শহর এখনও ভুলতে পারেনি দগদগে সেই রাত। সেই প্রশ্ন, সেই ক্ষত, সেই অসহায়তা—যার নাম আজ আরজি কর। কিন্তু বিচার কি এগোচ্ছে? নাকি আইনের পথেই আটকে যাচ্ছে সত্য?

শেষ আপডেট: 18 February 2026 13:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শহর এখনও ভুলতে পারেনি দগদগে সেই রাত। সেই প্রশ্ন, সেই ক্ষত, সেই অসহায়তা—যার নাম আজ আরজি কর। কিন্তু বিচার কি এগোচ্ছে? নাকি আইনের পথেই আটকে যাচ্ছে সত্য? (taapsee pannu, assi, RG Kar Case , rg kar murder case )
সোমবার বিচার ভবনের আদালত কক্ষে যখন Enforcement Directorate নিজেদের বক্তব্য রাখছিল, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। RG Kar Medical College and Hospital–এর দুর্নীতি মামলায় সন্দীপ ঘোষ-সহ চার অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা পড়লেও, বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত থমকে আছে। কারণ, রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের কাছ থেকে এখনও মেলেনি প্রয়োজনীয় অনুমোদন। এই ‘স্যাংশন’ ছাড়া আইনের পরবর্তী ধাপে এগোনো সম্ভব নয়। ফলে চার্জশিট থাকা সত্ত্বেও বিচার শুরু করার পথ বন্ধ।
এই আইনি জটিলতার মাঝেই ক্ষোভ আর অবিশ্বাস আরও তীব্র হয়ে উঠছে নির্যাতিতার পরিবারের মধ্যে। তাঁদের আইনজীবী জানিয়েছেন, শুধু স্থানীয় পুলিশ নয়, তদন্তে Central Bureau of Investigation–এর ভূমিকাও খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। পরিবারের আশঙ্কা, এই ঘটনায় হয়তো এমন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব জড়িয়ে থাকতে পারেন, যাঁদের ছায়া এখনও তদন্তের উপর পড়ে রয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন স্পষ্ট—সত্যিই কি সব সত্য সামনে এসেছে?
এই সময়েই শহরের অন্য প্রান্তে আরেকটি আলো জ্বলল, কিন্তু সেই আলোয়ও ছায়া ছিল। নিজের নতুন ছবি ‘আস্সি’–র বিশেষ প্রদর্শনের জন্য কলকাতায় এলেন অভিনেত্রী তাপসী পান্নু। ছবিটি শুধুমাত্র একটি গল্প নয়, বরং এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় দর্শককে। আদালত কক্ষের ভেতরে চলা এক নিরলস লড়াই, যেখানে অজানা যৌন নির্যাতনের ঘটনা, আইনের ফাঁকফোকর, পুলিশি দুর্নীতি আর সমাজের নীরবতা—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর সত্যের প্রতিচ্ছবি। সেই সঙ্গে তুলে ধরা হয় একজন বেঁচে ফেরা মানুষের পথচলা—যেখানে প্রতিটি শ্বাস যেন একেকটি লড়াই।
এই ছবির মর্ম আরও ভারী হয়ে ওঠে একটি পরিসংখ্যানে—এই দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
ছবির শেষ দৃশ্য মুছে গেলে, আলো জ্বলে ওঠে প্রেক্ষাগৃহে। দর্শকদের মধ্যে তখনও নিঃশব্দ ভার। সেই সময় মঞ্চে ওঠেন তাপসী। হাতে মাইক। সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে প্রশ্ন আসে—শহর এখনও আরজি করের ঘটনার অভিঘাত সামলে উঠতে পারেনি, এমন শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করার পর তাঁর অনুভূতি কী?
প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই তাপসী কথা শুরু করেন।
তিনি শান্ত গলায় বলেন, “আপনারা আমাকে আরজি কর নিয়ে কথা বলতে বলছেন। কিন্তু গতকাল আমি পাটনায় ছিলাম। সেখানে আমাকে NEET পরীক্ষার্থী এক মেয়ের ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। আজ সকালে খবরের কাগজে পড়লাম, দেড় বছরের একটি শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করেছে তার বাবারই এক বন্ধু, সেই শিশুটির নিজের বাড়িতে। এখন বলুন তো, আমি কোন ঘটনা নিয়ে কথা বলব?”
একটু থেমে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “আমি কি শুধু একটি ঘটনা নিয়ে কথা বলব, নাকি সেই বাকি ৭৯টি ঘটনা নিয়ে কথা বলব, যেগুলো একই দিনে ঘটে? একটি ঘটনার জন্য সবাই রাস্তায় নেমে আসে, প্রতিবাদ হয়, কিন্তু বাকি ঘটনাগুলো নিয়ে কেন নীরবতা?” তাঁর কণ্ঠে ছিল না কোনও উত্তেজনা, ছিল স্বীকারোক্তি।
তিনি বলেন, “আমার কাছে প্রতিটি ঘটনাই সমানভাবে বেদনাদায়ক। তাই আমি কোনও নির্দিষ্ট রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই না। আমি জানতে চাই, কোথায় পাওয়া যাবে সত্যিকারের ন্যায়বিচার। আমরা ‘আস্সি’ ছবিতে সেটাই দেখাতে চেয়েছি। একটি রায় কি সত্যিই এই দেশে ধর্ষণ বন্ধ করে দিতে পারে?”
এই প্রশ্নের উত্তরও তিনি নিজেই খুঁজতে চান।
“যদি মনে হয় একটি রায় সব বদলে দিতে পারে, তাহলে আমরা সবাই সেই রায়ের পাশে দাঁড়াতে পারি। কিন্তু যদি জানি, একটি রায় কোনওদিনই এই অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না, তাহলে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে। আমাদের নিজেদের ঘরের ভেতরে তাকাতে হবে। পরিবারে, সমাজে—সেখানে কোথায় তৈরি হচ্ছে এই মানসিকতা? কারা এই মানুষগুলো? কেন তারা এমন করে? কীভাবে তৈরি হয় এই বিকৃত চিন্তা? একটি ঘটনার প্রতিবাদ করলেই হবে না। এর শিকড় খুঁজে বের করতে হবে।”
তাপসীর কথাগুলো ছিল না শুধুই একজন অভিনেত্রীর বক্তব্য। সেগুলো ছিল এক নাগরিকের প্রশ্ন, এক নারীর ব্যথা, এক মানুষের দায়বদ্ধতা।
একদিকে আদালতে থেমে থাকা বিচারপ্রক্রিয়া, অন্যদিকে পরিবারের হতাশা, আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন অভিনেত্রীর সরল কিন্তু নির্মম প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই ন্যায়বিচার চাই, নাকি শুধু একটি ঘটনার ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া?
আরজি করের ক্ষত এখনও শুকোয়নি। কিন্তু হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন আর আদালতের নয়—এটা আমাদের সমাজের।