অর্জুন শেষ ২২ টা দিন আনন্দীর সঙ্গে থাকতে চায়। ২২ টা দিনের সহবাসে যদি ২২ বছরের অধরা সংসারের স্বপ্ন মেটে!

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 July 2025 17:03
ছবি:গুডবাই মাউন্টেন
পরিচালক: ইন্দ্রাশিস আচার্য
অভিনয়ে: ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত
দ্য ওয়াল রেটিং: ৮.৫/১০
'নয়ন ছেড়ে গেলে চলে, এলে সকল-মাঝে--
তোমায় আমি হারাই যদি তুমি হারাও না যে ॥
ফুরায় যবে মিলনরাতি তবু চির সাথের সাথি
ফুরায় না তো তোমায় পাওয়া, এসো স্বপনসাজে ॥'

'যা চলে যায়, সে কি ফিরে আসে?
ফিরে এলেও কি সে আগের মতো থাকে?'
এই কথার রেশ ধরেই এগিয়েছে ইন্দ্রাশিস আচার্যর 'গুডবাই মাউন্টেন' ছবির কাহিনি। ২২ বছর পর প্রেম যদি মুখোমুখি দাঁড়ায় তখন কেমন লাগে? স্মৃতির ধুলো সরিয়ে প্রেম কী আবার জেগে উঠবে? শরীর পুড়বে কী আবার প্রাক্তনের স্পর্শে। সেই স্পর্শে কী থাকবে প্রথম ভাল লাগার রেশ? কাটবে কী এত বছরের অভিমান, প্রত্যাখান আর নিরুচ্চার প্রেমের পূর্বরাগ?
'গুডবাই মাউন্টেন' ছবিতে মূল তিনটি চরিত্র। অর্জুন, আনন্দী আর রথিজিৎ। প্রথম যৌবনে অর্জুনের সঙ্গে আনন্দীর প্রেম ছিল। যদিও ছবির শুরুতে মনে হবে আনন্দীর প্রাক্তন স্বামী অর্জুন। যত ছবি এগোতে থাকবে, পরতে পরতে খুলতে থাকবে রহস্যের জট। কেন ভেঙেছিল তাঁদের প্রেম? এখানেও এক সাহসী প্লট এনেছেন পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্য। মূলস্রোতের বাইরে এক অলিখিত তৃতীয় সম্পর্কের কারণেই ভাঙে তাঁদের প্রেম। সেখানেও বেশ চমক লাগে। ২৫ বছর পর অর্জুন মারণ রোগের শিকার। তাঁর সময় আর বেশিদিন নেই। তাই অর্জুন শেষ ২২ টা দিন আনন্দীর সঙ্গে থাকতে চায়। ২২ টা দিনের সহবাসে যদি ২২ বছরের অধরা সংসারের স্বপ্ন মেটে! আনন্দী এক পুরনো বন্ধুর বাঙলোতে থাকবে বলে ছুটে আসে কেরালায়। শেষ সময়ের সহবাসে শরীর না মন কোনটা এগিয়ে থাকে? এমন সাহসী প্লট কিন্তু খুব সম্ভ্রমের সঙ্গে কবিতার মতো পর্দায় বুনেছেন ইন্দ্রাশিস।
অন্যদিকে এরই মাঝে আনন্দীর বর রথিজিৎ ছবির দ্বিতীয় ভাগে এসে হাজির হয়। যে কোনওদিনই আনন্দীর স্বপ্নের পুরুষ ছিল না। না শরীরে, না মনে। তবু রথিজিৎ স্বামীর অধিকারে আনন্দীর শরীর খাদকের মতো ব্যবহার করে! তিনটি চরিত্র যখন এক পঙক্তিতে এসে দাঁড়ায় তখন বারবার মনে করিয়ে দেয় সত্যজিৎ রায়ের 'কাপুরুষ' ছবির সৌমিত্র,মাধবী ও হারাধনকে। যদিও অর্জুন এখানে কাপুরুষ নয়। তাঁকে ভুল বুঝে আনন্দী ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কী হয় গল্পের শেষে? আনন্দীর স্বামীর কী প্রতিক্রিয়া হয় অর্জুনের শোবার ঘরে আনন্দীর নানা ফেলে রাখা চিহ্ন পেয়ে?
ইন্দ্রাশিস আচার্য এক গুণী পরিচালক হয়েও তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর কাজের কদর পাননি। যদিও তাঁর ছবি সবার ছবি নয়। তাঁর আলাদা দর্শক আছেই। তাঁদের জন্যই ছবি বানান তিনি। কিন্তু দর্শকের কাছে ছবি পৌঁছে দেবার জন্য দরকার ছবিগুলিকে মূলস্ত্রোতে আনার। সেখানেই বঞ্চিত হন পরিচালক। তাই ছবি করা ছেড়ে ইন্দ্রাশিস আবার ফিরে যাচ্ছেন তাঁর পেশাদার কর্মজগতে। কিন্তু 'গুডবাই মাউন্টেন' বুঝিয়ে দিল ইন্দ্রাশিস আচার্য ফুরিয়ে যাবার পরিচালক হন। বরং তাঁর ছবি বুঝতে গেলে মনটাকে সেই স্তরে সেই মেধায় নিয়ে যেতে হয়। যদিও ইন্দ্রাশিসের আগের ছবিগুলির থেকে এই ছবি নিদেনপক্ষে সহজ। ছবির শেষের মন কেমন করা সকল দর্শককে স্পর্শ করবে। একটাই কথা বলার, শত বাধা এলেও ছবি করা ছাড়বেন না। আপনাদের মতো পরিচালকদের খুব দরকার উৎকৃষ্ট মানের বাংলা ছবির হাল ধরে রাখতে। যেভাবে নিজের লেখা কাহিনি ও চিত্রনাট্যকে জীবন্ত করতে তিনি কেরলের ওয়েনাড়ে ২০ দিন শুটিং করেছেন তা ছবিটিকে এক অন্য মায়াবী উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ২০২৩ সালের এই শুটিং স্পট প্রকৃতির কোপে অনেকটাই আজ বিলীন হয়ে গিয়েছে। এই ছবিতে যা ধরা রইল। প্রকৃতির দৃশ্যগুলি আরও কবিতার মতো ধরা দিয়েছে পর্দায় শান্তনু দের সিনেমাটোগ্রাফিতে।

