দর্শককে চমকে দেওয়ার জন্য যে আগ্রাসী ভঙ্গি, যে তীব্রতা আর যে উচ্চস্বরে তৈরি করা অ্যাকশন স্পেকট্যাকল—‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ নিঃসন্দেহে সেই পথেই হাঁটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় এক অদ্ভুত শূন্যতার সামনে।

শেষ আপডেট: 23 March 2026 12:54
দর্শককে চমকে দেওয়ার জন্য যে আগ্রাসী ভঙ্গি, যে তীব্রতা আর যে উচ্চস্বরে তৈরি করা অ্যাকশন স্পেকট্যাকল—‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ নিঃসন্দেহে সেই পথেই হাঁটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় এক অদ্ভুত শূন্যতার সামনে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পাওয়া প্রথম ছবিটি যেখানে রহস্য, চরিত্রের দ্বন্দ্ব আর দ্রুতগতির গল্প বলার মাধ্যমে নানা মতাদর্শের দর্শকদেরও টেনে নিয়েছিল, সেখানেই দ্বিতীয় পর্বটি যেন নিজের জোরেই ভারসাম্য হারাল।
প্রথম ছবির কেন্দ্রে ছিল হামজার পরিচয় আর উদ্দেশ্যের ধাঁধা। ধূসর রঙের এক নায়ক, চালাক এক ভিলেন, পরিপাটি সাপোর্টিং চরিত্র, গল্পের সঙ্গে মানানসই প্রেম—সব মিলিয়ে একটা টানটান নির্মাণ। কিন্তু দ্বিতীয় ছবিতে এসে সেই নির্মাণ যেন ভেঙে পড়ে অতিরিক্ত বার্তা আর ‘মোদী’ প্রদর্শনের চাপে। শুরুতেই জসকিরত সিংয়ের অতীত দেখানো হয়—একজন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখা যুবক, যার জীবন এক পৈশাচিক ঘটনার পর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সেই আঘাতই তাকে পরিণত করে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলা এক মেশিনে। প্রথম দৃশ্য থেকেই সে যেন মানুষ নয়, ধ্বংসের প্রতীক—হাতের সামনে যা পায়, তাকেই নির্মমভাবে শেষ করে। রক্তপাত, নিষ্ঠুরতা—সবকিছু এমন মাত্রায় দেখানো হয় যে দ্রুতই তা প্রভাব হারাতে শুরু করে। (Dhurandhar 2, Dhurandhar The Revenge, Bollywood spy thriller, Ranveer Singh, Aditya Dhar, demonetisation)
প্রথম ছবির শেষে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছিল, তার উত্তর খোঁজার প্রত্যাশা থাকলেও পরিচালক আদিত্য ধর যেন সেই দিক থেকে সরে গিয়ে বাকি পড়ে থাকা উপাদানগুলোকে একসঙ্গে জোড়া লাগিয়েছেন। ফলে, গল্প এগোনোর বদলে এক ধরনের জোড়াতালি অনুভূতি তৈরি হয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, যা প্রথম ছবির মূল শক্তি ছিল, তা এখানে প্রায় গৌণ হয়ে যায়। তার জায়গা নেয় ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সময়—নেতৃত্বের উত্থান, এবং বিশেষ করে মোদী সরকারের নোটবন্দির মতো বড় সিদ্ধান্ত।
এই জায়গাতেই ছবিটি সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করে। নোটবন্দিকে এখানে একেবারে নায়কোচিত পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়—যেন গোপন ষড়যন্ত্র ভেস্তে দিতে এটি ছিল অপরিহার্য। বাস্তবের দীর্ঘ লাইন, মানুষের ভোগান্তি, অর্থনৈতিক প্রশ্ন—কিছুই নেই। বরং এক ধরনের কৃতজ্ঞতার অনুভূতি তৈরি করার চেষ্টা চলে। গল্প এমনভাবে সাজানো যে তা প্রায় এক রাজনৈতিক প্রশংসাপত্র হয়ে ওঠে—এক ‘চাওয়ালা’ নেতার এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীর (যার চরিত্র বাস্তবের এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপদেষ্টার প্রতিফলন) প্রতি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইঙ্গিতও