু দাস)
শেষ আপডেট: 10 December 2025 19:26
বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। আচ্ছা, একেই কি নিয়তির খেলা বলে? বা ভাগ্যের পরিহাস! একসময়ে টলিউডের ব্যস্ত স্টাইলিস্ট ছিলেন তিনি। টলিউডের বড় বড় তারকা তথা অভিনেত্রীকে সাজিয়েছেন নিজের ক্রিয়েটিভি দিয়ে। সেলেব তো বটেই, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে নবাগত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বেগ পেতে হত, লাগত বিরাট সময়। আজ তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি দেখে অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না।
বলছি, কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় ফ্যাশন স্টাইলিস্ট সন্দীপ ঘোষালের (Sandip Sandy Ghosal) কথা, যাঁকে স্যান্ডি বলেই চেনে টলিউডের মানুষজন। আজ চূড়ান্ত অসুস্থ। তাঁর অবস্থা দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না সাধারণ মানুষও।
বছর খানেক আগেও টলিপাড়ার বেশ চর্চিত নাম ছিল স্যান্ডি। সেই অসম্ভব ট্যালেন্টেড মানুষটি ব্রেন টিবিতে আক্রান্ত। ঠিক একথাই জানাচ্ছেন তাঁর পুরনো বন্ধু, অভিনেত্রী বিয়াস বসু। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা ভিডিওর মাধ্যমেই প্রথম স্যান্ডির কথা সকলের সামনে আসে। তিনিই জানান, স্যান্ডি ঠিক কী পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। কীভাবে টলিউডের নামজাদা লোকজনও তাঁকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। কেউ ফোন ধরেন না, কেউ খোঁজ নেন না। আর খুব বেশি কিছু মনেও নেই স্যান্ডির।
গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত সবটা বলতে পারছেন, প্রথম সিনেমা, প্রথম অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ, টুকটাক বন্ধুদের নাম, বর্তমানে তাঁর বয়স, সাল-এতটুকুই। বাকিটা হারিয়ে গেছে। শুধু হারিয়ে যায়নি ময়দানে ফিরে আসার জেদটা, লড়াইয়ের ইচ্ছেটা।
স্যান্ডির ভিডিও যত ভাইরাল হয়েছে, মানুষের মনে কৌতুহল বেড়েছে ব্রেন টিবি নিয়ে। সম্প্রতি আরেকটি ভিডিও-ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, সেখানে ব্রেনে টিবির কথা বলছিলেন এক রোগী। তাঁরও হঠাৎ এই সমস্যা হয় এবং শরীর ভাঙতে থাকে। ধীরে ধীরে বিছানায়, আর ওঠার শক্তি নেই। স্যান্ডির ক্ষেত্রে অবশ্য সেটা হয়নি।
টিবি ফুসফুসে হয়, এমনই জানেন সাধারণ মানুষ। ব্রেনেও টিবি হতে পারে! এটা খানিকটা অজানা। কেন হয়, শুধু কি ব্রেনেই হয়? কীভাবে এর থেকে বাঁচা যাবে, উপসর্গই বা কী, সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের নিউরোসার্জেন ডঃ অমিত ঘোষ।
তিনি জানালেন, শুধু মাথায় টিবি হয় এমন না, টিবি ফুসফুসের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের যেকোনও অংশে হতে পারে। মাথা, শিরদাঁড়া, পেট, স্পাইনাল টিবি, বোন টিবি বা অন্য কোনও অর্গ্যানে। মাথায় টিবি যে হয় তাকে বলা হয় 'টিবি মেনিনজাইটিস'। এটা আরেকটা ফর্মে হতে পারে। টিউমারের মতো ফর্মে হলে বলা হয়ে থাকে টিউমারকিউলোমা।
কীভাবে বুঝবেন টিবি হয়েছে?
চিকিৎসক বলছেন, 'প্রথমে হালকা জ্বর আসতে থাকে। সন্ধের দিকে সাধারণত গা গরম হয়। সারা শরীরে ব্যথা, মাথায় ব্যথা, অস্বস্তি হতে থাকে। এবার এটাই খারাপ হতে শুরু করে চিকিৎসা না পেলে। বমি ও মাথা ব্যথা বাড়তে থাকে। গা গোলানো, এসব পাল্লা দিয়ে বাড়ে। ঘাড়টা শক্ত হয়ে যায়। ব্রেন টিবির ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিসের লক্ষণগুলো থাকে। সেটা বুঝতে পারলেই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।'
ব্রেন টিবি কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
প্রাথমিকভাবে ব্লাড টেস্ট করলে ধরা পড়তে পারে। কিন্তু নিশ্চিত হওয়া যায় সিএসএফ টেস্টে। টিব মেনিনজাইটিস হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে ব্রেনের জল থাকে, সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড, সেট নিয়ে টেস্ট করা হয়, তারপর কনফার্ম হওয়া যায়। চিকিৎসক জানান, এছাড়া লাগে এমআরআই স্ক্যান।
চিকিৎসা কি খরচ সাপেক্ষ?
