Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

জুবিনের অকালমৃত্যু যেন প্রিয়তম কোনও পরমাত্মীয়ের চিরবিদায়! ডুকরে কাঁদছে গোটা অসমের আত্মা

মাত্র ৫২ বছরে চলে গেলেন জুবিন গর্গ (Zubeen Garg)। অসমের (Assam) জনসমুদ্র, চোখের জল আর অনন্ত সঙ্গীতের স্মৃতি বলে দিচ্ছে, তিনি কেবল শিল্পী নন, গোটা জাতির আত্মাকে ছুঁয়ে থাকা এক কিংবদন্তী।

জুবিনের অকালমৃত্যু যেন প্রিয়তম কোনও পরমাত্মীয়ের চিরবিদায়! ডুকরে কাঁদছে গোটা অসমের আত্মা

অসমের আত্মাকে কাঁদিয়ে বিদায় জুবিন গর্গের।

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: 22 September 2025 15:49

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

এক জন মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণা এতটাও স্বচ্ছ হতে পারে! এতটা আত্মবিশ্বাস! এ ভাবেও একটা জাতির পরিচয় হয়ে উঠতে পারে একজন মানুষ! তাও এমন একটা সময়ে যখন সবকিছুই খুব ক্ষণস্থায়ী, খুব ঠুনকো।

মাত্র ৫২ বছর বয়সে অকালপ্রয়াণ ঘটেছে জুবিন গর্গের। তাঁর মৃত্যুর পর গোটা অসমের যে ছবি দেখা যাচ্ছে, তা শুধু বিস্ময়কর নয়, গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতই। যেন অসমের আত্মার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছেন জুবিন। যেন অসম মানেই জুবিন, আর জুবিন মানেই অসম।

কলকাতায় বা ভারতের অন্য কোথাও বসে এ কথাটা আগে বোঝা যায়নি। কেউ হয়তো বোঝার চেষ্টাও করেননি। কিন্তু জুবিন নিশ্চয়ই বুঝতেন। বছর কয়েক আগে তাঁর দেওয়া এক সাক্ষাৎকার দুদিন হল ফের ভেসে উঠেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, জুবিন বলছেন— “আগে মানুষ ভাবত আমরা বুঝি জঙ্গলে থাকি। সেই ধারণা ভেঙে গেছে। অসম তিনটি কারণের জন্য বিখ্যাত। এক শিঙের গণ্ডার, চা আর জুবিন।”

কাট টু ২০২৫। ২১ সেপ্টেম্বর। সেই শিল্পী এসে পৌঁছেছেন সেই অসমেই। তবে আরেকটা গান গাওয়ার আর সুযোগ নেই গানওয়ালার। তিনি কফিনবন্দি। তাঁর প্রাণে আর গান নাই। তবে তাঁর গানে যে আসলে কতটা প্রাণ আছে, তা দেখিয়ে দিল তাঁর মাতৃভূমি। উপচে পড়া ভিড়, জনসমুদ্র, মানুষের মিছিল— এসব বিশেষণ খুবই খাটো সেই দৃশ্যের কাছে। এ দেশে শেষ কবে কোনও শিল্পী এভাবে গোটা জাতিকে পথে নামিয়েছেন, হাহাকার করে কাঁদিয়েছেন, বুকছেঁড়া কষ্ট অনুভব করিয়েছেন, তা মনে করতে পারছেন না কেউই। আদৌ কি হয়েছে এমন!

জুবিন গর্গের শেষযাত্রার ছবি বলছে, হয়নি। এমনটা আগে দেখেনি এ দেশ। একটা গোটা জাতির অন্তরের অন্তস্থল থেকে যে কান্না উঠে আসছে, যে গভীর শোক ছেয়ে গিয়েছে গোটা রাজ্যে, যে স্বতঃস্ফূর্ত বিলাপে মাথা কুটছেন হাজারো, লাখো, কোটি মানুষ, তা আক্ষরিক অর্থেই অভূতপূর্ব।

শিল্পীরা বিখ্যাত হন, এমনটা কোনও নতুন কথা নয়। তাঁদের তারকাচ্ছটায় আলোকিত হয় চারপাশ, তাঁদের ভক্ত-অনুগামীর দল ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁর জন্য। অসমের ভূমিপুত্র জুবিন গর্গও তো তেমনই। প্রান্তিক রাজ্যটিকে একের পর এক ভাল গানের মূর্ছনায় মাতাল করে, সুদূর মুম্বই পাড়ি দিয়ে একের পর এক সুপারহিট বলিউডি গান গাওয়া, ৫২ বছর বয়সি মানুষটির ক্ষেত্রেও বা কীই আর ব্যতিক্রম হতে পারে?

