হিন্দিতে একটি প্রবাদ আছে— সুবাহ কা ভুলা শাম কো ঘর আ যায়ে তো উসে ভুলা নেহি কহতে। যার বাংলায় তর্জমা করলে হয়, “সকালবেলা পথ ভুললেও যদি কেই সন্ধেয় ফিরে আসে, তাকে আর পথভ্রষ্ট বলা যায় না।।”

শেষ আপডেট: 20 November 2025 16:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিন্দিতে একটি প্রবাদ আছে— সুবাহ কা ভুলা শাম কো ঘর আ যায়ে তো উসে ভুলা নেহি কহতে। যার বাংলায় তর্জমা করলে হয়, “সকালবেলা পথ ভুললেও যদি কেই সন্ধেয় ফিরে আসে, তাকে আর পথভ্রষ্ট বলা যায় না।।” এই প্রবাদটাই যেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের গল্পটাকে নিখুঁতভাবে ধারণ করে। তিনি কি তাহলে সেই ‘পথভ্রষ্ট’ নায়ক? প্রশ্নটা কঠিন, কিন্তু উত্তরটা হয়তো আরও কঠিন— ভুল বলা যাবে না।
যে পরমব্রত একসময় শিল্পী মহলের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরদের পাশে দাঁড়িয়ে ফেডারেশনের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন, আদালতে মামলা করেছিলেন, লড়াইয়ের অগ্রভাগে ছিলেন— সেই তিনিই বুধবার সকালে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও বার্তা দিয়ে জানিয়ে দিলেন, তিনি আর এই আইনি লড়াইয়ের অংশ নন। নিঃসন্দেহে এটা এক বিরাট মোড়। কাহানিতে ট্যুইস্টের মতোই। শুধু ফারাকটা এই যে ট্যুইস্টের দেওয়াল লিখন নন্দনের পাঁচিলে দেখা যাচ্ছিল। অর্থাৎ রহস্যের আর বাকি কিছু ছিল না। পরমব্রত স্বীকার করলেন— আইনি পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত ছিল হঠকারী, হয়তো সঠিকও ছিল না।
সিনেমায় যেমন অনেক না বলা সংলাপের নেপথ্যেও একটা গল্প থাকে। তেমনই অনেকেই এদিন পরমের ভিডিও বার্তার প্রতিটি লাইন দু’বার করে শুনেছেন। আর বোঝার চেষ্টা করেছেন, এমনিই এমনিই এই ভিডিও। স্রেফ বোধদয় বা আত্মোপলব্ধি থেকে এই শীত সকালে পরম-ভাষণ। নাকি স্বরূপ বিশ্বাসের শর্তপূরণ করলেন পরম। অর্থাৎ তাঁদের মনে প্রশ্ন, স্বরূপই কি শর্ত দিয়েছিলেন, এভাবে ভিডিও বার্তায় সব ভুল মেনে নিলে তবেই সব কিছু শোধবোধ হবে!
এ প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেন, কী যে বলেন আপনারা, ওনার যে ভুলটা ভুল মনে হয়েছে এটাই তো ভাল ব্যাপার।
স্বরূপ বিশ্বাসের নেতৃত্বে ফেডারেশন যে সুসংগঠিতভাবে কাজ করছে, তা নিয়ে এদিন খোলাখুলি প্রশংসা করেছেন পরমব্রত। এরই মধ্যে অনেকে ভিডিওটি দেখেছেন— তাঁদের মধ্যে পরমব্রতের দীর্ঘদিনের বন্ধু রুদ্রনীলও রয়েছেন। রুদ্রর ভাইরাল জ্বর হয়েছে। ফোন ধরে বললেন, গলাটা কেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো হয়ে গেছে না! পরে বলেন, “পরমের ভিডিওটা শুনেছি। বাঁচতে গেলে, পরিবার-সংসার-সন্তান সামলে চলতে গেলে স্বরূপবাবুরাই যা বলছেন তা মেনে চলতে হয়— আজকের পশ্চিমবঙ্গে, হয়তো ওর সেই উপলব্ধি হয়েছে। আমার ভাই পরমব্রত এই ভিডিও পোস্ট করেছে— হয়তো নিজে চাইছে, হয়তো কেউ বলেছে— কিন্তু করেছে ঠিকই।”
আরজিকর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় পরবর্তী অধ্যায়— ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে মামলা, সভাপতির বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ— এবং তাতে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সামনের সারিতেই।
কিন্তু তার মাশুলও কম নয়। শিল্পী মহলে গুঞ্জন ছড়ায়— তাঁর কর্মজীবনে নেমে এসেছে এক অদৃশ্য ‘আজীবন অসহযোগিতা’। কাজ একপ্রকার থমকে যায়। শুধু তিনি নন— অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরি, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায়ের মতো কয়েকজন পরিচালকও একই কোপে পড়েন। যে DAEI সংগঠনের পতাকার নিচে তাঁরা একসময় একসাথে দাঁড়িয়েছিলেন— সেখানেও দেখা দেয় বিভাজন, অবিশ্বাস, অন্তর্দ্বন্দ্ব।
ফলে একসময় যে সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়— তাঁরা একে একে লড়াইয়ের পথ থেকে সরে এসে আবার কাজে ফিরেছিলেন, মামলার বোঝা ঝেড়ে ফেলেছিলেন। এদিন পরমব্রতও সেই একই তালিকায় নাম লেখালেন। যেভাবে শিবপ্রসাদ, কৌশিক বা সৃজিৎ নিজেদের ভিডিও বার্তায় জানিয়ে দিয়েছিলেন মামলার পথ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত, ঠিক সেই ছকটাই অনুসরণ করলেন পরম— স্পষ্ট ভাষায় বারবার উচ্চারণ করলেন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের নাম, তাঁর নেতৃত্বে আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের আশ্বাস দিলেন। শ্রমিক ঐক্যের জয়গান করলেন, ফেডারেশনের দীর্ঘায়ু কামনা করলেন।
তবে এই পথ বদলের শেষে একটাই প্রশ্ন থেকে যায়— এতদিনের সংগ্রাম, শ্লোগান, আদালতের কাগজপত্র, প্রকাশ্যে উচ্চারিত অভিযোগ— সবই কি তাহলে ভুল বোঝাবুঝি ছিল? নাকি এই মোড় ঘোরাটা আসলে শিল্পজগতের স্বীকৃত নিয়ম— যেখানে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে গেলে লড়াই নয়, সমঝোতার হাতটাই ধরতে হয়? অনির্বাণ ভট্টাচার্যও নিশ্চয়ই সবটা দেখতে পাচ্ছেন...