কে বলবে ৬৩ বছরে পা দিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee)! অ্যাকশন থেকে ব্যক্তিত্বে তিনি যেন ৩৬। পৌরুষে এসেছে পিতৃসম আবেগ কিন্তু ফিটনেসে তাক লাগিয়ে দিলেন তিনি। দু চোখ ভরে তাঁকে শুধু দেখতে হয়।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 30 September 2025 23:48
ছবি: দেবী চৌধুরানী
শ্রেষ্ঠাংশে: শ্রাবন্তী ও প্রসেনজিৎ
চরিত্র চিত্রনে: অর্জুন, দর্শনা, কিঞ্জল, বিবৃতি
পরিচালনা: শুভ্রজিৎ মিত্র
'ফুলের মতো রূপটি তোমার নামটি যে প্রফুল্ল
ওরে চাঁদ যে সেও নয় গো তোমার চাঁদ মুখেরই তুল্য।।
রানি হবার কথা তোমার, তুমি ভিখারিনী
ছিন্নবাসে ক্ষুধার জ্বালায় কাটছে চিরদিনই
পতি থেকেও পতিগৃহে পাওনা সতীর মূল্য।।
ওরে কেই বা জানে কোন জনমে
ঐ কোন সে পুণ্যের ফলে,
আর কখন যে কার ভাগ্য কাকে কোথায় নিয়ে চলে
তেমনই তোমায় পথ থেকে সে সিংহাসনে তুলল
'দেবী চৌধুরানী' হলে অভাগী প্রফুল্ল।।'
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (Bankim Chandra Chattopadhyay) কালজয়ী উপন্যাস 'দেবী চৌধুরাণী' (Debi Chowdhurani) যুগে যুগে বেস্টসেলার। তিন বার বাংলা ছবিতে এই নিয়ে 'দেবী চৌধুরাণী' হল। ১৯৪৯ সালে সুমিত্রা দেবী, ১৯৭৪ সালে সুচিত্রা সেন ও ২০২৫ সালে শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়। নতুন 'দেবী চৌধুরানী'র ছবিটি কেমন হল?

আগের 'দেবী চৌধুরানী' ছবিগুলি বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনিকে ধরেই হয়েছিল। এ যুগের পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র তাঁর 'দেবী চৌধুরানী'কে গড়েছেন বঙ্কিম কাহিনি থেকে ভেঙে বাস্তবের মাটিতে। যে গল্পে মিশে আছে এতদিনের মিথ, জনশ্রুতি আর ঐতিহাসিক টুকরো টুকরো প্রমাণ। তবে যে বাঙালি দর্শকরা সুচিত্রা সেনের 'দেবী চৌধুরানী' দেখে এই ছবি দেখতে যাবেন তারা কাহিনিতে হোঁচট খেতে পারেন। তবে ইতিবাচক দিক হল বিগত যৌবনা সুচিত্রা সেনের নামেই ছবি হিট করেছিল। প্রফুল্ল ও দেবী রূপে শ্রাবন্তী অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু গল্প যত এগোয় সামনে আসে মূল কাহিনির নানা পরিবর্তন। পরিচালক বঙ্কিমের নির্যাস টুকু নিয়েছেন কিন্তু এই বদলে বাদ পড়েছে বহু চরিত্ররাও। তবু 'পরিচালকের স্বাধীনতা' থাকতেই পারে।
