আজ রবিবার, ৫ এপ্রিল। দেখতে দেখতে কেটে গেল একটা সপ্তাহ। তবে ঘটনাবহুল এই সপ্তাহে বিভিন্নভাবে যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে প্রযোজনা সংস্থার ওপর, এখন দেখার, তাদের পক্ষ থেকে কতটা সত্যি সামনে বের করে আনা সম্ভবপর হয়।
_0.jpeg.webp)
শেষ আপডেট: 5 April 2026 16:29
জয়িতা চন্দ্র
২৯ মার্চ ২০২৬, সেদিনও এই সময় রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Arunodoy Banerjee News) ঘড়ির কাঁটাটা ছিল সচল। জানতে না, জীবনের শেষ কয়েকমুহূর্ত বাঁচছেন তিনি। জানা যায় না, জানতে পারেন না কেউ। জীবনের শেষ শট দিতে তখন তিনি প্রস্তুত। সামনে লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন। ‘কাট’ শোনা হল না।
রবিবার সন্ধ্যায় আর পাঁচটা দিনের মতোই সকলেই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আচমকাই মেলে দুঃসংবাদ। রাহুল (Rahul Arunodoy Banerjee Death) আর নেই। কোন রাহুল? কে রাহুল? ভুয়ো খবর... এই তিন বাক্যেই অধিকাংশ মানুষ সেদিন ফোন রেখেছিলেন। প্রথম ১০ মিনিট এড়িয়ে গিয়েছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কতই না ভুয়ো তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। ততক্ষণে সত্যি রাহুল আর নেই। ক্রমেই দমবন্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হতে শুরু করে। মুহূর্তে ওঠে হাজারও প্রশ্ন। যার উত্তর আজও অধরা।
রবিবার: (রাহুলের মর্মান্তিক মৃত্যু)
প্রাথমিক সূত্রে খবর মেলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রয়াত রাহুল । ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে তালসারিতে জলে ডুবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অভিনেতা। মুহূর্তে ভাইরাল হয় তাঁর সহকর্মী শ্বেতার একটি ক্লিপিং। যেখানে চিৎকার করে তাঁকে বলতে শোনা যায়-- ‘এই তো আমরা একসঙ্গে শুটিং করছিলাম। আমিও পড়ে গেছি। আমার কিছু হয়নি। রাহুলদা কোথায়?’ ভিডিয়ো দেখে সকলের বুক কেঁপে উঠেছিল। ততক্ষণে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এ মৃত্যু ঘিরে নানা জনের নানা মত। কোরও কথায় কারও সঙ্গে মিলছে না।
খবর সামনে আসার পরই রাহুলের বাড়ির সামনে ভিড় জমতে থাকেন অনুরাগীরা। সে রাতে অভিনেতার বেশ কিছু বন্ধু রওনা দেন দিঘা হাসপাতালের উদ্দেশে। অন্যদিকে রাহুলের বাড়িতে ছুটে যান অভিনেতার স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার।
সোমবার: (রাহুলের শেষকৃত্য)
সোমবার সকালে কথা মতো তমলুক হাসপাতালেন ময়নাতদন্ত হয় রাহুলের। প্রাথমিক রিপোর্ট সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাহুলের ফুসফুলের আকৃতি হয়ে গিয়েছে দ্বিগুণ, নোনা জল ও বালি ভর্তি, ডাক্তারের অনুমাণ প্রায় একঘণ্টার বেশি সময় তিনি জলে ছিলেন। এরপর রাহুলের দেহ কলকাতায় আনা হয়। আর এদিন বিকেলে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় অভিনেতার। এদিন রাহুলকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপচে পড়ে ভিড়। গানে গানে শেষ বিদায় জানানো হয় প্রয়াত অভিনেতাকে।
মঙ্গলবার: (চাপ বাড়ে প্রযোজনা সংস্থার ওপর)
ততক্ষণে কেটে গিয়েছে ৪৮ ঘণ্টা। প্রযোজনা (ম্যাজিক মোমেন্টস) সংস্থা চুপ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যা বলছে, তা সকলের মুখের কথার সঙ্গে মিলছে না। কেউ বলছেন ‘মুহূর্তে তুলে নেওয়া হয়’, কেউ বলেন,‘সময় লেগেছে’, কারও কথায়, ‘প্যাকআপ হয়ে গিয়েছিল’, কারও কথায়, ‘রাহুল নিজেই জলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন’, সত্যি কোনটা? প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ততক্ষণ বহু মানুষ এই বিষয় পোস্ট করে ফেলেছেন। শিল্পীরা উত্তর চেয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
যদিও স্টুডিও পাড়ায় গিয়ে দেখা গেল, এদিন উক্ত প্রযোজনা সংস্থার শুটিং বন্ধ। ততক্ষণে খবর মেলে বিকেলে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে আর্টিস্ট ফোরামের সদস্যের দেখা গিয়েছে। সেখানে গেলে জানা যায়, অল্প সময় তাঁরা কথা বলেই বেরিয়ে পড়ছেন। কেন ভেস্তে যায় সেদিনের মিটিং? তার কোনও উত্তর মেলেনি। এরপরই মিটিং বসে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে। আর্টিস্ট ফোরামের সদস্যদের সঙ্গে এদিন মিটিং-এ উপস্থিত ছিলেন প্রিয়াঙ্কা সরকারও।
বুধবার: (বিবৃতি জারি করে প্রযোজনা সংস্থা)
বুধবার সকাল হতেই শোনা যায় রাহুলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে FIR করতে চলেছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। অপর একটি FIR করার কথা আর্টিস্ট ফোরামেরও। তবে থানা চত্বরে দেখা মেলেনা কারও। এদিকে ততক্ষণে প্রযোজনা সংস্থা থেকে একটি বিবৃতি সাংবাদিকদের হাতে আসে। যেখানে বেশকিছু বিষয় উল্লেখ থাকলেও কোনও প্রশ্নেরই স্পষ্ট জবাব ছিল না। সেখানে তদন্তে সহযোগিতা করার উল্লেখ থাকে, সেখানে রাহুল জলে ডুবে যাওয়ার পর কী কী করা হয়েছে তার উল্লেখ থাকে, এমনকী লীনা গঙ্গোপাধ্য়ায়ের মহিলা কমিশনের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার উল্লেখও থাকে। তবে সেখানে নিরাপত্তা ছিল কি না! অনুমতি ছিল কি না! তার কোনও উল্লেখ ছিল না। প্রশ্ন থেকেই যায়, এখনও কেন স্ক্রিপ্ট ও শেষ মুহূর্তের ভিডিয়ো সামনে আনা হচ্ছে না?
