রাহুল শুধুই একজন অভিনেতা নয় বা নায়ক নয়। হ্যাঁ, নায়ক তো বটেই। তবে রাহুল একজন থিয়েটারের মানুষ, আর সব থেকে বড় কথা, থিয়েটারের সেই বিরল মানুষ যে সাহিত্য ভালবাসত এবং নিজে সাহিত্যচর্চা করত।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 30 March 2026 13:21
সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমার সঙ্গে দিনকয়েক আগেই দেখা হয়েছিল একটি পডকাস্টে (Rahul Arunoday Banerjee Bratya Basu) এবং এটাই হয়তো ওর (Rahul Arunoday Banerjee news) জীবনের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটা পডকাস্ট সিরিজ, 'সহজ কথা' (Rahul Banerjee died)। সেখানেই দেখা হল, অনেক কথা হল। সাহিত্য... তার দু'দিন পর আমায় ফোন করল রাহুল, বলল ও আমার 'অশালীন' নাটকটা সিনেমা বানাতে চায়। অশালীন আমারই নাটক, তাতে প্রথমে আমি অভিনয় করি, তার ১০ বছরের বেশি সময় পরে তাতে রাহুল অভিনয় (Rahul Arunoday Banerjee actor) করেছিল। আমারই এক বন্ধু বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়।
আগের দিনের পডকাস্টেও (Rahul Arunoday Banerjee Podcast) এই অশালীন নাটক নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল। তা আমায় সেটাই ফোন করে বলল, 'অশালীনটা সিনেমা বানাতে চাই, শর্ত কী?' আমি ওকে (Rahul Arunoday Banerjee death) বললাম, 'শর্ত আবার কী, তুমি বানাবে তো বানাবে!' তখন বলল 'স্ক্রিপ্ট দেখানোর ব্যাপার...' আমি বললাম, 'কিচ্ছু দেখাতে হবে না। তুমি সিনেমা বানাতে চেয়েছো, সেটাই আমার কাছে অনেক। তুমি করো না।'
তারপর আজ আমার ভোটের প্রচারের মাঝে হঠাৎ দেখছি অনেক ফোন আসছে। আমি তখন বক্তব্য রাখছি, ফোন ধরতে পারিনি। বেরিয়ে দেখছি এই খবর। রাহুল নেই! মানে আমি এখনও ঠিক ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছি না। কারণ রাহুল শুধুই একজন অভিনেতা নয় বা নায়ক নয়। হ্যাঁ, নায়ক তো বটেই। তবে রাহুল একজন থিয়েটারের মানুষ, আর সব থেকে বড় কথা, থিয়েটারের সেই বিরল মানুষ যে সাহিত্য ভালবাসত এবং নিজে সাহিত্যচর্চা করত। অনেকগুলো বই আছে রাহুলের। এবং রাহুলের সঙ্গে এমন এমন সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেগুলো আপাতভাবে খুব জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্য নয় বা পপুলার লেখকের নয়। আন্ডারগ্রাউন্ড লেখকদের লেখাও ও খুব পড়ত। এবং নিজের গদ্যেও সেই আমেজটা আনার চেষ্টা করত।
ওর মধ্যে বরাবরই একটা রাগী, একটা ব্যতিক্রমী এবং অভিমানী-- এই মিশ্র সত্ত্বা কাজ করত। এবং পরে আমি বুঝতে পেরেছি, ও বাইরে যেটা হয়তো রাগী বলে দেখাত, আসলে তা নয়। ও নরম স্বভাবের ছেলে। তো শেষ দিনেও অনেক গল্প হল। ওর জীবন যাপন নিয়ে কথা হল। বলল এখন একদম কাজের মধ্যে আছি। এটাও কথা হল, যে সামনে একটা সিরিয়ালের শ্যুট আছে, বাইরে যাব। হয়তো এই সিরিয়ালটাই সেই সিরিয়াল।