এই ‘কী’-এর উত্তর মিলল শনি-রবি জুড়ে। সিঙ্গাপুরে স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে জলের তলাতেই মারা যাওয়ার পরে, রবিবার দিল্লি হয়ে এসে পৌঁছয় অসমে। তার আগেই গোটা অসমের স্কুল, কলেজ, দোকান, বাজার সব বন্ধ হয়ে যায়। পরীক্ষাও স্থগিত। যেন অঘোষিত ধর্মঘট।

জুবিনের গাওয়া গান, ভাল গান, হিট গান, তাঁর আরও নানা ভাল কাজের কথা মোটামুটি সকলেই এখন জেনে ফেলেছেন। ইন্টারনেটের যুগে তা জানা কঠিনও নয়। কিন্তু একটা গোটা জাতি জুবিনকে ভালবেসে কতটা কাঁদতে পারে, তা জানার মাইলফলক, মারা গিয়ে গড়ে দিয়ে গেলেন তিনি নিজে। বলা ভাল, জীবদ্দশাতেই বোধহয় গড়েছিলেন। তাই তো সেই সাক্ষাৎকারে এত অনায়াসে বলেছিলেন, অসমকে যে যে কারণে গোটা বিশ্ব চেনে, তার মধ্যে একটি তিনি নিজে। আগে সকলে ভাবত, অসমিয়ারা বোধহয় জঙ্গলে থাকে। তিনিই বলিউডে গিয়ে ভুল ভাঙিয়েছিলেন, অসমকে চিনিয়েছিলেন। নিজেকে নিয়ে এমন কথা বোধহয় তিনিই বলতে পারেন, যিনি নিজেকে চেনেন সে জাতির আত্মা হিসেবে।

তাই জুবিনের শোকে অসমের মানুষই শুধু নয়, কাঁদছে আকাশ-বাতাস-নদীও। যে ব্রহ্মপুত্রের জলের ছন্দে এক সময়ে মিশে যেত জুবিনের কণ্ঠ, অসমের ঘর, মাঠ, উঠোন, উৎসব, প্রতিবাদ— সর্বত্র উপস্থিতি ছিল যে কণ্ঠের, সেই কণ্ঠ থেমে গিয়ে যেন নীরবতাকে আরও শ্রুতিময় করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত এত মানুষের নাড়ির সঙ্গে জুড়ে থাকা কণ্ঠ কি সত্যিই কখনও নিঃশব্দ হতে পারে?

Book / Hire SINGER Zubeen Garg for Events in Best Prices - StarClinch

এভাবে গোটা রাজ্যকে শোকে আছড়ে ফেলা জুবিনকে বোঝার সঠিক পথ হয়তো কোনও গান নয়, কোনও পরিসংখ্যান নয়। আদতে তিনি মিশে আছেন মানুষের স্মৃতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপকথা। হয়তো দুপুরবেলায় স্কুল থেকে ফেরা এক কিশোরের ব্যাগে রাখা গিটার, বা সদ্য কিশোরের দল মিলে স্টেজের সামনে হাততালি, বা হয়তো আত্মপরিচয়কে সঙ্কটে ফেলা সিএএ-কাণ্ডের প্রতিবাদ। সব মিলিয়ে তিনি ছিলে‌ন ঘরের দামাল ছেলে। যে ছেলে বাড়ির মেয়েকে উন্মনা করে গেয়ে ওঠেন ‘মায়াবিনী’, আবার বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকেও বসে পড়েন গরম ভাতের থালার সামনে। আবার এ প্রজন্মের যন্ত্রণা প্রজাতির ছেলেদের ঘুম না-আসা একলা রাতেও কাঁধে হাত রাখেন।

এইজন্যই হয়তো তাঁর গান শুনলে মনে হয়, তিনি কেবলই গেয়েছেন নয়, বেঁচেছেনও। তিনি আমাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে, গাইতে গাইতে বেঁচেছেন। সেই মানুষটার সব গান এখন থেকে বদলে যাবে। যাবেই। কেবল ‘ভাল গান’ পরিচয় থেকে সে গান হয়ে উঠবে, অনন্ত এক পারাবারের কাহিনি। শ্রোতারা নতুন করে অর্থ খুঁজবেন, ভেজা চোখে কান পাতবেন।

তখনই হয়তো মনে পড়ে যাবে, একদিন এক গানের মঞ্চে, স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি-মেশানো হাসিতে হঠাৎই জুবিন বলেছিলেন, ‘আমি যখন থাকব না, আমার জন্য ‘মায়াবিনী’ গাইবে।’ নিরাভরণ এ সরলতায় তখন দর্শকদল হেসেছিল, হাততালিও পড়েছিল হল কাঁপিয়ে।

কে জানত, সে কথাটিই এমন তাড়া করে ফিরবে! কেই বা জানত, এত তাড়াতাড়ি, সত্যিই গোটা অসম জুড়ে মায়াবিনী গেয়ে ডুকরে উঠবেন এত এত এত মানুষ! সে গানে আজ জড়িয়ে আছে আকুল কান্না, ভাঙা সুর, কাঁপা শ্বাস। জুবিনের নিজের চাওয়া পূরণ হচ্ছে কোটি কোটি মানুষের হাহাকারে, তাঁর নিজেরই গান হয়ে উঠছে তাঁর স্মরণ-সংগীত!