এর কিছুক্ষণ পরই রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে আরও এক মিটিং বসে আর্টিস্ট ফোরামের। সেখানেই স্থির করা হয়, কী হতে চলেছে তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপ। এরপরই বিস্তারিত তথ্য চেয়ে প্রযোজনা সংস্থাকে একটি চিঠি দেয় আর্টিস্ট ফোরাম।
বৃহস্পতিবার: (বিচার চেয়ে পথে নামার ডাক)
এদিন সকাল থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কার্ড ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে উল্লেখ থাকে, প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে পথে নামছেন শিল্পীরা। স্থান: শনিবার বিকেল ৪টে, টেকনিশিয়ান স্টুডিও। সকলের হাতে হাতে একদিকে যখন ছড়িয়ে পড়ছিল এই কার্ড, ঠিক তখনই একশ্রেণি প্রশ্ন তোলে, ‘কে ডেকেছে এই প্রতিবাদ মিছিল?’ যার উত্তর মেলে রাতে। ইম্পার সভাপতি পিয়া সেন জানান, এই মিছিলেন ডাক দিয়েছেন তাঁরা। তবে এখানে কোনও পক্ষের বিষয় না টেনে, যাতে সকল ইচ্ছুক শিল্পীরা যোগদান করেন, সেই কথাই বলেন তিনি। এর কিছুক্ষণ পর আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে আরও একটি বিবৃতি জারি করে জানানো হয়, এই বিষয় তারা কিছু জানতেন না, তবে শিল্পীরা যোগ দিতেই পারেন।
শুক্রবার: (আর্টিস্ট ফোরামের জরুরি মিটিং)
শুক্রবার সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় শিল্পীদের প্রতিবাদী পোস্ট প্রতিদিনের মতোই চোখে পড়ে। তবে দিনভর তেমন কিছু ঘটেনি। তবে এদিন রাতে আচমকাই জরুরি তলব আসে আর্টিস্ট ফোরামের থেকে। সাংবাদিকদের জানানো হয়, তারা প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে FIR করতে চলেছেন।
শনিবার: (জোড়া FIR, পথে শিল্পীরা)
শনিবার বেলা থেকেই রিজেন্ট পার্ক থানা চত্বরে ভিড় জমে। দুপুর ৩টে নাগাদ আর্টিস্ট ফোরামের সদস্যদের সঙ্গে থানায় উপস্থিত হন প্রিয়াঙ্কা সরকার। সেখানে প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে FIR দায়ের করা হয় (ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬১(২), ১০৬(১) এবং ২৪০ ধারায় মামলা রুজু)।
অন্যদিকে রাহুলের মৃত্যুর নিরপক্ষ তদন্তের দাবি ও বিচার চেয়ে পথে নামেন শিল্পীরা। অন্যদিকে তখন তালসারির উদ্দেশে রওনা দেন প্রিয়াঙ্কা সরকার, সঙ্গে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, যিশু সেনগুপ্ত ও সৌরভ দাস। সেখানে গিয়ে FIR দায়ের করেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। মধ্যরাতেই কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন সকলে।
আজ রবিবার, ৫ এপ্রিল। দেখতে দেখতে কেটে গেল একটা সপ্তাহ। তবে ঘটনাবহুল এই সপ্তাহে বিভিন্নভাবে যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে প্রযোজনা সংস্থার ওপর, এখন দেখার, তাদের পক্ষ থেকে কতটা সত্যি সামনে বের করে আনা সম্ভবপর হয়। চিত্রনাট্যে ঠিক কী লেখা ছিল? দ্রোনের ফুটেজ কোথায়? সবটাই এখন দাবি করছেন শিল্পীরা। ‘সহজ অন্তত জানুক ওর বাবা কেন চলে গেল’, সকলের সামনে দাঁড়িয়ে একথা বলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সকলেই জানেন, শত প্রতিবাদেও ফিরবেন না রাহুল। তবে শিল্পীদের নিরাপত্তা, প্রকৃত সত্যের দাবিতে সোচ্চার টলিপাড়ার এই লড়াই এখনই থামার নয়, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন শিল্পীরা।