রাহুলের এই চলে যাওয়া আমার ব্যক্তিগত মিস করার কথা নয়। এটা বাংলা থিয়েটার জগতের অপূরণীয় ক্ষতি। ব্যক্তিগত শোক তো নিশ্চয় মানুষের হয়। সেটা স্বাভাবিক ভাবে আমারও হয়েছে। কিন্তু ও তো কেবল একজন ব্যক্তি ছিল না। ও একজন যথার্থ অর্থে নট ছিল, অভিনেতা ছিল। ও একজন চিন্তাশীল অভিনেতা। চিন্তাহীন অভিনেতা ও নয়। যার ফলে এটা একা সার্বিক ক্ষতির জায়গা।
ওর রাজনৈতিক মত হয়তো আমার থেকে আলাদা ছিল, কিন্তু সেটা আমাদের কমিউনিকেশনে কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
আমি শেষ যেদিন ওর পডকাস্টে গেলাম, ওর মায়ের সঙ্গেও আলাপ হল আমার। আমি এখনও ভাবতেই পারছি না, এটা কী করে হতে পারে। পুরো বিষয়টাই এখনও আমার কাছে শক বা ট্রমা। আমি যে কাটিয়ে উঠতে পেরেছি এটা, তা নয়। এটা আমার ব্যক্তিগত শোকের চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, বাংলা সিনেমা ও থিয়েটার একজন চিন্তাশীল নট ও অভিনেতাকে হারাল।
আমি আর রাহুল একসঙ্গে দুটো সিনেমায় অভিনয় করেছি। একটা হল 'কাগজের বৌ', বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায়। ঘটনাচক্রে, বাপ্পাদিত্যও একটা সিনেমার শ্যুটিং চলার সময়েই দুর্ঘটনায় মারা যান। আর একটা ছবি হল, 'ঝরা পালক'। যেখানে আমি আর ও একসঙ্গে জীবনানন্দের পার্ট করেছি। সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়ের ছবি। রাহুল কমবয়সি জীবনানন্দের ভূমিকায় ছিল, আমি বেশি বয়সি। এই দুটো সিনেমায় আমি আর রাহুল একসঙ্গে কাজ করেছি।
বাপ্পাদিত্যর ছবিটাতে আমরা সুন্দরবনে একসঙ্গে বেশ কয়েকদিন কাজ করেছিলাম। এই শ্যুটিংগুলোয় সতর্কতা ইত্যাদির বিষয়টা অন্য। তবে মনে রাখতে হবে, কেয়া চক্রবর্তীর মতো অভিনেত্রীও শ্যুটিং করতে গিয়ে জলে ডুবে মারা গিয়েছিলেন। আমার নিজের ধারণা কেয়া কোনও সুরক্ষা বা প্রতিরক্ষা নেননি, উপর থেকে ঝাঁপ মেরেছিলেন। ওটার মধ্যে একটা মর্ষকাম বিষয় ছিল। কেয়াদির ক্ষেত্রে আমার এটা খুব মনে হয়। যে কেয়াদি আর একটু সতর্ক হতে পারতেন।
রাহুল নিশ্চয় নিজে সতর্ক। কিন্তু কী হয়েছে তো জানি না। কিন্তু শ্যুটিং মাঝেমাঝেই এরকম হয় এবং এই প্রথম যে শ্যুটিং করতে গিয়ে মানুষ মারা গেল, তা তো নয়। এর আগেও শ্যুটিং করতে গিয়ে অনেক মানুষ মারা গেছেন। তো এই ঝড়ঝঞ্ঝাটগুলো মানুষের জীবনে থাকেই। যাঁরা বাইরের প্রফেশনাল ওয়ার্ল্ডে কাজ করেন, প্রত্যেকের পেশাতেই কিছু না কিছু অনিশ্চয়তা থাকে।
এটাও তেমন হয়ে গেল, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।