এন্টারটেনমেন্ট ছবি তো বটেই। তবু এরমাঝেই আছে মন খারাপের সুর, ভালবাসা না পাবার ব্যথা। হিরোকে সেলিব্রেট করা হলেও জুনিয়র আর্টিস্ট থেকে তারকা চরিত্র সবাইকেই যোগ্য জায়গা দেওয়া হয়েছে।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 27 September 2025 20:17
ছবি: রঘু ডাকাত
নাম ভূমিকায়: দেব
চরিত্র চিত্রণে: ইধিকা, সোহিনী, রূপা, অনির্বাণ
পরিচালনা: ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রযোজনা: এসভিএফ
'হা রে রে রে ডাক ছেড়ে ডাকাত এল তেড়ে
মাথায় ঝাকড়া চুল, কানে গোঁজা জবা ফুল,
মুখ থেকে মুখোশে পড়ে ঝাঁপিয়ে ....'
ছেলেবেলার গল্প শোনা মানেই সকলের চিরকালের ফ্যান্টাসি ছিল বাংলার ডাকাতের গল্প। বাংলার ডাকাতদের মধ্যে সবথেকে দাপুটে ডাকাত ছিল রঘু ডাকাত। যাকে কেউ বলত অসুর, কেউ বা বলত দেবতা। রঘু ডাকাত বাংলার মিথ। পুজোয় সদ্য মুক্তি পেয়েছে ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Dhruba Banerjee) ছবি 'রঘু ডাকাত' (Raghu Dakat)। তবে পরিচালক ছবির শুরুতেই বলে দেন এই রঘু ডাকাত কোনও ঐতিহাসিক চরিত্র নয়। একেবারেই পরিচালকের নিজের লেখা কাল্পনিক চরিত্র। যে চরিত্রের প্রতীক অত্যাচারের বিরুদ্ধে জয়। নামভূমিকায় দেব (Dev)। কেমন হল পুজো রিলিজ সবথেকে চর্চিত ছবি 'রঘু ডাকাত'?

গরিবের সহায়, নীলকরের যম ‘রঘু ডাকাত'-এর রোমহর্ষক গল্প আমরা শুনেছি। সেই আইডিয়াকেই আরও বড় পরিসরে ফেলেছেন পরিচালক এই ছবিতে। দক্ষিণী ছবির নির্যাসে এই বাংলা ছবি তৈরি হলেও দুরন্ত অভিনয়ে মাত করেছেন সকল অভিনেতা। কেন বাংলা ছবি দক্ষিণী ঘরানায় হবে? সে পরিচালকের স্বাধীনতা। সঞ্জয় লীলা বনশালী শরৎচন্দ্রের আটপৌরে 'দেবদাস'কে এনে ফেলেছিলেন বিগ বাজেটের হাভেলি সেটে। রবীন্দ্রনাথের 'চোখের বালি' ঋতুপর্ণ ঘোষ বানিয়েছিলেন নিজের চিত্রকল্পে। সেভাবেই 'রঘু ডাকাত' যেন এখানে বাংলার বাহুবলী। এই ছবি রঘু ডাকাতের বায়োপিক নয়। কিন্তু সে বাংলার রঘু, গরিবের রবিনহুড। নীল কর দিতে পারা শোষিত গ্রামবাসীদের কাছে রঘু ডাকাত নয়, সে দেবতা। রঘুকে নিজের জীবন বাজি রেখে পুজো করে তারা।

