১৯৭২ সালের ১৮ নভেম্বর মেঘালয়ের তুরায় জন্ম জুবিন গর্গের (Zubeen Garg)। তাঁর আসল নাম জুবিন বড়ঠাকুর, তবে তিনি ‘গর্গ’ গোত্রনাম ব্যবহার করেন। বাবা মোহিনী বড়ঠাকুর ছিলেন আমলা এবং সাহিত্যিক, যিনি ‘কপিল ঠাকুর’ নামে কবিতা লিখতেন।

প্রয়াত জুবিন গর্গ।
শেষ আপডেট: 22 September 2025 15:07
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অসম তথা গোটা ভারতের হৃদয় জয় করা গায়ক জুবিন গর্গ (Zubeen Garg) শুধুই এক শিল্পীর নাম নয়, তিনি ছিলেন উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী সঙ্গীতের পাশাপাশি সিনেমা, সাহিত্য ও সামাজিক কর্মক্ষেত্রে গভীর ছাপ রেখে গেলেন। মাত্র ৫২ বছর বয়সে তাঁর প্রাণ কেড়ে নিল সিঙ্গাপুরের স্কুবা ডাইভিং।
১৯৭২ সালের ১৮ নভেম্বর মেঘালয়ের তুরায় জন্ম জুবিন গর্গের। তাঁর আসল নাম জুবিন বড়ঠাকুর, তবে তিনি ‘গর্গ’ গোত্রনাম ব্যবহার করেন। বাবা মোহিনী বড়ঠাকুর ছিলেন আমলা এবং সাহিত্যিক, যিনি ‘কপিল ঠাকুর’ নামে কবিতা লিখতেন। মা ইলি বড়ঠাকুর ছিলেন গায়িকা ও নৃত্যশিল্পী। মা-ই ছিলেন জুবিনের প্রথম গুরু। তাঁর ছোট বোন জঙ্কি বড়ঠাকুরও পরিচিত গায়িকা ছিলেন, যিনি ২০০২ সালে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। আর এক বোন পাল্মে ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী।
অসমের বিভিন্ন জায়গায় প্রাথমিক পড়াশোনা করেন জুবিন। পরে জোড়হাটের জেবি কলেজ এবং গুয়াহাটির বীরলা বড়ুয়া কলেজে পড়াশোনা করেন। তবে সঙ্গীতের প্রতি প্রবল টান তাঁকে পড়াশোনা মাঝপথে ছাড়তে বাধ্য করে। রবিন ব্যানার্জির কাছে তবলা এবং রমণী রায়ের কাছে লোকগান শিখেছিলেন। ১৯৯২ সালে যুব উৎসবে পশ্চিমী ধাঁচের সোলো গানে সোনা জেতা তাঁর জীবনে টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৯২ সালে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম 'অনামিকা' জুবিনকে এক ঝটকায় উত্তর-পূর্বের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৯৫ সালে বলিউডে পা রাখেন, রেকর্ড করেন চাঁদনি রাত, ফিজা, কাঁটের মতো গান। তবে প্রকৃত খ্যাতি আসে ২০০৬ সালে ‘গ্যাংস্টার’-এর আইকনিক গান 'ইয়া আলি' দিয়ে, যা তাঁকে এনে দেয় গ্লোবাল ইন্ডিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস।
২০০৩ সালে মন ছবির মাধ্যমে বাংলা সিনেমায় প্রবেশ করেন। শুধু তুমি, প্রেমী, চিরদিনই তুমি যে আমার-সহ একাধিক বাংলা ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা ও গায়ক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। অসমিয়া চলচ্চিত্রে তাঁর মিশন চায়না এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিগুলি ভিন্নমাত্রার সাড়া জাগায়।
জুবিন গর্গ কেবল গায়কই নন, বরং তিনি ছিলেন সুরকার, গীতিকার ও প্রযোজকও। ইকোজ অফ সাইলেন্স ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পান। একের পর এক অ্যালবামে (অনামিকা, মায়া, রুমাল, সিলা ইত্যাদি) তাঁর সৃজনশীলতা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি নিজস্ব প্রযোজনায় দীনবন্ধু, মিশন চায়না, কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিও নির্মাণ করেন।
জুবিনের স্ত্রী গরিমা শইকিয়া গর্গ পেশায় খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইনার। দীর্ঘ প্রেমপর্বের পর ২০০২ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। সম্পর্কের নানা ওঠাপড়ার পরও এই দম্পতি আজও উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম সেলিব্রিটি দম্পতি।
সর্বমোট তিনি বলিউডে ২০০টিরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন এবং অসমিয়া-বাংলা মিলিয়ে ৯০০০-এরও বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।
জুবিন গর্গের কেরিয়ার যেমন সাফল্যে ভরপুর, তেমনি জড়িয়ে পড়েছেন নানা বিতর্কেও। কখনও জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগ, কখনও গান গাওয়ার সময় বন্দুক হাতে দর্শককে ভয় দেখানো, কখনও বা প্রকাশ্যে মন্তব্য নিয়ে সমালোচিত হয়েছেন। অসম আন্দোলন, বিশেষ করে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন আপামর জনতার মুখপাত্র।
শিল্পের বাইরেও জুবিন একজন মানবতাপ্রেমী মুখ বলে পরিচিত। তিনি কলাগুরু আর্টিস্ট ফাউন্ডেশন চালান, যা বন্যাদুর্গতদের সহায়তা করে। অনাথ শিশুদের দায়িত্বও নিয়েছেন তিনি, আবার অসুস্থ পশু-পাখিকে আশ্রয় দিয়ে চিকিৎসাও করিয়েছেন। কামাক্ষ্যা মন্দিরে পশু বলি বন্ধ করা নিয়ে জুবিন গর্গের লড়াই দেখে 'হিরো' তকমা দিয়েছিল PETA।
ড. ভূপেন হাজারিকার পর অসমের সংস্কৃতিকে যিনি নতুন দিশা দেখিয়েছেন, তিনি জুবিন গর্গ। ভক্তদের কাছে তিনি কেবল গায়ক নন, আবেগ, যুগের প্রতীক। হাজারো বিতর্ক থাকলেও তাঁর কণ্ঠের মায়া, সৃষ্টিশীলতা ও মানবিকতার জন্য তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গীত-আকাশে চিরউজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।