'ফেলুদা' কিংবা 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' ছবিতে সত্যজিৎ রায় হিরোদের প্রেম, নারীসঙ্গ খুব সন্তর্পণে এড়িয়ে গিয়েছেন। অনীক (Anik Dutta) প্রেম-যৌনতার মিশেলে গোয়েন্দা গল্পের ছক ভাঙলেন।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 September 2025 16:10
ছবি: যত কাণ্ড কলকাতাতেই (Joto Kando Kolkatatei)
কাহিনি ও পরিচালনা: অনীক দত্ত (Anik Dutta)
প্রযোজনা: ফ্রেন্ডস কমিউনিকেশন
চরিত্র চিত্রণে: আবীর চট্টোপাধ্যায়, কাজী নওশাবা আহমেদ, রোজা পারমিতা দে , ঋক চট্টোপাধ্যায়, অপরাজিতা ঘোষ দাস
সংগীত: দেবজ্যোতি মিশ্র
দ্য ওয়াল রেটিং: ৮/১০
'যত কাণ্ড কলকাতাতেই' (Joto Kando Kolkatatei) নামটা শুনলেই বারবার মনে পড়ে যায় 'যত কাণ্ড কাঠমান্ডু'তে সত্যজিৎ কাহিনির নামটা। মনে হতেই পারে 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই' কী সত্যজিৎ রায়ের লেখা? কবে লিখলেন? না, মানিকবাবু লেখেননি এই গল্প। সত্যজিৎ তাঁর ফেলুদা-তোপসের প্রেম দেখাবেন তাই কখনও হয়! অনীক দত্তের (Anik Dutta) কাহিনি, চিত্রনাট্য, পরিচালনায় 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই'। ফেলুদা এখানে নেই। তোপসেই এখানে গোয়েন্দা।
তোপসে বড় হয়ে গিয়েছে, সে প্রেম যৌনতাতেও রয়েছে। এখানেই অনীকের ছবি আধুনিক। ভেঙে ফেলে বাঙালির গোয়েন্দার অবিবাহিত বা ভার্জিন থাকার সব মিথ। বরং অনেক বেশি শরীরী নায়কোচিত এই তোপসে। সে আর প্রায় নির্বাক নয়। ফেলুদাকে সে সঙ্গে নেয় না, বাংলাদেশ থেকে আগত এক নারীর সহযোদ্ধা হয়ে ওঠে গোয়েন্দা তোপসে। আর সেই পদ্মাপারের প্রেমেই বাঁধা পড়ে তোপসে।
'ফেলুদা' কিংবা 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' ছবিতে সত্যজিৎ রায় হিরোদের প্রেম, যৌনতা খুব সন্তর্পণে এড়িয়ে গিয়েছেন। কিশোর কাহিনিতে তিনি নায়কদের চিরকাল রেখেছেন নারীবর্জিত। তাঁর ফেলুদা আর তোপসের নারীসঙ্গ নেই। 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' ছবির একদম শেষে গুপী-বাঘার স্ত্রী মণিমালা-মুক্তামালাকে দুটো ট্রফির মতো এনেই ছবি শেষ করে দেন সত্যজিৎ। কোনও ভাবেই রোম্যান্সে নিয়ে যাননি কাহিনিকে সত্যজিৎ রায়। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ব্যোমকেশ' বিবাহিত হলেও সে বড় বেশি ঘরোয়া। সেখানে রোম্যান্সের থেকে দাম্পত্য বেশি। অনীক প্রেম-যৌনতার মিশেলে গোয়েন্দা গল্প করে ছক ভাঙলেন এখানেই। তবে অনীকের এই ছবির মুখ্য অভিনেতা কিন্তু তোপসে নন। গল্পের নায়িকা শাবা, যে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় আসে নিজের পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে, সেই পদ্মাপারের কন্যাকে ধরেই এগোয় গল্প।
গোয়েন্দা গল্প বলে দিয়ে ছবি দেখার মজা নষ্ট করতে চাই না। বাংলাদেশ থেকে আসা এক তরুণী শাবা কলকাতার এক বনেদি বাড়িতে এসে হাজির হয়। এই অপরিচিত মুসলিম মেয়ের সঙ্গে কলকাতার হিন্দু বনেদি বাড়ির কী সম্পর্ক?