অভিনয়ে ছবি জুড়ে রয়েছেন দু'জন অর্জুন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত আর আনন্দী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ইন্দ্রনীল ঠিক পাহাড়ের মতোই। যার জীবনে ভালবাসা এলেও , প্রেম এলেও সে রয়ে গিয়েছে একলা। বিবাহসূত্রে আবদ্ধ না হয়ে একলা পথিক। জীবনও তাঁর থেকে ছুটি চায়। ঋতুপর্ণা যখন তাঁর কাছে আসেন মনে হয় পাহাড়কে যেন শেষ বিদায় জানাচ্ছেন গল্পের নায়িকা। সেই মুহূর্তে নায়িকাকে স্বার্থপর মনে হলেও হতে পারে। পরিণত চরিত্রে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত বেশ সপ্রতিভ অভিনয় করেছেন। তাঁর সংলাপ ডেলিভারিতেও রয়েছে সঠিক বাংলা উচ্চারণ।
ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এই ছবির প্রাণভ্রমরা। যাকে ঘিরে গল্প। ঋতুপর্ণা যে ভাল অভিনয় করবেন এ তো জানা কথাই। কিন্তু তাঁর স্থিতধী অভিনয় আর স্নিগ্ধ লুক নতুন করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বাড়াল। একদম এক অন্য ঋতুপর্ণাকে পেলাম আমরা। এখানেই পরিচালক ইন্দ্রাশিস ও মেকআপ আর্টিস্টদের কৃতিত্ব। ঋতুপর্ণা নিজেকে জলের মতো সহজ রেখেছেন।

আর যার কথা বললেই নয়, যিনি ছবির সবথেকে বড় চমক ঋতুপর্ণার বর রথিজিতের চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্যর অভিনয়। সাংবাদিক থেকে অভিনেতা হিসেবে তিনি সর্বাধিক ছাপ রাখলেন এই ছবিতে। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর সঙ্গে অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অনির্বাণ মিসম্যাচ হলেও চিত্রনাট্যে তাঁর এই চরিত্রই ডিমান্ড করে। এছাড়াও অনন্যা সেনগুপ্তর চরিত্রটি নজর কাড়ে।
'গুডবাই মাউন্টেন' ছবিতে আমরা প্রথম গীতিকার ইন্দ্রাশিস আচার্যকেও পেলাম। তাঁর কথায় 'কালা মধু' গান গেয়েছেন শাওনি মজুমদার। আর পেলাম এক নতুন গায়িকাকে বাংলা ছবিতে পৃথা চ্যাটার্জীকে। বেশ লাগল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর লিপে অন্যধারার পৃথার কণ্ঠ। তেমন তিনি ভাল গেয়েছেন 'অধরা মাধুরী' রবি গানটি। প্রতিটি গানে কানের আরাম রনজয় ভট্টাচার্যর সুর।
তবে এই ছবির বাঁধুনি আর একটু ভাল হতে পারত যদি আরও তীক্ষ্ণ সংলাপ থাকত। সেখানেই একটু দুর্বল লাগল ছবিটি। কিন্তু ছবি জুড়ে মন কেমন করা দর্শকের মন স্পর্শ করবেই। ছবির শেষে অশ্রুসজল করে দেয়। একা মানুষদের বড় বেশি নাড়িয়ে দেবে ',গুডবাই মাউন্টেন'। দিনের শেষে যদিও আমরা সবাই একা।