চন্দ্রাবলীর গান সবাইকে ছাপিয়ে গেল। অভূতপূর্ব অনির্বচনীয়। 'আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে', 'বাজল তোমার আলোর বেণু', 'আনন্দে মাতে গিরিরাজ পুরী' প্রতিটি গানেই চন্দ্রাবলী নিজের কণ্ঠ মাধুর্যের ছাপ রাখলেন।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 September 2025 15:32
যোধপুর পার্ক 'গীতিকা' (Geetika) কালচারাল সোসাইটির রজত জয়ন্তী বর্ষে ১৫ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠিত হল এক আগমনি সন্ধ্যা। একেবারে নিখাদ বাঙালিয়ানায় ভরে উঠল মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান। প্রধান কারিগর ছিল বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী দত্ত পরিবার। চন্দ্রাবলী রুদ্র দত্ত (Chandrabali Rudra Dutta), তাঁর স্বামী প্রদীপ দত্ত ও কন্যা দীপাবলী দত্ত।
চন্দ্রাবলী ও প্রদীপের নিজ হাতে গড়া 'গীতিকা' ২৫ বছরে পা দিল। এ দিনের অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল 'দুর্গে দুর্গতিনাশিনী' (Durgedurgatinashini) বিশেষ গীতিআলেখ্য। সঙ্গে দেবী দুর্গার আবাহন ও দুর্দান্ত নৃত্যপরিবেশনা।

অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হল 'শরৎ বন্দনা'র মাধ্যমে। মহালয়ার আগেই এল পুজোর রেশ। শুরুতেই কবিতায় মন জয় করে নিল শুভ জোয়ারদারের গ্রন্থনা। বাচিকশিল্পী রাজা দাসের কণ্ঠ তো আমাদের চিরচেনা সেই 'এফ এম' যুগ থেকেই। রাজা আবৃত্তি করলেন শরতের আদি অকৃত্রিম সেই 'সহজ পাঠ'-এর কবিতা 'এসেছে শরৎ হিমের পরশ, লেগেছে হাওয়ার পরে'। রাজার কণ্ঠে রবি ঠাকুরের 'আশ্বিনের মাঝামাঝি,উঠিল বাজনা বাজি' কবিতায় মধু বিধু দুই ভাইয়ের গল্প যেন আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। শরৎ বন্দনায় পরের নিবেদনে ছিল প্রদীপ দত্তের গান, যিনি 'গীতিকা'র প্রাণপুরুষ। 'শরৎ-আলোর কমলবনে বাহির হয়ে বিহার করে যে ছিল মোর মনে মনে' এবং 'আলোর অমল কমলখানি কে ফুটালে, নীল আকাশের ঘুম ছুটালে' দুটি শরৎ আহ্বানের গানে অনবদ্য। অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায় গাইলেন 'আমার নয়ন-ভুলানো এলে, আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে' ও 'এবার অবগুন্ঠন খোলো'।

