শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুসংবাদে সারা বাংলাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। খুব সম্প্রতি হেমন্ত হেমন্ত বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন। ফিরে যাবার সময় আবার ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন।

শেষ আপডেট: 26 September 2025 13:39
কলকাতা থেকে সন্ধের ফ্লাইটে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের (Hemanta Mukherjee) মুম্বই পৌঁছনোর কথা ছিল। ঠিক করেছিলেন অন্যবারের মতো ১৯৮৯র পুজোটাও বম্বেতেই কাটাবেন। হল না। বম্বের বন্ধুরা, গুণমুগ্ধরা আর কোনওদিনও হেমন্তকে দেখতে পাবেন না।
মঙ্গলবার রাত সওয়া এগারোটা নাগাদ বেলভিউ নার্সিংহোমে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন (Passed Away) সুরলোকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। বম্বে-বাংলায় অঝোর শ্রাবণ নামল শরতেই।

হেমন্তর চলে যাওয়া যেন বঙ্গজীবনে শরতে শীত এনে দিয়েছিল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের শেষ শয্যায় হাসপাতালে পাশে ছিলেন স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায় ও কন্যা রাণু মুখোপাধ্যায়। ছেলে জয়ন্ত আর অভিনেত্রী পুত্রবধূ মৌসুমী তখন বম্বেতে গীতাঞ্জলির বাড়িতে। বাবার মৃত্যুসংবাদের খবর পেয়েই কলকাতা ছুটে আসেন তাঁরা।
বম্বে থেকে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় জানালেন 'হেমন্তর মৃত্যুসংবাদ শুনে ঘুমের ওষুধ খেয়েও চার ঘন্টায় আমার ঘুম আসেনি।' ভোর হতেই এমন খবরে শোকে বিহ্বল লতা মঙ্গেশকর। লতা যখন এই দুঃসংবাদ পেলেন তখন তিনি পুজোর ঘরে। ফোন আর ধরতে পারলেন না কোকিলকণ্ঠী। লতা প্রথম কলকাতা এসে তো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতেই উঠেছিলেন।

দক্ষিণ কলকাতার শরৎ চ্যাটার্জী রোডের হেমন্তর ফ্ল্যাটে তখন একে একে আসতে আরম্ভ করেছেন বাংলার নামীদামী শিল্পীরা। সাধারণ মানুষের কালো মাথার ভিড়ে ভরে গিয়েছে রাস্তা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এসে হেমন্তকে জড়িয়ে বললেন বললেন 'আমার জুটি চলে গেল'। বেলাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন সন্ধ্যা। একে একে এলেন মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, তরুণ মজুমদার, জ্যোতি বসু। সন্ধ্যা রায় থমথমে মুখে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে এলো চুলে নামলেন গাড়ি থেকে। ঢুকে গেলেন হেমন্ত ফ্ল্যাটে। মৈত্রেয়ী দেবী, সবিতাব্রত দত্ত, রবি ঘোষ, রামকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র বাদ ছিলেন না কেউ।
পুত্রবধূ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় অঝোরে কেঁদে চলেছেন। স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায় মাঝে মাঝেই আর্তনাদ করে উঠছেন 'ওগো কথা বলো, ওগো ফিরে এসো'। মেয়ে রাণু, মা আর বৌদির মাঝখানে নিথর হয়ে বসে।
শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুসংবাদে সারা বাংলাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। খুব সম্প্রতি হেমন্ত হেমন্ত বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন। ফিরে যাবার সময় আবার ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের সেই ইচ্ছেপূরণ হল না।

এরপর হেমন্তর মরদেহ নিয়ে শববাহী ট্রাক যাত্রা শুরু করে। সেদিন আর কোনও বাঙালি শ্রোতা ঘরে নেই। বেশিরভাগ জন পথে নেমে পড়েন। সারা শহর, সারা বাংলা পথে নেমে এসেছে।
১৯৮০ সালে উত্তমকুমারের শেষযাত্রায় অগনিত মানুষের মাথা দেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হেমন্ত পুত্রবধূ মৌসুমীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন 'হ্যাঁ রে ইন্দু, আমার নায়ক তো চলে গেল। কণ্ঠ পড়ে রইলাম।আমার শেষযাত্রায় কী উত্তমের মতো এত লোক হবে?'
কথা মিলল! সেই ঢল, সেই আবেগ পথে নামল হেমন্তর শেষযাত্রায়।