দেবের জাকজমকপূর্ণ এন্ট্রি দিয়েই ছবির শুরু। নীলচাষের জমি দখল করা ব্রিট্রিশদের বধ করতেই পর্দায় নিজ গরিমায় আবির্ভাব হয় রঘুর। সঙ্গে ছবির আবহ সঙ্গীতে রঘু রঘু ডাক প্রথমেই উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দেয়। কিন্তু রঘু তো ছিল এক নিরীহ কিশোর। ভাগ্যকে জয় করে সে আজ ডাকাত। রুদ্রপুরের রাজা অহীন্দ্র বর্মনের (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) নির্মম অত্যাচারে প্রাণ যায় রঘুর বাবার। মা আগেই মারা গিয়েছে। অহীন্দ্র বর্মণের হাত থেকে পালিয়ে ডাকাতের আস্তানায় এসে পড়ে কিশোরটি। তাকে নিজের সন্তানের পরিচয়ে বড় করে তোলে ডাকাত মা (রূপা গঙ্গোপাধ্যায়)। সেই কিশোর হয়ে উঠে রঘু ডাকাত। রঘু নিজেও ছিল নিপীড়িত তাই সে কখনও মহিলাদের অসম্মান করে না, গরীবের দেবতা সে আর ধনীর ধন লুট করে এনে দেয় আর্তদের হাতে। কিন্তু ডাকাত হবার পরও রঘু নিষ্কৃতি পায় না অহীন্দ্র বর্মণের হাত থেকে। দু'জনের লড়াই মিলিয়েই ছবির ক্লাইমেক্স।

এই লড়াইয়ের মাঝেই আসে প্রেম। ত্রিকোণ প্রেম। রঘুর সবথেকে বিশ্বস্ত বন্ধু গুঞ্জা (সোহিনী সরকার)। গুঞ্জার এই প্রেম একতরফা। যাতে আছে শুধুই কষ্ট আর হাহাকার। অন্যদিকে রঘুর চোখ আটকে যায় সৌদামিনীর (ইধিকা পাল)। সৌদামিনীর রঘুর সংসারে চলে আসা যেন গুঞ্জার ভালবাসায় আতঙ্কের বাজ। একদিকে রাজায় রাজায় লড়াই অন্যদিকে ত্রিভূজ ভালবাসার লড়াই।
দক্ষিণী ছবির আদলেই গড়া হয়েছে 'রঘু ডাকাত'-এর দৃশ্যপট থেকে সেট। কিন্তু নকল একেবারেই বলা যায় না। কারণ সকলের দুরন্ত অভিনয়। রঘু দেবের দেহসৌষ্ঠব থেকে ব্যক্তিত্বর থেকে চোখ ফেরানো যায় না। অনেক বেশি পরিণত অভিনয় ও সংযত সংলাপে মন ছুঁয়েছেন। তাঁর জীবনে নতুন পালক যোগ করল 'রঘু ডাকাত'। সকল কাঁটা ধন্য করে পারিজাত ফোটালেন দেব। রঘু দেব অসুর নয়, সততই হয়ে উঠলেন দেবতা। যার জন্য জমিদার বাড়ির মহিলারাও সোনার গয়না খুলে দেয়।

যদিও ছবির প্রচারে মুখ্য ছিলেন দেব ও ইধিকা পাল। কিন্তু মন কেড়ে নিলেন গুঞ্জা চরিত্রে সোহিনী সরকার। যে স্বপ্ন দেখে বন্ধু রঘু তাঁর প্রেমিক হয়ে উঠবে, রঘুর আলিঙ্গনে থাকবে সেই। কিন্তু রঘু কোনওদিনই ভালবাসে না। বুক ভরা হাহাকার উঠে আসে সোহিনীর অভিব্যক্তিতে। তাঁকে একমাত্র বোঝে রঘুর মা রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। রূপা বলেন 'যে থাকবার সে থাকবে, যে যাবার সে যাবে!' অন্যদিকে ইধিকা পাল অভিনয়ের থেকেও রূপ দেখিয়েছেন বেশি। দেবের সঙ্গে তাঁকে মানিয়েছে ভালই, তবে আর একটু সংলাপ বলায় পরিণত ভাবের দরকার ছিল। যখন সব নায়িকাই দেবের ছবি করলে দেবের বাহুলগ্না হয়েই থেকে যান পুতুলের মতো সেখানে সোহিনী সরকার নিজ অভিনয়ে মাত করেছেন। ফর্মুলা মেনেই পরিচালক তৃতীয় ব্যক্তি গুঞ্জাকে মেরে ফেলেন চিত্রনাট্যে। সেখানেও গুঞ্জার সংলাপ রঘুকে 'তোর কোলে মরতে পারলাম এই অনেক। একবার মিথ্যে হলেও বল না ভালবাসিস।'
ঠিক যেন
'কাঁদিছে রজনী তোমার লাগিয়া, সজনী তোমার জাগিয়া।
কোন অভিমানে হে নিঠুর নাথ, এখনও তোমারে ত্যাগিয়া?
এ জীবন-ভার হয়েছে অবহ, সঁপিব তোমার হাতে।'

রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বহুদিন পর আবার পর্দায় ফিরলেন দেবের অনুরোধে। রূপার অভিনয়ের ধার দুর্দান্ত। দ্রৌপদী থেকে ডাকাত মা, রূপা তেজে দর্পে অতুলনীয়। পর্দায় যতক্ষণ রূপা থেকেছেন, নিজের জাত বুঝিয়ে দিয়েছেন। মা-ছেলের অভিনয়ে দেব-রূপা এতটাই বাস্তব, যাতে কোনও রাজনীতির রং লাগতে দেননি দু'জনে।
অহীন্দ্র রূপে অনির্বাণ ভট্টাচার্য অনেকটাই দক্ষিণী ভিলেনের মতো সাজগোজে। নীলের বাথটাবে শুয়ে 'এ দেশের অস্থিমজ্জায় শুধু নীল বইবে' অমন অভিনয়ে তাক লাগালেন তিনিই পারেন। বিশেষ ভাবে নজর কাড়লেন ওম সাহানি। তাঁর কণ্ঠ গম্ভীর ডাবিংয়ে আরও আকর্ষণীয়। দেবের পাশেও ওম ম্লান হননি। প্রথমে মুনিবেশ ও তারপর কালো পোশাকের ভিলেন বেশে কী অসম্ভব আবেদন ওমের। খলনায়ক হলেও তাঁর প্রেমে পড়া যায়। ব্রিট্রিশ সাহেবের ভূমিকায় অ্যালেক্স যথাযথ। সুদীপ ধাড়া, মিঠুন গুপ্ত, দুর্বর শর্মা নজর কাড়লেন। প্রতিটি রোমাঞ্চর চরিত্রকে রহস্যময় করে তুলেছে সোমনাথ কুণ্ডুর রূপটান।

এই ছবিকে প্রতিটি অ্যাকশন দৃশ্যে তুখোড় করে তুলেছে সৌমিক হালদারের সিনেমাটোগ্রাফি।
'রঘু ডাকাত' মাস ছবি। সেভাবেই শ্রীকান্ত মেহতা ও মহেন্দ্র সোনি ছবিটি বানিয়েছেন। যা শিল্প নির্দেশনায় স্পষ্ট। যা বাংলা ছবিতে বিরল কাজ।
কিছুটা অবিশ্বাস্য মনে হতেই পারে ডাকাত মায়ের মৃত্যুর পর যাযাবর রঘু আর তার দলবল আর এক জায়গায় গিয়ে কী ভাবে এত বড় কালী মন্দির আর থাকার আস্তানা বানিয়ে ফেলে! ছবির কিছু চিত্রনাট্যের দুর্বলতা বাঁচিয়ে দেয় রথীজিৎ ভট্টাচার্যর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। রঘু ডাকাতের ডাকাতির আরও কিছু ঘটনা রাখা যেত প্রেমের বাইরে। যা আরও পিরিয়ড ড্রামা করত ছবিটিকে।
এন্টারটেনমেন্ট ছবি তো বটেই। তবু এরমাঝেই আছে মন খারাপের সুর, ভালবাসা না পাবার ব্যথা। হিরোকে সেলিব্রেট করা হলেও জুনিয়র আর্টিস্ট থেকে তারকা চরিত্র সবাইকেই জায়গা দেওয়া হয়েছে।
দেব রঘুকে দেখে শেষে বলতেই হয়
'ডাকাত ডাকাত হলে আপদ, বিদ্রোহী হলে বিপদ
ডাকাতকে লোকে ভয় পায়, বিদ্রোহীকে পুজো করে'।