বৃহস্পতিবার ধনধান্য অডিটোরিয়ামের আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় তাঁকে দেখে যেন অনেকের মনেই প্রশ্নটা জেগেছিল— সত্যিই কি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের প্রত্যাবর্তন শুরু হল?

অনির্বাণ-পরম।
শেষ আপডেট: 7 November 2025 16:07
বৃহস্পতিবার ধনধান্য অডিটোরিয়ামের আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় তাঁকে দেখে যেন অনেকের মনেই প্রশ্নটা জেগেছিল— সত্যিই কি পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের প্রত্যাবর্তন শুরু হল?
সেই মুখ, যাঁকে গত কয়েক মাস শুধুমাত্র দেখা গেছে পুজোর ফিতে কাটায়, অরিন্দম শীলের জগদ্ধাত্রী পুজোর মণ্ডপে, হইচইয়ের নতুন ছবির প্রমোশনাল ইভেন্টে, কিংবা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির বিজয়া সম্মিলনীতে। সস্ত্রীক বাড়ির পুজো থেকে শুরু করে আমেরিকার গ্লোবাল বেঙ্গলি আইকন অ্যাওয়ার্ডে—সবেতেই উপস্থিত তিনি। কিন্তু সিলভার স্ক্রিনের আলো থেকে ছিলেন অনেক দূরে।
এই দূরত্বের পেছনে কারণও নেহাত কম নয়। আরজিকর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ঘটনায় সরকারের অবস্থানের বিরোধিতা করে রাস্তায় নেমেছিলেন তিনি। পরে ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার (FCTWEI) বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন, মানহানির অভিযোগও তোলেন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। ছিলেনও একেবারে সামনের সারিতে। কিন্তু তার পরিণতিও কম কঠিন ছিল না।
শিল্পী মহলের গুঞ্জন— সেই সময় থেকেই তাঁর কর্মজীবনে নেমে আসে ‘আজীবন অসহযোগিতা’। কাজ থেমে যায় পরমব্রত। পরমব্রত একাই নন, একই পরিণতির ‘কোপ’ পড়েছিল অনির্বাণ ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরি, বিদুলা ভট্টাচার্য, সুদেষ্ণা রায়ের মতো আরও কয়েকজন পরিচালকেরও। একসময়ে DAEI নামের যে সংগঠনটি কাঁধে কাঁধ ধরে একে অন্যের পাশে ছিলেন তাঁদের মধ্যেও শুরু হয় বিভাজন, অন্তর্দ্বন্দ্ব। আর সেই ভাঙনের ভেতর দিয়েই একে একে সরে যান শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়রা। তাঁরা আবার ছবির জগতে ফিরে যান, মামলাগুলো ঝেড়ে ফেলেন।
টলিপাড়ার অন্তর্কলহ নিয়ে দায়ের হওয়া মামলা কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিনহা যখন খারিজ করেন, তখনও সবকিছু আগের মতো ফেরেনি না। কিছু মানুষ কাজে ফিরেছিলেন, কিছু মানুষ ফিরতে পারেননি। সেই তালিকার শীর্ষে— পরমব্রত এবং অনির্বাণ।
তবে টলিপাড়া ও শাসক দলের মধ্যেই আলোচনা যে, গত দু’মাসে ছবিটা একটু একটু বদলাতে শুরু করেছে পরমব্রত ক্ষেত্রে। রেড রোডের কার্নিভালের মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দেখা গিয়েছিল তাঁকে, হাসিমুখে যিশু সেনগুপ্তর সঙ্গে নাচতেও দেখা যায়। এক সাক্ষাৎকারে শোনা গিয়েছিল একেবারে ভিন্ন সুর— “কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, কিছু মনোমালিন্যও। কিন্তু আমি আশাবাদী, সব ঠিক হয়ে যাবে।” প্রতিবাদের সুর যেন একটু থেমে গিয়ে জায়গা দিয়েছিল বোঝাপড়াকে।
এবং ঠিক তার পরই— গত কালের সন্ধে। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চে সাংসদ-অভিনেত্রী জুন মালিয়ার সঙ্গে সঞ্চালকের আসনে পরমব্রত। উপস্থিত অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে জানাতে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসায় মুখর তিনি। অনেকর মনে ‘এ যেন এক অন্য পরম’!
সূত্র বলছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কথোপকথনও হয়েছে। পাশে ছিলেন অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, অরিন্দম শীল, ফিরদৌসুল হাসান, প্রমুখ।
পরম-অরূপের এই কথোপকথন এখন টলিপাড়ারও আলোচনার বিষয়। অরূপের অনুগামীরা বলছেন, বাড়িতে অতিথি এলে কি গৃহকর্তা কথা বন্ধ করে চুপ করে থাকবেন।আবার অনেকে বলতে শুরু করেছেন, কে বলতে পারে কথায় কথায় হয়তো গলেছে বরফ।
অনেকে আবার মনে করছেন, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসই নাকি, তাঁর ভাই তথা ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে পুনর্মিলনের ‘ক্যাটালিস্ট’। আবার অন্য সূত্রের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও নাকি পরমব্রতর ব্যক্তিগতভাবে কথাবার্তা হয়েছে।
কিন্তু এরই মধ্যে একটা ঘটনাও চোখে পড়ার মতই। তা হল, পরমব্রত মঞ্চে জায়গা পাওয়ার পর ফেডারেশনের অনেকেই অসন্তুষ্ট। তাঁরা আবার চলচ্চিত্র উৎসব থেকেই দূরত্ব রাখছেন। এমনকি ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসকেও দেখা যাচ্ছে না উৎসব পাড়ায়।
সব মিলিয়ে টলিপাড়ার অন্দরমহলে এখন নতুন গুঞ্জন— ফেরা কি তাহলে অনিবার্য? পরমব্রত কি সত্যিই ফিরে আসছেন মুলস্রোতে? নাকি সমঝোতায় আরও সময় লাগবে।
যাঁরা একসময় পরমের মতোই ফেডারেশনের সঙ্গে দূরত্বে ছিলেন, তাঁদের অনেককেই এখন সরকারি অনুষ্ঠানে দেখা যায়। সুদেষ্ণা রায় যেমন এখন কমিটি মিটিং থেকে শুরু করে উৎসবের সদস্য পদ— সব জায়গাতেই সক্রিয়। তিনিও ছিলেন কার্নিভালে, ছিলেন ধনধান্য অডিটোরিয়ামে।
চুম্বকে শীত পড়ার আগেই যেন হাওয়া বদলের ইঙ্গিত। কিন্তু এখনও যিনি হয়তো সেই হাওয়াবদলে ভরসা করতে পারেননি, তিনি অনির্বাণ ভট্টাচার্য। পরমব্রতের পাশে তাঁর নামটা এখনও প্রশ্নবোধকের মতো ঝুলে আছে।
তাহলে কি একদিন দেখা যাবে, সরকারি মঞ্চে তিনিও মাইক্রোফোন হাতে সঞ্চালক? তারপর হয়তো আবার বড়পর্দায় ফিরে আসবেন নিজের মতো করে? তাহলে কি সত্যিই সব ‘মনোমালিন্য’ একদিন মুছে যাবে? উত্তর দিতে পারে শুধু সময়!