দক্ষিণী নকল এড়িয়ে বাংলার ডাকাতের রূপ উঠে এসছে এই ছবিতে। কাহিনি তো সবার জানা তবে ছবির উপসংহার আমূল বদলে দিয়েছেন পরিচালক। কী সেই চমক? সে চমক ভাঙতে চাই না। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন 'দেবী চৌধুরানী রূপ ছেড়ে প্রফুল্ল সংসারে আসিয়াই যথার্থ সন্ন্যাসিনী হইয়াছিল। প্রফুল্ল নিষ্কাম অথচ কর্মপরায়ণ। শাশুড়ি মা প্রফুল্লর হাতে দিলেন সমস্ত সংসারের ভার। দুই সতীনকে নিয়েই প্রফুল্ল বরের ঘর করিতে লাগিল। ব্রজেশ্বরকে প্রফুল্ল বলিল, 'তুমি যেমন আমার, তেমনি সাগরের, তেমনি নয়ান বউয়ের। আমি একা তোমায় ভোগ-দখল করিব না'। ক্রমে শ্বশুর হরবল্লভ প্রফুল্লর গুণ বুঝিলেন। প্রফুল্লর কথায় অতিথি নিবাস গড়ে ব্রজেশ্বর তার নাম দিলেন 'দেবীনিবাস'। যথাকালে পুত্র পৌত্র সমবেত হইয়া প্রফুল্ল স্বর্গারোহন করিল। দেশের লোক সকলে বলিল 'আমরা মাতৃহীন হইলাম'।
এই সংসার সুখী হয় রমণীর গুণের থেকেও নারীশক্তির সম্মান ও উদযাপন দেখালেন পর্দায় শুভ্রজিৎ। এখানেই তাঁর ভাবনা এ সময়ে দাঁড়িয়ে অনন্য। হ্যাঁ তিনি বঙ্কিম সাহিত্যকে ভেঙেছেন, প্রফুল্লর শাশুড়ি, দিদি শাশুড়ি এমনকি মেজো সতীন নয়ান বৌয়ের দেখা মিলল না ছবিতে। তবু অ্যাকশন বেসড 'দেবী চৌধুরানী' হিসেবে এই ছবি স্মার্ট। টানটান চিত্রনাট্যে ডাকাত সন্ন্যাসী ভবানী পাঠকের সেকুলার-তন্ত্রে উত্তরণ ঘটল।
অভিনয়ে নামভূমিকায় শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় (Srabanti Chatterjee) দেবী রূপে নিখুঁত। বঙ্কিমের গল্পের প্রফুল্ল ছিল অনেক বেশি নরম। সে সাপ ধরতে পারত না, এত ছুরি চালাবার সাহস তাঁর সহজাত ছিল না। সবটাই শেখা ভবানী পাঠকের আখড়ায়। কিন্তু এই ছবিতে অনাথা একাকিনী শ্রাবন্তী প্রথম থেকেই নিজের আত্মরক্ষার্থে তুমুল পারদর্শিনী। তুলনা আসবেই! 'দেবী চৌধুরাণী' রূপে সুচিত্রা সেন এগিয়ে না শ্রাবন্তী? উপন্যাসে প্রফুল্লর বয়সের তুলনায় অনেক বয়স্কা ছিলেন দীনেন গুপ্তর ছবির সুচিত্রা। তবে ছয়ের দশকে সত্যজিৎ রায় যে সুচিত্রা সেনকে দেবী চৌধুরানী ভেবেছিলেন তা হলে ইতিহাস হত হয়তো। মায়ের পথে মেয়ে মুনমুন সেনও মধ্যবয়সে 'দেবী চৌধুরানী' ধারাবাহিক করেছিলেন নয়ের দশকে। সেদিক থেকে শ্রাবন্তী প্রফুল্ল থেকে ডাকাত রানির ভূমিকায় পারফেক্ট। যদিও সুচিত্রা ঘোড়ায় চড়েছিলেন নিজেই। প্রসেনজিৎ থেকে শ্রাবন্তী সবটাই টেকনোলজির কেরামতিতে চড়লেন। তবে দেখতে মন্দ লাগেনি। অভিনেত্রী হিসেবে দেবী চৌধুরানী'র সার্থক চরিত্রায়ণ শ্রাবন্তী। অন্তত ভীষণ বিশ্বাসযোগ্য তিনি। রয়ে যাবেন ইতিহাসে দেবী হয়ে।