ফেলুদাকে অনীক হাজির করেননি তাঁর ছবিতে। তোপসে এই ছবিতে নায়ক। তবে নামেই সে তোপসে। ফেলুদার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। ফেলুদা পড়া তরুণ তোপসে। যে আবার তোপসে ফ্রাই খেতে ভালবাসে। এমন ছোট ছোট কমেডি সিকোয়েন্স ভাল লাগে। চরিত্রটি শাবাকে সাহায্য করতেই এগিয়ে আসে ছবিতে। 'গোরাদের গোরস্থানের নিকট অবস্থান/ ফিরিঙ্গি দেবালয়ে/ সন্ত যোহান/ থমাস-নাম অঙ্কিত... চতুষ্কোনে বাঁধা/ ইষ্টিনামে পত্র আছে, সাঙ্গ হল ধাঁধা'। ফেলুদার গল্পের ছকেই ধাঁধার সমাধান করতে করতে পরতে পরতে এগোতে থাকে গল্প।
শাবার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কাজী নওশাবা আহমেদ। বাংলাদেশের অভিনেত্রীই যথাযথ চরিত্র অনুযায়ী। যদিও নওশাবা ডাবিং করেননি এই ছবিতে। রোজা পারমিতা দে ডাবিং করেছেন। পারমিতার মায়ের বাড়ি ঢাকায়, তাই বাংলাদেশি টান ভাল আনতে পেরেছেন। আবার পারমিতা এই ছবিতে অভিনয়ও করেছেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের ভূমিকায়। সেখানে কোনও বাঙাল ভাষার টান নেই। এক অভিনেত্রীর দুই ভূমিকা ছবিতে যা বেশ বিরল।
আবীর চট্টোপাধ্যায়ের (Abir Chatterjee) আবির্ভাব নায়কোচিত। গোয়েন্দা মানেই তাঁর কোনও আবেদন থাকবে না, এতদিন যা হয়ে এসেছে সাহিত্যে, তার মিথ ভাঙলেন অনীক। কার্শিয়ংয়ের পাহাড়ি রোদে আবীর যখন রোদ চশমায় সামনে আসেন তখন দর্শকরা সুদর্শন পৌরুষে মুগ্ধ হন। দুর্ঘটনার আতঙ্কে তোপসের আলিঙ্গনে শাবাকে ফেললেন অনীক, তবে নিবিড় আলিঙ্গনে রাখলেন না কেন? সুযোগ পেয়েও লক্ষণরেখা টেনে রাখলেন তিনি। কার্শিয়াং-এ একান্তে হোটেলেও দু'জনে বন্ধুত্বেই রইলেন। সত্যজিৎ-সন্দীপ-সৃজিতের ছবির তোপসে খুব বেশি সংলাপ কোনওদিনই পাননি। অনীক তোপসে-রূপী আবীরকে স্বপ্নের পুরুষ করে তুলেছেন এবং শাবা-তোপসের বিয়ের সংজ্ঞা না টেনে তোপসেকে আরও আইডল প্রেমিক করে রাখলেন অনীক।
আরও এক নবীন নায়ক নজর কাড়লেন ঋক চট্টোপাধ্যায়। অভিনেত্রী দেবযানী চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র এই ছবিতে যেভাবে ছাপ রাখলেন তা দাগ কেটে যায়। বনেদি বাড়ির বিলেত ফেরত যুবক বোহেমিয়ান জীবনের ফাঁদে পড়ে এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান রাতপরীকে বিয়ে করে বসে। যে মেয়ে বনেদি বাড়িতে 'নষ্ট মেয়ে' ছাড়া কিছু নয়। এই চরিত্রে রোজা পারমিতা। যখন ঋক বসতবাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বিদেশিনী মেয়ের টানে তখন দাপুটে উকিল বাবার সঙ্গে ছেলের সংলাপে 'দেয়া-নেয়া'র কমল মিত্র-উত্তমকুমারকে মনে করিয়ে অনীক বেশ জমিয়ে দিলেন। ঋক চট্টোপাধ্যায়ের স্মার্ট অভিনয় ভবিষ্যতের বুদ্ধিদীপ্ত নায়ককে আমাদের উপহার দিতে পারে। যদি তাঁকে ঠিক মতো ব্যবহার করে ইন্ডাস্ট্রি।
মধ্যবিত্ত দম্পতির চরিত্রে দুলাল লাহিড়ি ও মিঠু চক্রবর্তীকে একদম বাস্তব চরিত্র লাগল। তাঁদের পুত্রবধূর ভূমিকায় অপরাজিতা ঘোষ দাশের অভিনয় বড় কাছের জনকে মনে করায়। এক বিশেষ ভাবে সক্ষম কিশোরের মায়ের চরিত্রে অপরাজিতা কী স্বাভাবিক সহজাত অভিনয়টাই না করলেন। তাঁর ছেলের চরিত্রের কিশোরটিও চোখ জুড়োনো। সত্যি স্পেশাল চাইল্ড হলেও প্রাণবন্ত। সৌম্য সেনগুপ্ত ও রজত গঙ্গোপাধ্যায়ের নিপুণ অভিনয়।

তবে গল্পের ক্লাইম্যাক্স ও শেষ আর একটু জমতে পারত। যা উৎসব মুখোপাধ্যায়ের টানটান চিত্রনাট্যকে কিছুটা হলেও শিথিল করল।
'যত কাণ্ড কলকাতাতেই' ছবির শীর্ষসঙ্গীত সিনেমাহল থেকে বেরোনোর পরেও কানে বাজতে থাকে। রঙ্গন চক্রবর্তীর কথায় দেবজ্যোতি মিশ্রর সুরে উপল সেনগুপ্ত ও অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, 'চন্দ্রবিন্দু' জুটির এই গানের ছন্দ ও গায়কী দুরন্ত।
ট্রিঙ্কাসের রাতপার্টি থেকে কার্শিয়াংয়ের চার্চ, ইন্দ্রনাথ মারিকের সিনেমাটোগ্রাফিতে মন কাড়া। রূপটানে মহঃ ইউনুস ও কেশসজ্জায় হেমা মুন্সি ছয়ের দশকের লুক থেকে বর্তমানের লুক নিপুণ ভাবে করেছেন ছবি জুড়ে। ততখানি পরিপূর্ণ সুচিস্মিতা দাশগুপ্তর পোশাক পরিকল্পনা।
পুজোর সময় অনীকের এই মিথ ভাঙা গোয়েন্দা গল্প ১৮ থেকে ৮০-র মন জয় করে নেবে। অনীক দত্ত যদিও বলছেন 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই' তাঁর শেষ ছবি। কিন্তু এমন বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালকের আরও ছবি যেন আমরা পাই।