শুক্রবার দুপুরের দিকে যখন খবর এল, জনপ্রিয় গায়ক জুবিন গর্গ (Zubeen Garg Death) আর নেই, তখন রবি ঠাকুরের আঁকা মৃত্যুচিন্তাও বর্ণান্ধ হয়ে পড়তে বাধ্য যে কোনও অনুরাগীর মনে।
.jpeg.webp)
জুবিন গর্গ
শেষ আপডেট: 19 September 2025 18:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: “যে-সব পাতা ঝরে গিয়েছে তারাই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আপন বাণী পাঠিয়েছে। তারা যদি শাখা আঁকড়ে থাকতে পারত, তা হলে জরাই অমর হত”, ‘আত্মপরিচয়’-এ বলেছেন রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore)। এক নিমেষে জীবনের অপচয়ধর্ম ও মৃত্যুর অনিবার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে একটা ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাঠকের মনে।
শুক্রবার দুপুরের দিকে যখন খবর এল, জনপ্রিয় গায়ক জুবিন গর্গ (Zubeen Garg Death) আর নেই, তখন রবি ঠাকুরের আঁকা মৃত্যুচিন্তাও বর্ণান্ধ হয়ে পড়তে বাধ্য যে কোনও অনুরাগীর মনে। আরও মনে পড়ে যেতে পারে তাঁর কণ্ঠে সেই জনপ্রিয় গান, 'ইয়া আলি মদতওয়ালি' (Ya Ali Madatwali Song)। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে আবেদন যখন জীবন উৎসর্গ করার, তখন বিশ্বসংসারের সর্বময় কর্তা সহায় হতে পারতেন নিশ্চয়ই। গানেই তো গায়ক আবেদন করেছিলেন, 'ইয়া আলি মদতওয়ালি'। ঈশ্বরের জন্য নৈবেদ্য সাজানো এই গানই তো তাঁর পরিচয় তৈরি করে দিয়েছিল।
হিন্দি ছবিতে জুবিন গর্গের এই প্রথম প্লেব্যাকই যেন হয়ে উঠেছিল দেশের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গীত-ঝড়। ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া গ্যাংস্টার (Gangster) ছবির গান ‘ইয়া আলি’ তাঁকে রাতারাতি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল। চার্টবাস্টারে এক নম্বরে জায়গা করে নেওয়ার পাশাপাশি সে বছর একাধিক পুরস্কার পান অসমের এই জনপ্রিয় শিল্পী।
যদিও ফিল্মফেয়ার (Filmfare Awards) বা আইফা-র (AIFA) মতো বড় মঞ্চে কেবল মনোনয়নেই থেমে যেতে হয়েছিল তাঁকে, কিন্তু হাতে এসেছিল গ্লোবাল ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস (GIFA)-এর শ্রেষ্ঠ প্লেব্যাক গায়কের পুরস্কার। সেই সম্মানই জুবিনের গায়ক জীবনে মাইলফলক হয়ে আছে আজও।
যদিও এই গান নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। সুর চুরির অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন বলিউডের জনপ্রিয় সুরকার প্রীতম চক্রবর্তী। অভিযোগ উঠেছিল, জুবিনের গাওয়া, প্রীতমের সুর করা 'ইয়া আলি' গান নকল করা হয়েছে কুয়েতের ব্যান্ড গুইতারা (GuiTaRa)-র গাওয়া আরবি গান ‘ইয়া ঘালি’ (Ya Ghali) থেকে।
ব্যান্ডের সদস্যরা সুর 'চুরি'র ঘটনায় গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেন। গুইতারার গায়ক ফাহাদ শাম্মোহ তখন জানিয়েছিলেন, তাঁরা যখন প্রথম টিভিতে গানটা শোনেন, অবাক হয়ে যান। পুরোপুরি ‘ইয়া ঘালি’ থেকে কপি করা। এবং ইয়া আলি যে এত জনপ্রিয় হয়েছে, তার কৃতিত্ব আসলে ইয়া ঘালির। তাই গানের যা লাভ হয়েছে তার ভাগীদার গুইতারাও।
জুবিনের গাওয়া এই গান নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা চলছে, লেখালিখি হচ্ছে তখন এও খবর হয়েছিল, যে মিউজিক কোম্পানির কাছে ইয়া ঘালি-র স্বত্ব রয়েছে, তার মালিক সৌদি আরবের রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল। সেই প্রিন্সও তখন 'চোরাই গান' বলে মামলা করেন।
যদিও প্রীতম সে সময় যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন তিনি ওই গান (ইয়া ঘালি) সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। বরং বাঙালি পরিচালক সুর করেছেন এক মুসলিম লোকগীতি থেকে, যা শতাব্দী ধরে প্রচলিত।
গানের কণ্ঠশিল্পী জুবিন অবশ্য স্বীকার করেন, তিনি মূল গানটির কথা জানতেন। তবে পুরোপুরি নকল করা সেটা বলা যায় না। ছবির প্রয়োজনে গানের সুরে খানিকটা এদিক ওদিক করাই যায়। তাতে সাংঘাতিক কোনও অপরাধ হয়ে যায় না।
যদিও ২০০৬ সালে প্রকাশ পাওয়া গানের যে ব্যাপ্তি, তা ২০২৫ সালে এসেও অস্বীকার করার জায়গা নেই। দেশের যুব-সমাজের সামনে এই ইয়া আলি গানের মাধ্যমেই জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছিলেন জুবিন গর্গ। দুর্গাপুজোর মাইকে বাজত কিংবা ফাংশনে জুবিনের কাছে এই গান গাওয়ারই অনুরোধ আসত। যাতে বোঝা যায় সঙ্গীতের কথা এবং সুর সব ধর্মের উপরে। সেভাবেই জুবিনের পদধ্বনি যে গান দিয়ে শুরু হয়েছিল, ১৯ বছর পর সেই গানের সুরেই জীবনকে 'কুরবানি' দিয়ে অমরত্ব পেলেন এই শিল্পী।