কে বলবে ৬৩ বছরে পা দিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee)! অ্যাকশন থেকে ব্যক্তিত্বে তিনি যেন ৩৬। পৌরুষে এসেছে পিতৃসম আবেগ কিন্তু ফিটনেসে তাক লাগিয়ে দিলেন তিনি। দু চোখ ভরে তাঁকে শুধু দেখতে হয়। ছবির শেষদিকে এক দুরন্ত ভবানী পাঠক। যে ভবানী ঠাকুরকে আমরা আগে দেখিনি। তিনি মুণ্ডিত মস্তক নন, পাগড়ি বাঁধা রক্তবর্ণ পোশাকে সন্ন্যাসী। প্রসেনজিতের সঙ্গে শ্রাবন্তীর রসায়ন ভীষণ ভাবে জমেছে। যা ছবি দেখার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে ব্রজেশ্বর চরিত্রে কিঞ্জল নন্দ চিত্রনাট্যের দাবি মিটিয়েছেন। শ্রাবন্তী বা সাগর বৌ দর্শনার সঙ্গে তাঁর রসায়ন দাগ কাটল না। সাগরের চরিত্রে দর্শনা বণিক মিষ্টি। হরবল্লভ সব্যসাচী চক্রবর্তী যথাযথ। তবে প্রসেনজিৎ-শ্রাবন্তীর বাইরে বিশেষ ভাবে নজর কাড়লেন সব্যসাচী পুত্র অর্জুন চক্রবর্তী। রঙ্গরাজ বলতে শেখর চট্টোপাধ্যায়কেই এতদিন জানত বাঙালি, এবার অর্জুনকে দেখে নতুন রঙ্গরাজ আমরা পেলাম। চরম দেহ সৌষ্ঠব থেকে ডাকাতের জীবন্ত অভিনয়ে তাক লাগালেন অর্জুন। অবিশ্বাস্য রকমের অনবদ্য। ততখানি ভাল নিশি রূপে বিবৃতি চট্টোপাধ্যায়। সাধক রামপ্রসাদ রূপে মনোময় ভট্টাচার্য নজর কাড়লেন। মিউজিক বিহীন খালি গলায় মনোময়ের দুটি রামপ্রসাদী বিশ্বাসযোগ্য। তেমনই একটি মজনু খাঁর চরিত্রে এলেন ভরত কল ভবানী ঠাকুরকে সাহায্য করতে। বঙ্কিম রচনার বাইরে এগুলি চরিত্রগুলো যেন আনা হল সেকুলার রাষ্ট্রের বার্তা দিতেই।

জঙ্গল থেকে পাহাড় হয়ে নদীর বাঁকে বাঁকে এ ছবির সম্পদ অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের ক্যামেরা। যা আরও মাত্রা দিল বিক্রম ঘোষের মিউজিক। এমন পিরিয়ড ড্রামার রূপটানে বড় ভূমিকা সোমনাথ কুণ্ডুর।
তবে শুভ্রজিতের ছবিতে জমিদারবাড়ির অন্দরমহলের গল্পের ক্লাইম্যাক্স জমল না। সুচিত্রা সেন ও সাগর বৌ সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎ যতখানি ছবিতে নাটকীয় ভাবে দেখান দীনেন গুপ্ত, তা এই ছবিতে কিছুটা হলেও কম। সেই আটপৌরে ব্যাপার পাওয়া গেল না। এমনকি যে শ্বশুর হরবল্লভের যে কথায় সুচিত্রা সেন ডাকাত রানি হলেন 'চুরি করে হোক, ডাকাতি করে হোক খাও'! সেই দৃশ্য এ ছবিতে দাগ কাটল না। নেই শাশুড়ির চরিত্র। জমছে না ব্রজেশ্বরের সঙ্গে দেবীর এক রাতের ফুলশয্যা। তবু শ্রাবন্তী দেবী চৌধুরানী রূপে মনে রয়ে যাবেন। পুজোয় নারী উদযাপনের এমন ছবিই তো আসলে দেবীপূজা।
'পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্, ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে”।।