দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শেষ করে শান্ত ঘুমের মধ্যেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন অভিনেতা সিদ্ধার্থ মালহোত্রার বাবা সুনীল মালহোত্রা।

শেষ আপডেট: 18 February 2026 13:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শেষ করে শান্ত ঘুমের মধ্যেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন অভিনেতা সিদ্ধার্থ মালহোত্রার বাবা সুনীল মালহোত্রা। একসময় যিনি সমুদ্রকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, যাঁর কণ্ঠে ছিল নির্দেশের দৃঢ়তা, সেই মানুষটি শেষ পর্যন্ত লড়লেন নিঃশব্দ সাহসে, কোনও অভিযোগ ছাড়াই। প্রাক্তন মার্চেন্ট নেভি ক্যাপ্টেন সুনীল মালহোত্রার জীবন ছিল শৃঙ্খলা, সততা আর আত্মমর্যাদার এক বিরল উদাহরণ। (Siddharth Malhotra)
বাবার অসুস্থতা নতুন ছিল না। বহুদিন ধরেই শরীর তাঁকে ধীরে ধীরে আটকে দিচ্ছিল। গত বছর লিলি সিং–এর সঙ্গে এক কথোপকথনে সিদ্ধার্থ অকপটে স্বীকার করেছিলেন, বাবার অসুস্থতা তাঁকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেই ভয়, সেই অস্থিরতা অনেক সময় তাঁকে নিজের মায়ের প্রতিই কঠোর করে তুলেছিল। কারণ তিনিই ছিলেন বাবার প্রধান সহায়, প্রতিদিন ওষুধ, চিকিৎসা আর যত্নের সমস্ত দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।
সিদ্ধার্থ বলেছিলেন, কখনও কখনও তাঁর নিজের ভয় আর রাগের ভার গিয়ে পড়ত মায়ের ওপর। অথচ একদিন, হঠাৎ এক সাধারণ সকালের চা–কফির আড্ডায়, মা ফিরে গিয়েছিলেন বিশ বছর আগের স্মৃতিতে। সেইসব দিন, যখন সিদ্ধার্থ নিজের জীবন গড়ার পথে ব্যস্ত, কিংবা বাড়ির বাইরে, আর তাঁর মা একা হাতে সামলাচ্ছেন এক অসুস্থ স্বামী, এক অস্থির সংসার। সেই কথাগুলো শুনে সিদ্ধার্থ যেন নতুন করে বুঝেছিলেন— তাঁর মা কত কিছু লুকিয়ে রেখেছিলেন, কতটা যন্ত্রণা নিজের ভিতরে চেপে রেখে পরিবারকে আগলে রেখেছিলেন।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর বাবা কী যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তা কখনও পুরোটা জানতে দেননি তাঁর মা। আর সেই উপলব্ধি তাঁর ভিতরে একরকম অপরাধবোধও তৈরি করেছিল। তিনি মনে করেছিলেন, মায়ের সেই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্য তিনি কখনও দেননি। সেই দিন থেকেই তিনি নিজেকে বদলানোর চেষ্টা শুরু করেন— আরও সংবেদনশীল, আরও ভালোবাসাপূর্ণ হয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি নেন নিজের কাছে।
বাবার চলে যাওয়ার পর, মঙ্গলবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় সিদ্ধার্থ লিখেছিলেন এক হৃদয়ভাঙা শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি মনে করলেন তাঁর বাবাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে, যার সততা, মূল্যবোধ আর সংস্কৃতি ছিল বিরল। তিনি লিখেছিলেন, তাঁর বাবা কখনও নিজের নীতির সঙ্গে আপস করেননি। তাঁর মধ্যে ছিল কঠোর শৃঙ্খলা, কিন্তু তাতে কখনও নিষ্ঠুরতা ছিল না। ছিল দৃঢ়তা, কিন্তু অহংকার ছিল না। জীবনের কঠিনতম পরীক্ষার মধ্যেও তিনি আশাবাদ হারাননি।
সমুদ্রের ওপর কর্তৃত্ব করা সেই ক্যাপ্টেন, পরে যখন স্ট্রোকের কারণে হুইলচেয়ারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন, তখনও তাঁর আত্মা কখনও ভেঙে পড়েনি। সিদ্ধার্থ লিখেছিলেন, তাঁর বাবার সততাই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। তাঁর শক্তি প্রতিদিন পথ দেখায়। তাঁর ইতিবাচকতা এখনও পরিবারের ভিত শক্ত করে রেখেছে। তিনি শান্তিতে ঘুমিয়ে চলে গিয়েছেন, কিন্তু যে শূন্যতা রেখে গেছেন, তা কোনওদিন পূরণ হবে না। তবুও তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, বাবার নাম, তাঁর মূল্যবোধ আর তাঁর আলো বয়ে নিয়ে চলবেন সারাজীবন।
আজ, নিজে এক কন্যাসন্তানের বাবা হয়ে, সিদ্ধার্থ আরও গভীরভাবে বুঝতে পারেন বাবা হওয়ার মানে। সাংবাদিক বরখা দত্ত–এর সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বলেছিলেন, তাঁর জীবনের প্রতিটি সকাল এখন তাঁর মেয়েকে ঘিরেই শুরু হয়। ঘুম ভাঙার পর তাঁর ছোট্ট মেয়ের স্ট্রেচ করা, তার সঙ্গে সময় কাটানো— এটাই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তিনি হেসে বলেছিলেন, তিনি জীবনে এতবার হারেননি, যতবার তিনি হারেন এমন একজনের কাছে, যে এখনও ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। এখন তিনি আর বাড়ির নায়ক নন— তাঁর মেয়েই সেই বাড়ির আসল তারকা।
এই নতুন ভূমিকা তাঁকে আরও এক উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়েছে। ছোটবেলায় তাঁর বাবা, পেশার কারণে, সবসময় পাশে থাকতে পারেননি। সমুদ্রের ডাকে তাঁকে দূরে যেতে হত বারবার। সেই অভাব তিনি অনুভব করেছেন নিজের বেড়ে ওঠার পথে। আর তাই আজ তিনি চান, তাঁর মেয়ের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি উপস্থিত থাকুন। তিনি বলেন, আজকের প্রজন্মের বাবা–মায়েরা কাজ আর পরিবারের মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য খুঁজে পেতে চায়। তিনি নিজেও সেই পথেই হাঁটছেন, নিজের মতো করে, প্রতিদিন একটু একটু করে।