এবং একথা বলে দিতেও হয়তো খুব কঠিন অঙ্ক কষতে হয় না, যে আজকের পর থেকে যতবার কোনও গ্রামের উৎসবে, কোনও শহুরে অডিটোরিয়ামে, কোনও শিল্পী যখনই হঠাৎ ‘মায়াবিনী’ ধরবেন, তাঁর সুর একটু হলেও কেঁপে যাবে সামাল দিতে না পারা ফোঁপানির তোড়ে। হয়তো অদৃশ্য এক হাতের আলতো চাপ পড়বে, তাঁর কাঁধে। আর ঝরঝর করে চোখের জল ফেলা কনসার্টভর্তি মানুষও ঠিকই বুঝে নেবেন, জুবিন হারিয়ে যাননি। তাঁদের মনে পড়ে যেতে পারে জীবনানন্দ। শঙ্খচিল, শালিকের বেশে বা ভোরের কাক হয়ে ফেরা জুবিনকে তাঁরা খুঁজে পেতে পারেন ভোরের কুয়াশায়, কিশোরীর ঘুঙুরের শব্দে। জুবিন অক্ষয় হয়ে থেকে যাবেন, কনসার্ট সেরে মাঝরাতে হোস্টেলে ফিরে নিভু আলোয় গিটার হাতের ছেলেটির আঙুলের স্পর্শে।

Assamese Singer Zubeen Garg Hospitalised, Condition Stable

আজকাল নানা প্রসঙ্গেই ‘কালজয়ী’, ‘কিংবদন্তী’—এসব বিশেষণ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সবই কি এই বিশেষণগুলির সত্যিকারের যোগ্য? না। কাল জয় করার প্রতিশ্রুতি আগাম দেওয়া যায় না, তা কালের হিসেবই ঠিক করে। জুবিনের ক্ষেত্রে তাই করেছে। তাঁর জন্য ৮ থেকে ৮০ যেভাবে কাঁদছেন, তাতে এ-ও বলে দেওয়া যায়, জুবিন এ সময়ের এক সেতুও হয়ে উঠেছিলেন অসমে। ভূপেন হাজারিকার গৌরবের সোনালি রেখা থেকে আজকের অস্থির প্রজন্মের স্পন্দনের মধ্যে এক মমতাময় সংযোগ ছিল তাঁর কণ্ঠ। যে কণ্ঠে সমানভাবে হাত ধরাধরি করেছে পরম্পরা ও পরিবর্তন, প্রতিবাদ ও প্রেম, সাহস ও কোমলতা। শিল্পের এই ‘সমগ্র’ হয়ে ওঠা— খুব কম মানুষের কপালে জোটে। 

তাই তাঁর চলে যাওয়াটা কোনও ‘সেলিব্রিটি’-র মৃত্যু নয়, যেন পরমাত্মীয়ের চলে চিরবিদায়। আক্ষরিক অর্থেই আত্মীয়, যাঁর সঙ্গে গোটা একটা জাতির আত্মার সংযোগ রচিত হয়েছে শব্দে-সুরে-ছন্দে।

Zubeen Garg: A Multifaceted Artist, Heartthrob of Millions

অসমের যে সান্ত্বনাহীন শোক আজ গোটা দেশ দেখছে, সে শোকে এক সংকল্পও মিশে আছে। নিরুচ্চার কিন্তু দৃঢ়। অনাড়ম্বর কিন্তু সুললিত। জুবিনের গানের স্রোত যেন না থামে। জুবিনকে ঘিরে এ আবেগ যেন না মরে। এই প্রেম, এই শোক, এই আর্তি, এই গান যেন বয়ে যায় প্রজন্মান্তরে। আসলে, গান তো তেমনই। গানের মৃত্যু হয় না। গান নদীর মতো চলতে থাকে, প্রজন্ম পার হয়ে যায়, দেশ পার হয়ে যায়, কাল পার হয়ে যায়। ফের ফিরে আসে, ভাসিয়ে দেয়। ঢেউয়ের মতো। জ্যোৎস্নার মতো। বসন্তের মতো।


```