টলিউডে শুরু হয়েছে এক নতুন নিয়মের যুগ, যেখানে প্রতিযোগিতার জায়গায় এসেছে সহযোগিতা, বিশৃঙ্খলার জায়গায় এসেছে পরিকল্পনা, আর শ্রমের পাশে দাঁড়িয়েছে তার প্রাপ্য মূল্য। কাজের সময় বেড়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে বেড়েছে সম্মান ও পারিশ্রমিকও পুরো ৩৩ শতাংশ।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 29 October 2025 22:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: টলিউডে আজ যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন (EIMPA) ও ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস যৌথভাবে ঘোষণা করল ২০২৬ সালের ছবিমুক্তির নতুন ক্যালেন্ডার এবং টেকনিশিয়ানদের পারিশ্রমিক ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত। এই এক ঘোষণাতেই যেন বদলে গেল বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা—যেখানে অর্থ, পরিশ্রম, এবং পরিকল্পনা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন শৃঙ্খলার প্রতীকে।
বছরের পর বছর ধরে দেখা গিয়েছিল উৎসব বা বিশেষ দিনে একাধিক বড় বাজেটের বাংলা ছবি একসঙ্গে মুক্তি পেত, দর্শক বিভক্ত হয়ে যেতেন, ক্ষতিগ্রস্ত হতেন প্রযোজক-পরিচালকরা। সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবার থামানোর উদ্যোগ নিল ইম্পা ও ফেডারেশন। নির্দিষ্ট করা হয়েছে বছরজুড়ে ১১টি বিশেষ দিন—যেমন ২৩ জানুয়ারি, সরস্বতী পুজো, পয়লা বৈশাখ, মে মাসের গরমের ছুটি, ঈদ, স্বাধীনতা দিবস, দুর্গাপুজো, কালীপুজো ও বড়দিন—এই দিনগুলোতেই মুক্তি পাবে বড় বাজেটের ছবি। এক দিনে তিনটির বেশি বড় ছবি মুক্তি দেওয়া যাবে না এবং একটি বড় ছবির মুক্তির পর অন্তত পনেরো দিনের ব্যবধান বজায় রাখতে হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রযোজনার জগতে আসছে ভারসাম্য। প্রযোজকদেরও ভাগ করা হয়েছে তাঁদের বার্ষিক ছবির সংখ্যার ভিত্তিতে। বছরে ছ’টি ছবি বানানো সংস্থাগুলি পাবে চারটি উৎসবের দিন মুক্তির সুযোগ, চারটি ছবি বানানো সংস্থা পাবে দুটি, আর দুই থেকে তিনটি ছবি বানানো প্রযোজক পাবেন একটি উৎসবের দিন। ফলে বড় ও ছোট প্রযোজকের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা গড়ে উঠবে।
টেকনিশিয়ানদের জন্য এই ঘোষণার তাৎপর্য আরও বড়। বহুদিনের দাবির পর অবশেষে তাঁদের পারিশ্রমিক ৩৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কাজের সময়সীমাও এখন থেকে সর্বাধিক ১৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে—আগে দিনে প্রায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ চলত। বাস্তবতা মেনেই এই নতুন কাঠামো তৈরি হয়েছে, যাতে শ্রমের যথাযথ মূল্য দেওয়া যায়। একই সঙ্গে কম বাজেটের ছবির ক্ষেত্রেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে, ৩০ লক্ষ টাকার সীমা নামিয়ে আনা হয়েছে ২৫ লক্ষে, যাতে ছোট প্রযোজক ও স্বাধীন পরিচালকরা কিছুটা স্বস্তিতে থাকেন।
বুধবার ধর্মতলার ইম্পা অফিসে এই ঘোষণা ঘিরে উপস্থিত ছিলেন দুই সংগঠনের প্রতিনিধি পিয়া সেনগুপ্ত ও স্বরূপ বিশ্বাস। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন প্রযোজক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নিসপাল সিং রানে, অঙ্কুশ হাজরা, রানা সরকার, গোপাল মদনানি, নীলাঞ্জন দত্ত ও পরিবেশক শতদীপ সাহা। দীর্ঘদিনের কথোপকথনের পর অবশেষে এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছনো যায়। যদিও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না দেব, রাজ চক্রবর্তী, অতনু রায়চৌধুরী, নন্দী মুভিজ় ও ফিরদৌসল হাসান—যাঁদেরই ছবিগুলি আগামী বড়দিন ও ২৩ জানুয়ারির মুক্তির তালিকায় রয়েছে।
এই বড়দিনেই মুক্তি পাচ্ছে তিনটি ছবি, ‘প্রজাপতি ২’, ‘মিতিনমাসি’ এবং শ্রীকান্ত মোহতা-মহেন্দ্র সোনির নতুন প্রযোজনা। নেতাজি জয়ন্তীতে মুক্তি পেতে চলেছে ‘হোক কলরব’, ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ এবং আরও একটি বড় ছবি। তবে অঙ্কুশ হাজরা ও ফিরদৌসল হাসানের দুটি ছবি বাণিজ্যিক কারণে আপাতত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাংলা ছবির ব্যবসা এবং মুক্তির ব্যবস্থাকে আরও গঠনমূলক করতে তৈরি হয়েছে নতুন প্রযোজনা বিভাগও। এসভিএফ, সুরিন্দর ফিল্মস ও নন্দী মুভিজ় বছরে ছ’টি ছবি বানাবে, উইন্ডোজ়, দাগ ক্রিয়েটিভ মিডিয়া ও ক্যামেলিয়া প্রোডাকশনস বানাবে চারটি করে ছবি, আর জিৎ, পিয়া সেনগুপ্ত ও অঙ্কুশ হাজরা প্রযোজনা করবেন দুটি করে।
সব মিলিয়ে টলিউডে শুরু হয়েছে এক নতুন নিয়মের যুগ—যেখানে প্রতিযোগিতার জায়গায় এসেছে সহযোগিতা, বিশৃঙ্খলার জায়গায় এসেছে পরিকল্পনা, আর শ্রমের পাশে দাঁড়িয়েছে তার প্রাপ্য মূল্য। কাজের সময় বেড়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে বেড়েছে সম্মান ও পারিশ্রমিকও—পুরো ৩৩ শতাংশ।
সব মিলিয়ে, টলিউডে এবার শুরু হল নতুন নিয়মের সূচনা। প্রযোজনা, মুক্তি, সময় ও পারিশ্রমিক—সব কিছুর মধ্যে এনে দেওয়া হচ্ছে এক সুসংহত কাঠামো। প্রশ্ন রয়ে গেল একটাই—এই নতুন নিয়ম কি সত্যিই বাংলা ছবিকে বাণিজ্যিক স্থিতি ও সম্মানের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে পারবে? উত্তর সময়ই দেবে, তবে আপাতত টলিউডে বইছে খুশির হাওয়া—আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে টেকনিশিয়ানদের পারিশ্রমিক বাড়ল ৩৩ শতাংশ।