ছবিতে ঢুকে পড়ে—বিশেষ করে ইজরায়েলের সঙ্গে ‘নতুন ভারতের’ ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ, যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। একইসঙ্গে দাউদ ইব্রাহিমকে নিয়েও এক দ্বৈত অবস্থান দেখা যায়—একদিকে বলা হচ্ছে তাঁর প্রভাব অনেক আগেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে, অন্যদিকে গল্পের বড় অংশ জুড়েই তাঁর তৈরি হুমকির উপস্থিতি। এই বৈপরীত্য স্পষ্ট। পাশাপাশি ‘উরি অ্যাটাক’-এর উল্লেখও আছে, আর অনেকেরই মত, এই ধারা যদি চলতেই থাকত, তবে গল্প হয়তো একসময় কোভিড ভ্যাকসিনেশন কিংবা লকডাউন-এর পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়ে যেত।
![]()
সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় প্রতিপক্ষ চরিত্রের অভাবে। প্রথম ছবিতে অক্ষয় খান্নার রহমান ডাকাইত যে তীব্রতা এনেছিলেন, তার অনুপস্থিতি এখানে স্পষ্ট। নতুন ভিলেনদের মধ্যে সেই গভীরতা নেই, বরং চরিত্রগুলো যেন একে অপরের জায়গা বদলাচ্ছে। অর্জুন রামপালের চরিত্রের পরিবর্তনও আসে দেরিতে, এবং তা যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে না। (Uri attack, Dawood Ibrahim, Indian politics, propaganda film, hyper-nationalism, India-Israel relations, action movie review, Bollywood review, spy universe, COVID vaccination reference)
সংগীত ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও আগের মতো কাজ করে না। বরং অতিরিক্ত জোরে, অতিরিক্ত অনুপ্রবেশকারী মনে হয়। হিংসা আরও বেড়েছে—গলা কাটা, বিচ্ছিন্ন মাথা নিয়ে ফুটবল খেলা—সবই রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে ভয়ের রাজনীতি, চরমপন্থী বক্তব্য, এমন সংলাপ যা ভবিষ্যতের এক বিভীষিকাময় চিত্র আঁকে। পুরুষ চরিত্ররা দেশমাতার বন্দনা করে, আর নারী চরিত্রগুলো প্রত্যেকেই কেমন চুপচাপ!
এই অতিরিক্ততা ধীরে ধীরে অসাড় করে দেয়। গল্পের নানা দিক অপূর্ণ থেকে যায়—বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কের মতো কিছু ট্র্যাক অর্ধেকেই থেমে যায়। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোও আগের মতো নতুনত্ব ধরে রাখতে পারে না। যা একসময় চমক ছিল, তা এবারে ক্লান্তিকর।
তবুও অভিনয়ের জায়গায় কিছু ভাল লেখার রয়েছে। রণবীর সিং তাঁর চরিত্রে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন, এবং ছবির ভার অনেকটাই তিনি সামলে রাখেন। সঞ্জয় দত্তের চরিত্র পূর্বানুমানযোগ্য, তেমন চমক নেই। অন্যদিকে বেদির চরিত্র মাঝে মাঝে তাঁর নিখুঁত টাইমিং দিয়ে দর্শককে জাগিয়ে তোলে।

ছবির দৈর্ঘ্যও একটি বড় সমস্যা—প্রায় চার ঘণ্টার কাছাকাছি সময় ধরে গল্প টেনে নেওয়া হয়েছে, যেখানে শেষের দিকে গতি আরও মন্থর হয়ে পড়ে। সবকিছু একসঙ্গে ঢোকানোর চেষ্টা যেন ছবিটিকে ভারী করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত ‘ধুরন্ধর ২’ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়—বাইরে থেকে বিশাল, জোরালো, আত্মবিশ্বাসী; কিন্তু ভেতরে ঢুকলে ফাঁপা। অ্যাকশন আছে, রক্ত আছে, বার্তা আছে—কিন্তু গল্প কোথায়?
প্রশ্ন থেকে যায়—জসকিরত সিংয়ের গল্প কি এখানেই শেষ? নাকি আরও এক পর্বের অপেক্ষা? আর যদি সেই পর্ব আসে, তখন কি সত্যিই নতুন কিছু বলার থাকবে—নাকি শুধু আরেকটা বিচ্ছিন্ন মাথা, আরেকটা জোরালো স্লোগান?