স্যান্ডির ক্ষেত্রে শোনা গেছে, কেউ পাশে দাঁড়াননি। তাঁর হয়তো আর্থিক সমস্যা হয়নি কিন্তু সাধারণ মানুষের হলে? এনিয়ে চিকিৎসক জানান, টিবি খুব একটা কস্টলি কিছু না। এর চিকিৎসা বিরাট খরচ সাপেক্ষ নয়। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়া যায় আর বাজার থেকে কিনতে হলেও বিরাট কিছু দাম নয়। কিন্তু খরচ সাপেক্ষ তখন হয়ে যায় যখন টিবির ফলে কনপ্লিকেশন শুরু হয়।
কী কী সমস্যা হতে পারে টিবি হলে?
ডঃ ঘোষ বলেন, 'খুব দেরিতে হলে, অ্যাডভান্স স্টেজে চলে গেলে স্ট্রোক হতে পারে, ব্লাড সার্কুলেশন হয় না ব্রেনের মধ্যে। তার জন্য প্যারালিসিস হতে পারে, ভিশন লস হতে পারে। স্পিচ লস হতে পারে। ব্রেনে জল জমতে পারে, ব্রেনে যদি জল জমে তখন তাদের অপারেশন লাগে। ছোট অপারেশন বিনামূল্যে হয়। যদি প্রাইভেটে করতে হয়, তার খরচ তো আছেই।'
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কীভাবে টিবি মেনিনজাইটিস হয়?
শরীরের অন্য কোনও জায়গায় টিবি হল, সেখান দিয়ে টিবি মেনিনজাইটিস হল বা টিউমারকিউলোমা হতে পারে। চিকিৎসকের মতে, শরীরে সংক্রমণ না থাকলেও হতে পারে এটা। আমরা যে শ্বাস নিচ্ছি, সেখান থেকে সরাসরি সংক্রমণ হতে পারে। মলে যাচ্ছি, সিনেমায় যাচ্ছি, বাসে উঠছি। কে আক্রান্ত জানি না। তার স্পুটামের ড্রপলেট অন্য একজনের শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে গেলে, সংক্রমণ হয়।
সংক্রমণ হলে ঠিক কী কী করতে হয়? আর টিবি কি ছোঁয়াচে?
চিকিৎসক জানান, কারও এই রোগ হলে প্রথম তিন মাস একটু নিজেকে আইসোলেট করে নিতে হয়। যতদিন ওষুধ চলে। এবার স্পাইনাল টিবি, বোন টিবি, পেটে বা অন্য কোনও অর্গ্যানে হলে দেড় বছর ওষুধ খেতেই হবে। ওষুধ চলাকালীন নিজেকে আইসোলেট করে রাখতে হবে।
এক্ষেত্রে তিনি উল্লেখ করেন, 'টিবির ওষুধের অনেকরকম সাইডএফেক্ট আছে। টিবির ওষুধ থেকে জন্ডিস হতে পারে, কিডনি ড্যামেজ হতে পারে, দৃষ্টিশক্তি চলে যেতে পারে, কানের নার্ভ ড্যামেজ হয়ে শ্রবণ শক্তি চলে যেতে পারে।' তাই মনিটরিং খুব বেশি করতে হয়। যারা ওষুধ খাচ্ছেন, তাদের লিভার ফাংশন টেস্ট, কিডনির টেস্ট, চোখের ডাক্তার অর্থাৎ অন্যান্য কোনও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ড্যামেজ হচ্ছে কি না, সেটা দেখতে হয় এক-দেড় মাস অন্তর। সকলের সব ওষুধ, টিবিরই সব ওষুধ সহ্য হয় না। কারও হয়তো কোনও ওষুধে জন্ডিস হচ্ছে, তখন সেকেন্ড লাইন ড্রাগ দিতে হবে। টিবি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এটা করতেই হবে।
অভিনেত্রী বিয়াসের ভিডিও থেকে জানা যাচ্ছে, স্যান্ডি এই রোগে বহুদিন আগে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি খানিকটা চলে গেছে। নতুন করে জীবন শুরু করতে চাইছেন। এখন সুস্থ। এভাবেই যেকেউ সতর্ক হলে সুস্থ হতে পারেন। শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি মাথায় রাখতে হবে। ভয় না পেয়ে রোগের সঙ্গে লড়তে হবে।