সনাতনপন্থীরা প্রতিবাদ করতেই পারেন কেন একজন অভিনেত্রীর মুখের আদলে প্রতিমার মুখ হবে? তবে জনতা-জনার্দনই যে শেষ কথা।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 22 September 2025 18:18
সাবেকি প্রতিমা আর থিমের প্রতিমার (Durga Idol) লড়াই প্রতি বছর চলে। তবে ইদানিং কালে সনাতনী প্রতিমার থেকেও জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থিমের পুজো। কিন্তু আধ্যাত্মিক মহিমায় দর্শনার্থীদের কাছে সবথেকে এগিয়ে সনাতনী প্রতিমা। সনাতনী প্রতিমা তৈরিতে সবথেকে নামকরা প্রতিমা শিল্পী ছিলেন রমেশ পাল। রমেশ পালের ঠাকুর দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ কলকাতায় আসত।
বিশেষত তাঁর তৈরি 'ফায়ার ব্রিগেড '-এর পুজো ছিল ছয়ের দশকের হায়েস্ট ডিমান্ড পুজো। এই পুজোতে রমেশ পালের প্রতিমার মুখ হত গোল নয়, ডিম্বাকৃতি। খুব সচেতন ভাবেই সেইসময়কার শীর্ষস্থানিয়া নায়িকা সুচিত্রা সেনের (Suchitra Sen) আদলে দুর্গার মুখ তৈরি করতেন তিনি। আর এ বছর, বেহালার বিখ্যাত থিম পুজোর মণ্ডপ তাঁদের প্রতিমার মুখ তৈরি করছে আর এক স্বর্ণযুগের নায়িকা, সুপ্রিয়া দেবীর (Supriya Debi) আদলে। সে যুগ থেকে এ যুগেও উত্তমকুমারের দুই নায়িকা জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়েনি।

এখন যাঁরা ষাটোর্ধ্ব তাঁদের ছোটবেলার এ পুজো আজও স্মৃতিজাগানিয়া। আর এখনকার প্রজন্মের জন্য এ যেন অতীতের গল্পকথার জীবন্তচিত্র। পঞ্চাশ ষাটের দশকে সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ছিল এই দমকলের ঠাকুর। কিংবদন্তি প্রতিমাশিল্পী রমেশ পাল তৈরি করতেন এই ফায়ার ব্রিগেডের প্রতিমা, অবিকল সুচিত্রা সেনের মতো। এই ঠাকুর দেখতেই ভিড়ের ঢল বয়ে যেত সেকালে। সেদিক থেকে প্রতিমায় থিমের চমক এনেছিল এই দমকলের ঠাকুরই। তখন কলকাতার বিখ্যাত পুজো বলতে উত্তরে বাগবাজার সার্বজনীন, মধ্য কলকাতায় ফায়ার ব্রিগেডের পুজো, মাঝে পার্কসার্কাস ময়দানের পুজো আর দক্ষিণে ভবানীপুর সঙ্ঘশ্রী। কিছুটা ভিড় দেখা যেত খিদিরপুরের ২৫ পল্লীতে। তবে তখন থিমের প্যান্ডেল বা থিমের ঠাকুর কী জিনিস, লোকে জানত না। ঠাকুর হবে ডাকের সাজের একচালার অথবা কাপড়ের শাড়ি পরা আলাদা আলাদা দুর্গা তাঁর সন্তানদের নিয়ে। সেই দুর্গার মাথার উপর শিব ঠাকুরের ছবি।
সে সময়েই ভবানীপুর সঙ্ঘশ্রীর ঠাকুরের বিশেষ চমক ছিল। সেখানে লাইটিংয়ের কাজ হত মণ্ডপের ভিতরে। তিন শক্তি থেকে মা দুর্গার সৃষ্টি বা মহিষাসুরবধ-- এগুলো মাটির মূর্তির ভিতর লাইট এন্ড সাউন্ডে দেখানো হত। ভবানীপুরের সেই ঠাকুর দেখার ছিল বিশেষ উন্মাদনা।

