তালসারিতে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ও ১৯৭৭-এ কেয়া চক্রবর্তীর জলে ডুবে মৃত্যুর মধ্যে কেন অদ্ভুত মিল!
.jpg.webp)
রাহুল এবং কেয়া।
শেষ আপডেট: 30 March 2026 16:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সময়ের নিজস্ব এক নিষ্ঠুরতা আছে। তার নাম স্মৃতি। বলা ভাল, দুঃসহ স্মৃতি। যা শেষ হয় না, বদলে যায় না, ভোলাও যায় না। সে শুধু চুপ করে থাকে, তারপর হঠাৎ একদিন, বহু বছর পর, প্রায় একই দৃশ্য আবার সাজিয়ে দেয়। মহাসমারোহে সমাপতন ঘটায় সময়ের আয়নায়।
২০২৬ সালের ২৯ মার্চের তালসারি যেন সেই পুরনো স্মৃতিরই পুনর্জন্ম ঘটিয়েছে। সেই স্মৃতির এপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় (Rahul Arunoday Banerjee) আর অন্যদিকে, সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাংলা থিয়েটারের তুখোড় অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তী (Keya Chakraborty)।
রবিবার, বিকেল প্রায় পাঁচটা। তালসারির সমুদ্রতটে শুটিং চলছিল ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের। দৃশ্য অনুযায়ী, জলে নামার নাকি কথাই ছিল না নায়ক রাহুলের। গোড়ালি ছোঁয়া জলে দাঁড়িয়েই নায়িকার সঙ্গে সংলাপ বলার কথা ছিল। পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল অন্তত তেমনটাই দাবি করেছেন। তার পরেই রাহুল নাকি আচমকাই শটের বাইরে গিয়ে সমুদ্রের দিকে এগোতে শুরু করেন। প্রথমে গোড়ালি, তারপর হাঁটু, তারপর কোমর—ক্রমশ গভীর জলে চলে যাচ্ছিলেন তিনি। শেষমেশ... সব শেষ।
এই ঘটনার মধ্যে দিয়েই হঠাৎ ফিরে আসে ১৯৭৭ সালের এমন মার্চ মাসেরই এক বিকেল। মাঝগঙ্গায় শুটিং চলছিল। চরিত্র অনুযায়ী জলে ঝাঁপ দিতে হয় অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তীকে। আর ওঠেননি তিনি। জানা যায়, সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। ডামিও ব্যবহার করা হয়নি।
পরের দিন তাঁর নিথর দেহ ভেসে ওঠে নদীর জলে, অনেকটা দূরে। সেই মৃত্যু ঘিরেও ছিল অসংখ্য প্রশ্ন— দুর্ঘটনা, নাকি অন্য কিছু? উত্তর আজও অমীমাংসিত।

তালসারিতে রাহুলের মৃত্যুর রহস্যও এখনও ধোঁয়াশায়। বহু উত্তর মেলেনি। কেবলই উঠে এসেছে একাধিক বয়ান। জানা গেছে, রাহুল যখন মাঝসমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ইউনিটের সদস্যরা বারবার তাঁকে সতর্ক করেছিলেন। কেউ কেউ জলে নেমেও পড়েন তাঁর পিছু পিছু। তখনও সহ-অভিনেত্রী শ্বেতার হাত ধরে ছিলেন রাহুল। আশেপাশে নৌকাও ছিল। তবু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আচমকাই ভারসাম্য হারান তিনি। শুরু হয় ডোবা-ওঠার লড়াই। প্রচুর জল ঢুকে যায় শরীরে।
তড়িঘড়ি তাঁকে টেনে তোলা হয় তটে। আশ্চর্যজনকভাবে, তখনও জ্ঞান ছিল। গাড়িতে তোলা হয়। সেখানেও সাড়া দিচ্ছিলেন। কিন্তু দিঘা হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সহ-অভিনেত্রীকে সামলাতে গিয়েই হয়তো তিনি জলে গভীরে চলে যান। আবার কেউ বলছেন, আচমকা স্রোতের টানেই বিপত্তি। কেন শটের বাইরে গেলেন রাহুল? নিছক আবেগ, নাকি কোনও মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্ত? জল থেকে তোলার পরে প্রাণ ছিল দেহে? কেন কোনও সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না? তদন্ত চলছে, কিন্তু উত্তর এখনও অধরা।
কেয়া ও রাহুল। দু’টি ঘটনা। পাঁচ দশকের ব্যবধান। কিন্তু মিল যেন শিউরে ওঠার মতো। দু’জনেই শুটিংয়ে ব্যস্ত। দু’জনেই জলের মধ্যে। দু’জনের ক্ষেত্রেই ছিল না পর্যাপ্ত প্রস্তুতি বা নিয়ন্ত্রণ। আর দু’জনেই চলে গেলেন কেরিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায়। হঠাৎ। অসময়ে।
এই মিলই আজ টলিপাড়াকে ভাবাচ্ছে। ভাবাচ্ছে হাজারো বাঙালিকে। সেই একই প্রশ্ন ঘনিয়ে উঠছে, শিল্পীরা কি এখনও যথেষ্ট সুরক্ষা পান? নাকি এখনও শিল্পের নামে ঝুঁকি নেওয়ার পুরনো সংস্কৃতি বয়ে চলেছে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি?
সবচেয়ে বড় কথা, কেয়া বা রাহুল— দু’জনেই শুধু অভিনেতা নন, ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মেধাবী মানুষ, শিল্পীসত্তার গভীরে থাকা প্রাণ। অথচ তাঁদের শেষ অধ্যায়ের চর্চা যেন ছাপিয়ে গেল তাঁদের গোটা জীবনের সৃষ্টিকে।
যে জল জীবন দেয়, সেই জলই প্রাণ কেড়ে নেয়। এর চেয়ে বড় সত্য আর হয় না। ১৯৭৭-এর গঙ্গা, ২০২৬-এর তালসারির সমুদ্র। সময় যেন শুধু নাম বদলায়, স্থান বদলায়, দৃশ্য বদলায়। কিন্তু ট্র্যাজেডির স্ক্রিপ্ট সেই একই থেকে যায়।