বছরের ক্যালেন্ডারে আর ক’টা দিন মাত্র। সময়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকালেই বুকের ভিতরটা ভারী হয়ে আসে। ২০২৫ সাল আমাদের কারও কাছেই খুব সহজ ছিল না। ভালোর আলো যেমন ছিল, তেমনই অন্ধকারের ছায়াও ছিল দীর্ঘ।

প্রসেনজিৎ-কৌশিক-ইন্দ্রদীপ। ছবি: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 24 December 2025 15:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বছরের ক্যালেন্ডারে আর ক’টা দিন মাত্র। সময়ের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকালেই বুকের ভিতরটা ভারী হয়ে আসে। ২০২৫ সাল আমাদের কারও কাছেই খুব সহজ ছিল না। ভালোর আলো যেমন ছিল, তেমনই অন্ধকারের ছায়াও ছিল দীর্ঘ।
কখনও খবরের শিরোনামে মহাকুম্ভে পদপিষ্ট হয়ে নিভে যাওয়া প্রাণ, কখনও পাহালগামের রক্তাক্ত হামলা। কখনও আকাশ থেকে ভেঙে পড়া স্বপ্ন—প্লেন ক্র্যাশ, কখনও রাজধানীর বুকে কাঁপন ধরানো বিস্ফোরণ। যুদ্ধের আবহ, সীমান্ত উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বছরটা যেন বারবার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে। আর ঠিক পাশের দেশ বাংলাদেশ—সেখানকার রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানুষের আতঙ্ক, এখনও দগদগে ক্ষত হয়ে চোখে লাগে।

এই বছরের সঙ্গে সঙ্গে বিদায় জানিয়েছে বহু পরিচিত মুখও। গানের মায়ায় ভর করে যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন আবেগে, সেই জুবিন গর্গের বিদায় যেমন মনখারাপের তালিকায়, তেমনই রুপোলি পর্দার হাসি-আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ ধর্মেন্দ্র, আসরানি, সতীশ শাহ—এক এক করে তাঁদের নামগুলো যেন সময়ের খাতায় শোকের কালিতে লেখা হয়ে রইল। বিনোদনের আড়ালে যে মানুষগুলো আমাদের জীবনের আনন্দের স্মৃতি হয়ে ছিলেন, তাঁদের হারানোও এই বছরের ক্ষতচিহ্ন।

এমনই এক ক্লান্ত, বিধ্বস্ত সময়ের শেষে এসে হাজির হল বড়দিন। আগামিকাল যিশুর জন্মদিন। আজ রাতেই কত শিশুর হাত ব্যস্ত থাকবে লাল মোজা ঝোলাতে—জানলার ধারে, দরজার পাশে। চোখে ঘুম নেই, মনে শুধু একটাই বিশ্বাস—সান্তা ক্লজ (santaclaus) আসবেন। সেই দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ, যাঁর জন্মকথা লোককথার মতোই—কখনও বলা হয় তিনি সেন্ট নিকোলাস, দরিদ্রদের জন্য গোপনে উপহার রেখে যেতেন; কখনও বলা হয়, উত্তর মেরুর বরফরাজ্যে বসে এলফদের সঙ্গে খেলনা বানান। রেইনডিয়ারের টানে উড়ে চলা স্লেজ, লাল-সাদা পোশাক, আর নিঃশব্দে উপহার রেখে যাওয়ার সেই চিরকালীন কল্পনা—আজও শিশুদের মনকে আগলে রাখে।
এই আবহেই ‘দ্য ওয়াল’-এর তরফে প্রশ্ন রাখা হল বাংলার তিন বিশিষ্ট মানুষের কাছে। এমন এক বিধ্বংসী বছর পেরিয়ে এসে, যদি মন থেকে কিছু চাইতে হয়—ক্রিসমাসে সান্তার কাছে তাঁরা কী চাইবেন?
প্রথমেই ফোন গেল বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ নামক পরিবারের জ্যেষ্ঠপুত্র, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ( Prosenjit Chatterjee) কাছে। প্রশ্নটা শুনে কিছুক্ষণ নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই যেন জমে উঠল গোটা বছরের ভার। তারপর খুব সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর এক উত্তর—যদি সত্যিই সান্তার কাছ থেকে কিছু পাওয়া যেত, তাহলে তিনি চাইতেন “গোটা পৃথিবীতে আরও একটু ভালবাসা এবং শান্তি।” তাঁর কথায় কোনও ব্যক্তিগত চাহিদা নেই, নেই কোনও আক্ষেপ—শুধু গোটা পৃথিবীর জন্য প্রার্থনা। এই মুহূর্তে, তাঁর মতে, সেটাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।

পরের ফোনে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় (Kaushik Ganguly)। তিনিও যেন একটু চুপচাপ। মনখারাপ কি? উত্তর এল ধীরে, ভেবে-চিন্তে। বললেন, বয়স বাড়ছে, চাহিদাগুলো আর লাল মোজার ভিতরে আঁটে না। সান্তা—এই বদলে যাওয়া পৃথিবীতে তুমি যেন একা আগের মতো রয়ে গিয়েছ। পৃথিবী বদলেছে, মানুষের মন বদলেছে। তাই তিনি চাইবেন, আজকের শিশুদের জন্য এমন এক উপহার—যা সময়ের সঙ্গে মানানসই, যা তাদের মানবধর্মের মূল্য শেখাবে। খেলনা নয়, প্রযুক্তির চাকচিক্য নয়—মানুষ হয়ে ওঠার পাঠ।
শেষ ফোনটা গেল সুরকার ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের ( Indraadip Dasgupta)কাছে। গলায় ছিল একরাশ ক্লান্তি আর দীর্ঘদিনের অপূর্ণ প্রার্থনার সুর। বহু বছর ধরে তিনি নাকি একই কিছু চেয়ে আসছেন সান্তার কাছে, অথচ তা এখনও পূরণ হয়নি। তবু আবারও তাই চাইবেন—মানুষের মধ্যে শান্তি নেমে আসুক। মানুষ স্বপ্ন দেখুক ঠিকই, কিন্তু সেই স্বপ্ন দেখতে গিয়ে যে অসহনীয় আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছে, তার থেকেই তো জন্ম নিচ্ছে বিদ্বেষ, হানাহানি, দ্বন্দ্ব। এগুলো যেন কমে যায়। সান্তার পোশাকের রং লাল-সাদা—লাল প্রেমের, সাদা শান্তির। এ বছর কি সান্তা তাঁকে সেই সেরা উপহার দেবেন?

আজ রাতে হয়তো ঝোলানো মোজার ভিতরে থাকবে নতুন খেলনা, বিশাল কেক, কিংবা বহুদিন ধরে চাওয়া কোনও জিনিস। কিন্তু এই তিনজন মানুষ যে উপহার মনেপ্রাণে চাইলেন—শান্তি, ভালোবাসা, মানবিকতা—সান্তা কি তা দিতে পারবেন? যদি পারেন, তবে হয়তো বদলে যেত অনেক কিছু। হয়তো আগামী বছরের ক্যালেন্ডারে পাতায় পাতায় এত রক্ত, এত শোক, এত অশান্তির খবর লেখা থাকবে না। হয়তো লাল মোজার ভিতর থেকেই একদিন পৃথিবী শিখে নিত—সবচেয়ে বড় উপহার আসলে মানুষ হয়ে ওঠা।