রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুকে ঘিরে ড্রাইভার বাবলুর বয়ানে উঠে এল সমুদ্রের জোয়ার, স্রোত, গভীরতার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

রাহুল ও তাঁর ড্রাইভার বাবলু।
শেষ আপডেট: 30 March 2026 16:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তালসারির রবিবারের বিকেলটা এখন শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি একের পর এক প্রশ্নে জড়ানো এক জটিল সময়রেখা। আর সেই সময়রেখার সবচেয়ে কাছের সাক্ষ্য এবার উঠে এল, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Arunoday Banerjee) গাড়িচালক বাবলুর মুখে। যিনি শুধু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নন, অভিনেতার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীও ছিলেন।
বাবলুর বয়ান অনুযায়ী, ঘটনাটা ঘটে একেবারে শ্যুটিংয়ের শেষ মুহূর্তে, যখন পুরো ইউনিট প্রায় প্যাকআপের মুখে। ঠিক সেই সময়েই রাহুল জলে নামেন (Rahul Arunoday Banerjee Death Mystery)। তবে তিনি শ্যুটিংয়ের প্রয়োজনে নেমেছিলেন, নাকি ব্যক্তিগতভাবে— তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত নন তিনি নিজেও। তাঁর কথায়, 'শ্যুটিং একেবারে শেষের পথে ছিল। প্যাকআপের মুখে ছিল পুরো টিম। এমন সময়ে এই ঘটনা ঘটে। রাহুলদা যখন জলে নেমেছিলেন, সেটা শ্যুটিংয়েরই অংশ কিনা জানি না'
এই অনিশ্চয়তাই গোটা ঘটনার প্রথম ধোঁয়াশা।
বাবলু জানান, রাহুল জলে নামার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ড্রাইভারের কথায়, 'জলের গভীরতা ভালই ছিল। আমরা যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে বেশি ছিল। আমরা বুঝতে পারিনি। জোয়ার এসেছিল, ভাল স্রোতও ছিল জলের।' অর্থাৎ, সমুদ্র সেই সময়ে উপর থেকে যতটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল, জলের গভীরতা বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এই তথ্য যেন গোটা ঘটনার একটা বড় সত্যকে সামনে আনল।
তবে তারপরেই আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বাবলু বলেন, 'ইউনিটের টেকনিশিয়ান ছেলেদের মধ্যে ৬-৭ জন নিজেদের জীবন বাজি রেখে জলে ঝাঁপ দিয়েছিল দাদাকে তুলতে। কিন্তু কিছু করতে পারেনি। সহ-অভিনেত্রীও রাহুলদার সঙ্গে ছিলেন, উনি কোনও রকমে পাড়ে ফিরে আসেন। বিধ্বস্ত হয়ে যান, কিন্তু ঠিক ছিলেন। তবে দাদাকে তুলতে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়, ততক্ষণে অনেকটাই জল খেয়ে নিয়েছিলেন দাদা। সাঁতার জানতেন, হয়তো সেই সময়ে নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন। সাঁতার কোনও কাজে লাগেনি।'
এই ‘দেরি’-ই এখন তদন্তের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টও তেমনটাই বলছে। রাহুলের ফুসফুসে যে পরিমাণ নোনাজল ও বালি ঢুকে গিয়েছে, তা অনেকক্ষণ জলে না থাকলে হওয়া সম্ভব নয়। বাবলুও স্পষ্ট করে বলেছেন, সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লেও, রাহুলকে তুলতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। ততক্ষণে তিনি অনেকটাই জল খেয়ে ফেলেছিলেন।
যদিও তাঁকে জল থেকে তোলার পর প্রথমে মনে হয়েছিল, এখনও হয়তো আশা আছে। চাপ দিয়ে শরীর থেকে জল বার করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, কিছুটা জল বেরিয়েও আসে। এমনকি তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসও তখন চলছিল বলে দাবি করেছেন তিনি।
এরপর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ড্রাইভার নিজেও পিছন পিছন যান। কিন্তু সেই লড়াই আর শেষ পর্যন্ত টিকল না। হাসপাতালেই সব শেষ হয়ে যায়।
তাঁর কথায়, 'দাদাকে তোলার পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল তাড়াতাড়ি করে। আমিও পিছন পিছন গেলাম। ততক্ষণে সব শেষ। দাদাকে তোলার পরে চাপ দিয়ে জল বার করার চেষ্টা হচ্ছিল। জল বেরিয়েওছিল। নিঃশ্বাসও চলছিল তখন। কিন্তু কিছু পরে সব শেষ।' পাশাপাশি তিনি এ-ও বলেন, কোনও ডাক্তার আশপাশে ছিলেন না। তাঁর কথায়, 'টলিউডের কোনও শ্যুটিংয়ে তো ডাক্তার থাকে না, ডাক্তার নিয়ে শ্যুটিং হয় না।'
এই বয়ানে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। ড্রাইভারের দাবি, ঘটনাস্থলে কোনও লাইফগার্ড, নুলিয়া বা পুলিশ ছিল না। ইউনিটের তরফে কোনও চিকিৎসকও উপস্থিত ছিলেন না। শুধুমাত্র একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ছিল, যার মাঝিরা পরে উদ্ধারকাজে সাহায্য করেন। অর্থাৎ, সমুদ্রে শ্যুটিং বা উপস্থিতির মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব ছিল কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
আরও একটি দিক উল্লেখযোগ্য, ড্রাইভার জানিয়েছেন, রাহুল সাঁতার জানতেন। তবু কেন তিনি নিজেকে সামলে উঠতে পারলেন না? তাঁর মতে, হয়তো সেই মুহূর্তে তিনি নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। জোয়ারের টান, অজানা গভীরতা— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বাবলুর আফশোস, 'আমি তো কাছের লোক ছিলাম রাহুলদার, কিন্তু থেকেও কিছু করতে পারলাম না। জলের গভীরতা বুঝতে পারেনি, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি দাদা...'
এই বয়ান একদিকে যেমন তথ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই মানবিক। একজন কাছের মানুষের অসহায়তা, অপরাধবোধ আর আক্ষেপে ভরা এই বয়ানই তুলে ধরছে একাধিক ফাঁকফোকর। কীভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত শ্যুটিং পরিবেশ এত দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠল? উদ্ধার করতে ঠিক কতটা সময় লেগেছিল? আর সেই সময়েই কি হারিয়ে গেল এক জীবন?
তদন্ত চলছে। উত্তর এখনও আসেনি অফিসিয়ালি। কিন্তু ড্রাইভারের এই বয়ান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এই মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়। এটি একাধিক অমিলের জট, যার প্রতিটি সুতোর শেষ প্রান্ত এখনও অধরা।