সঞ্জয় মিশ্রর জীবনের নীরব ভালবাসার গল্প—যেখানে তাঁর বাবার সঙ্গে সম্পর্ক, অভিমান, নির্ভরতা ও ভালবাসা মিশে এক অন্তরঙ্গ মানবিক চিত্র হয়ে উঠেছে।

সঞ্জয় মিশ্র।
শেষ আপডেট: 15 June 2025 16:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পর্দায় তাঁর উপস্থিতি মানেই একরাশ হাসি, একগুচ্ছ সংলাপ আর জীবনের প্রতি এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি। বলিউডের অন্যতম কমেডিয়ান তিনি। সঞ্জয় মিশ্র। তবে আমাদের চোখে চিরহাস্যোজ্জ্বল চরিত্র হলেও, তাঁর এই রসবোধের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর আবেগ ও নিঃশব্দ বেদনার উপাখ্যান। সে উপাখ্যানের নেপথ্যে রয়েছেন তাঁর বাবা।
সঞ্জয় মিশ্র ১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শাহরুখ খানের ছবি 'ওহ ডার্লিং ইয়ে হ্যায় ইন্ডিয়া' দিয়ে বলিউডে প্রবেশ করেন। এতে তার একটি ছোট রোল ছিল। ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'আঁখো দেখি' সঞ্জয় মিশ্রের কেরিয়ারে একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এর জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ফিল্মফেয়ার সমালোচক পুরস্কার পান।
তাঁর কেরিয়ারের গ্রাফ যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখনই আচমকা বড় ধাক্কা খান অভিনেতা। তারপর হঠাৎই সবকিছু ছেড়ে মুম্বই থেকে ঋষিকেশে পৌঁছান এবং মাত্র কয়েকশো টাকা দৈনিক মজুরিতে একটি ধাবায় কাজ শুরু করেন। এর পরেই, তাঁর বাবাও চলে যান পৃথিবী ছেড়ে।
সঞ্জয় মিশ্র বহুবার বহু ইন্টারভিউতে বলেছেন, বাবার কথা উঠলেই তাঁর চোখ অজান্তেই ভিজে ওঠে। কারণ, বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এক অনন্য অনুভবের, না-জানানো ভালবাসার। তাঁর বাবা ছিলেন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ, নির্লিপ্ত এবং শান্ত।
সঞ্জয় বলেছেন, শৈশবে সঞ্জয়ের মনে হতো, বাবা বুঝি তাঁকে ভালবাসেন না। কারণ, বাবা কখনও তাঁকে কোলে নেননি, জড়িয়ে ধরেননি, মুখে বলেননি, 'ভালবাসি তোকে...' কিংবা 'শাবাশ!'

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্জয় বুঝেছেন, ভালবাসা মানেই যে তা বলে বোঝাতে হবে, তা নয়। তা অনেক সময় কাজের মধ্যেই তা থাকে, নিরুচ্চারে। অদৃশ্য ছায়ার মতো।
সঞ্জয়ের মনে পড়ে, কেরিয়ারে সাফল্য পাওয়ার আগে যখন তিনি দিল্লিতে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় পড়তে যান, তখন বড় শহরের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতেন। একবার তিনি বাবাকে লিখেছিলেন, 'বাবা, আমার টাকা শেষ হয়ে গেছে।' কোনও উত্তর আসেনি। তবে এক সপ্তাহ পরেই সঞ্জয়ের উদ্বেগ ও অভিমান খানখান করে দিয়ে, ডাকপিয়ওনের হাতে একটি মানি অর্ডার এসেছিল। কোনও চিঠি ছাড়াই, শুধু টাকা। কোনও শব্দের প্রয়োজন হয়নি, শুধু ভালবাসার নির্ভরতা ছিল সেই মানিঅর্ডারে।
সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় মিশ্র নিজেই জানান, একসময়ে কেরিয়ারের চুড়োয় পৌঁছেও যখন নানা ব্যক্তিগত যন্ত্রণায় ছারখার, তখন তিনি মানসিক শান্তির সন্ধানে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হৃষিকেশে গিয়ে গঙ্গার ধারে একটি ধাবায় অমলেট বানানোর কাজ শুরু করেন। ধাবার মালিক তাঁকে বলেছিলেন যে, দিনে ৫০টি কাপ ধুতে হবে এবং বিনিময়ে ১৫০ টাকা করে দেবেন।
তেমনই চলছিল। এমন সময়ে খবর এল, বাবা আইসিইউতে। সব কিছু ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন সঞ্জয়। আইসিইউ-এর বাইরে বসে থাকা সেই মুহূর্ত আজও সঞ্জয়ের মনের ক্যানভাসে আঁকা আছে। সেদিন সঞ্জয়ের মনে হয়েছিল, 'আমি ভাবছিলাম, কখনও কি বাবাকে বলেছি, আমি ওঁকে কতটা ভালবাসি?'
সঞ্জয় জানান, যখন বাবা প্রয়াত হন, তখনই তিনি তাঁকে প্রথম স্পর্শ করেছিলেন, কোনওরকম ভয় ছাড়া, দ্বিধা ছাড়া। চোখের জল থামছিল না তাঁর। কারণ ততক্ষণে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, যে মানুষটি কখনও ভালবাসার কথা বলেননি, উৎসাহ দেননি, প্রশংসা করেননি, তিনিই আসলে জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয় ছিলেন। তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল সন্তানের মঙ্গল, সন্তানের উন্নতির প্রচেষ্টা।

সঞ্জয় বলেন, 'বাবারা সত্যিই কম কথা বলেন। তাঁরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশে হয়তো সঙ্কোচ বোধ করেন। কিন্তু তাঁদের ভালবাসা মিশে থাকে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি সাফল্যে, প্রতিটি প্রয়োজনের মুহূর্তে। তাঁরা আমাদের জীবনের নীরব পাহারাদার, আমাদের ছাদ।'
আবেগে ভেসে গিয়ে সঞ্জয় বলতে থাকেন, 'আমার বাবা আমার প্রথম নায়ক। তাঁরা যখন থাকেন, আমরা বুঝি না। কিন্তু তাঁদের চলে যাওয়ার পরেই টের পাই, ভিত্তিটা কতটা শক্ত ছিল।'
তবে এই সব বিপর্যয়ের দিন পার করে এসে ফের বদলে যায় সঞ্জয় মিশ্রর ভাগ্য৷ পরিচালক রোহিত শেট্টি সঞ্জয় মিশ্রকে আবার মুম্বইতে ডাকেন এবং তাঁকে 'অল দ্য বেস্ট' ছবিতে কাজ দেন। এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন পুরোপুরি কেরিয়ারে মনোযোগ দিয়েছেন অভিনেতা সঞ্জয় মিশ্র। সূত্রের খবর, প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা উপার্জন করেন সঞ্জয়। অভিনেতার বার্ষিক আয় প্রায় ৬ কোটি টাকা। এবং তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১১০ কোটি টাকা।

তবে সেসব পার করে যখন সঞ্জয় তাঁর বাবার কথা বলেন, তখন আজও বাঁধ মানে না চোখের জল। এই কথাগুলো যেন মনে করিয়ে দেয়, বাবাকে জড়িয়ে ধরার জন্য, ভালবাসি বলার জন্য অপেক্ষা না করাই ভাল। আজই সেই দিন হোক, যেদিন বাবার হাত দুটো ধরে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া যাবে, তিনিই জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা, সবচেয়ে শীতল ছায়া, সবচেয়ে গভীর আবেগ!