দমকলের পুজো ছাপিয়ে গিয়েছিল সব পুজোকে। সেখানে সুচিত্রা সেনের মুখের আদলেই রমেশ পাল তৈরি করতেন প্রতিমার মুখশ্রী। রুপোলি পর্দায় সুচিত্রা সেন ছিলেন একমাত্র নায়িকা, যাঁর মুখে ক্যামেরা সবচেয়ে বেশিক্ষণ ফোকাস করে রাখতেন চিত্রগ্রাহকরা। অন্য নায়িকাদের গানের স্লটে নায়িকার মুখ বাদেও আকাশ, গাছপালা দেখানো হতো, কিন্তু সুচিত্রা সেনের লিপের যে কোনও গান খেয়াল করে দেখা যায়, ক্যামেরা স্থির হয়ে আছে সুচিত্রার মুখেই।
এ হেন আইকনিক মুখশ্রী শুধুমাত্র সিলভার স্ক্রিনে নয়, সুপারহিট ছিল পুজো প্যান্ডেলেও। মধ্য কলকাতার দমকলের ঠাকুরের প্যান্ডেলে খুব একটা কিছু বিশেষত্ব থাকত না। সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সুচিত্রা সেন মুখশ্রীর মতো প্রতিমা এবং সেটা সবসময়ই গড়তেন রমেশ পাল।
প্রতিমার শাড়ির রং আগুন কমলা। কী অপূর্ব শিল্প, কী অপূর্ব চিন্তা। কলকাতা দমকলবাহিনী এই পুজো করত, যা দেখতে ভিড় উপচে পড়ত, যাকে বলে দর্শনার্থীর ঢল। তখনকার কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত পুজো ছিল এটিই। শেষ বোধহয় ১৯৬৩ সালে এই পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ শোনা যায়, দমকল বাহিনী নিজেদের এই পুজো নিয়ে ব্যস্ততার কারণে অন্য প্যান্ডেলে ঠিকমতো পরিষেবা দিতে পারছিল না। হামেশাই সারা কলকাতা শহরের পুজোয় বিশৃঙ্খলা হত। তাই সেসব সামলাতেই নিজেদের এই পুজো বন্ধ করে দেন তাঁরা।

পুজোর কিছু উদ্যোক্তাই পরে পাশের পার্কে মহম্মদ আলি পার্কের পুজো চালু করেন। প্রতিমায় নতুন থিম আনে মহম্মদ আলি পার্ক। সেখানে প্রতিমা বানাতেন অলক সেন। রমেশ পাল তখন কলেজ স্কোয়ারের প্রতিমা গড়া শুরু করেন।
তবে রমেশ পাল পরের দিকেও অন্য বিখ্যাত ক্লাবগুলিতে প্রতিমা বানাতেন। কলেজ স্কোয়ার, পার্ক সার্কাস, খিদিরপুর যুবক সংঘ ছাড়া একডালিয়াতেও উনি প্রতিমা দিতেন। বহু প্রতিমার মুখ তখনও কিন্তু মিলে যেত সুচিত্রা সেনের সঙ্গেই। সেসময় ফটো স্টুডিওগুলোও খুব বিখ্যাত ছিল। প্রতি স্টুডিওতেই এই রমেশ পালের তৈরি সুচিত্রা সেন মুখশ্রীর প্রতিমার ছবি থাকতই। আজকাল বহু থিমের ঠাকুর সংরক্ষণ হয় কিন্তু কিংবদন্তি রমেশ পালের এমন অসামান্য কাজ সংরক্ষণ হয়নি। কিছু ফটোগ্রাফারের ছবিতেই ধরা আছে সুচিত্রা মুখশ্রী জীবন্ত প্রতিমা। অথচ এমন ঐতিহাসিক মূর্তি জাদুঘরে থাকতে পারত।
সুচিত্রা সেনের পর বহু দশক পর, এবার থিম পুজোর প্রতিমাতে কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন সুপ্রিয়া দেবী। সুপ্রিয়ার মুখ সে অর্থে দেবীমুখ একেবারেই নয়। তাহলে সুপ্রিয়া কেন? আসলে এই ২০২৫ ঋত্বিক ঘটকের শতবর্ষ। সেই কারণে বেহালা আদর্শ পল্লী তাঁদের এ বছরের থিম করছে 'মেঘে ঢাকা তারা' ও নীতা। সুপ্রিয়া দেবীর ল্যান্ডমার্ক চরিত্র 'নীতা' সেই নীতা সুপ্রিয়া দেবীর মতো অবিকল করা হচ্ছে দেবীমুখ। 'যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে' সুপ্রিয়ার সেই হংসীগ্রীবা তৈরি করছেন শিল্পী অভীক সেন ও শুভম বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা মণ্ডপ জুড়ে ফুটে উঠছে দেশভাগের ছবি। আঁকা হচ্ছে ঋত্বিক ঘটকের ছবি। মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহার করা হচ্ছে টিন, ইট, বাঁশ। বেহালা ১৪ নম্বর স্টপেজে নেমে রায় বাহাদুর রোড ধরে বেশ কিছুটা এলে পাবেন আদর্শ পল্লী (Behala Adarsho Pally)। আবার নিউ আলিপুর বুড়ো শিবতলা ধরে এলেও সহজে পাবেন এই ক্লাব। নতুন প্রজন্মের কাছে 'দাদা আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম' আর নীতা নতুন ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল ঋত্বিক শতবর্ষে।
)
সনাতনপন্থীরা প্রতিবাদ করতেই পারেন কেন একজন অভিনেত্রীর মুখের আদলে প্রতিমার মুখ হবে? তবে জনতা-জনার্দনই যে শেষ কথা।