দ্বিতীয়ার্ধে ছিল অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ 'দুর্গে দুর্গতিনাশিনী' গীতিআলেখ্যর সঙ্গে চোখ ধাঁধানো নৃত্য পরিবেশনা। সমগ্র আলেখ্য পরিচালনায় চন্দ্রাবলী রুদ্র দত্ত। চন্দ্রাবলী ও তাঁর কন্যা দীপাবলী, মা-মেয়ের জুটি যেন অনুষ্ঠানের প্রাণভ্রমরা। আগমনি গানে গানে মা-মেয়ে যেন মেনকা-উমার মতোই হাজির হলেন গানে। চন্দ্রাবলী দ্য ওয়ালকে বললেন "আগমনি গানের মানেই তো মায়ের কাছে মেয়ের ঘরের ফেরা। মা মেনকা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন উমার ঘরে ফেরার জন্য। আমার একমাত্র মেয়ে দীপাবলীর বিয়ে দেবার পর বুঝি এখন মেনকার আকুলতা। আমার মেয়েকে কদিন না দেখলেই মনে হয় কত বছর দেখিনি। পুজো মানেই তো মেয়েদের ঘরে ফেরা মায়ের কাছে।'
চন্দ্রাবলীর গান সবাইকে ছাপিয়ে গেল। অভূতপূর্ব অনির্বচনীয়। 'আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে', 'বাজল তোমার আলোর বেণু', 'আনন্দে মাতে গিরিরাজ পুরী' প্রতিটি গানেই চন্দ্রাবলী নিজের কণ্ঠ মাধুর্যের ছাপ রাখলেন। তবে তাঁর সেরা নিবেদন ছিল 'ঢুলি' ছবির সেই ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর গান 'ত্রিনয়নী দুর্গা মা তোর রূপের সীমা পাই না খুঁজে'।
চন্দ্রাবলীর যোগ্য কন্যা দীপাবলি দত্ত। লাইভ এত বড় অনুষ্ঠানে মঞ্চ ভরিয়ে রাখলেন দীপাবলি। এ যুগের মেয়ে হয়েও দুর্গা বন্দনা গানে অনবদ্য দীপাবলি। 'ভূবনমোহিনী বন্দি তোমারে দুর্গ দুর্গতিহারিনী', 'ওঁ জটাজুট সমাযুক্তাং অর্ধেন্দু কৃতশেখরাম্ ' থেকে 'অয়ি গিরিনন্দিনি নন্দিতমেদিনি' গানে দীপাবলি সকলের মন জয় করে নিলেন। কাজী নজরুলের 'মহাকালের কোলে এসে গৌরী হ'ল মহাকালী' দীপাবলির অনন্য গানে তবলার সঙ্গত দুরন্ত।

মা-মেয়ের সঙ্গে ছিলেন অলোক রায়চৌধুরী। 'জাগো দুর্গা' অনন্য রূপ পেল তাঁর কণ্ঠে। নিধুবাবুর গান 'গিরি কি অচল হলে আনিতে উমারে' ছিল অলোকের কণ্ঠে বিশেষ প্রাপ্তি।
দুর্গার ভূমিকায় মনে রাখার মতো গার্গী নিয়োগী ও বিনতা ভৌমিক। তবে বিনতা ভৌমিকের দুর্গা রূপে নৃত্য নজর কাড়ল বেশি। মঞ্চে মহাশক্তির সুচারু দৃশ্যকল্প ছিল কোরিওগ্রাফিতে। কোরাস নাচও মন কাড়ল। নাচে আরও এক শ্রেষ্ঠ নিবেদন ওপেন হার্ট অপারেশনের পর ৭৭ বছর বয়সী গুরু প্রদীপ্ত নিয়োগীর নৃত্য পরিবেশনা যেন অনুপ্রেরণা।
চন্দ্রাবলীর নিবেদনে এই আলেখ্য ভীষণ বাঙালিয়ানায় ভরপুর। দাশরথী রায়ের পাঁচালি গান
'গিরি গণেশ আমার শুভকারী/ পূজে গণপতি পেলাম হৈমবতী চাঁদের মালা যেনা চাঁদ সারি সারি' এ অনুষ্ঠানের প্রাপ্তি হয়ে থাকল। কোরক বসুর কণ্ঠে গায়ে কাঁটা দেওয়া চণ্ডীপাঠ মুগ্ধ করল।
সঞ্চালনায় ছিলেন মধুমিতা বসু ও দেবাশিস বসু। এই দিন 'গীতিকা' পক্ষ থেকে গুণীজন সংবর্ধনা দেন চন্দ্রাবলী। হৈমন্তী শুক্লা, প্রমিতা মল্লিকের মতো প্রথিতযশা শিল্পীর পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রকার পণ্ডিত সমর সাহা ও পণ্ডিত বিপ্লব মণ্ডলদের চন্দ্রাবলী ভোলেননি।
প্রতিটি শিল্পীর পোশাকে শক্তির রং লাল চয়ন করা ছিল আর এক আকর্ষণের কারণ। পোশাক পরিকল্পনা অনবদ্য। ২৫ বসন্ত পেরিয়ে ৫০ বসন্তে পৌঁছে যাক 'গীতিকা'।
ছবি রানা বন্দ্যোপাধ্যায়