বেলা দে নামটা প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে ধুলো পড়ে গিয়েছিল। আকাশবাণীর হারিয়ে যাওয়া মুখকে এই ছবির প্রাণপ্রতিমা করে তুললেন অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 29 August 2025 17:11
ছবি: বেলা
নামভূমিকায়: ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত
চরিত্র চিত্রণে: ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়, বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়, সৌরভ চক্রবর্তী
কাহিনি চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনা: অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়
দ্য ওয়াল রেটিং: ৮/১০
'ওলো সই, ওলো সই,
আমার ইচ্ছা করে তোদের মতন মনের কথা কই।
ছড়িয়ে দিয়ে পা দুখানি কোণে বসে কানাকানি,
কভু হেসে কভু কেঁদে চেয়ে বসে রই।'
ছয়ের দশকে গেরস্ত ঘরের মেয়ে-বৌয়েরা দুপুরের রাঁধাবাড়া সেরে শীতলপাটি বিছিয়ে শুনতে বসত রেডিওতে 'মহিলা মহল'। যা ছিল তখনকার মহিলাদের জন্য একমাত্র খোলা জানলা। মেয়েদের মন পড়তে পারত এই 'মহিলা মহল'। আর সেই 'মহিলা মহল'-এর মধ্যমণি ছিলেন যিনি, তাঁর নাম বেলা দে। ইন্দিরা দির থেকে বেলাদির হাতে ওঠে মহিলা মহলের পতাকা। পরিচালক অনিলাভ চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রথম ছবি 'বেলা'তে কতখানি সফল হলেন?

বেলা দে নামটা প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে ধুলো পড়ে গিয়েছিল। আকাশবাণীর হারিয়ে যাওয়া মুখকে এই ছবির প্রাণপ্রতিমা করে তুললেন অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়। রেডিওর একসময়ের জনপ্রিয় নাম বেলা দে। জন্মসূত্রে নাম বেলা ঘোষ (কিশোরী বেলার চরিত্রে শ্রী ভট্টাচার্য)। স্কুলে পড়াকালীন বেলার বিয়ের সম্বন্ধ চলে আসে। যে সে শ্বশুরবাড়ি নয়। একেবারে রায়বাহাদুরের ডাক্তার ছেলে। মায়ের আপত্তি থাকলেও এমন বাড়ি বয়ে আসা সোনার টুকরো পাত্র বাবা হাতছাড়া করতে চায় না। তখনও ম্যাট্রিক দেয়নি বেলা। বিয়ে হয়ে গেল রায়বাহাদুর হেমচন্দ্রর ডাক্তার ছেলে হীরেন দের সঙ্গে। বেলা ঘোষ হল বেলা দে। বিয়ের পর বর বেলার আঁচলে বাঁধা থাকলেও কদিন পর তাঁর বিলেতে FRCS পড়তে যাবার সময় এল। স্ত্রী বেলাকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য বাপের বাড়ি রেখে হীরেন চলে গেল লন্ডনে। সেকালে এমন তো বাংলার কত মেয়ের জীবনে ঘটেছে বরের সঙ্গে চোখের আড়াল মনের আড়াল তৈরি করেছে। দিন যায় রাত যায় বেলা বিলেতে চিঠি পাঠালেও কিন্তু সেই মনের মানুষের আর চিঠি আসে না। হাতের শাঁখা পলা দেখে বেলা ভাবতে থাকে নিজে এই শিকল পরলেও বর তো কাছে রইল না। বহু অপেক্ষার পর একদিন এল হীরেনের চিঠি। নেচে উঠল বেলার মন কিন্তু চিঠি খুলতেই আদরের বদলে এল অবহেলার উত্তর 'ঘন ঘন চিঠি লেখার প্রয়োজন নেই। তাতে আমার পড়ার ব্যাঘাত ঘটে'। দুমড়ে-মুচড়ে গেল বেলার মন। এই বিরহ ক্ষণের যন্ত্রণা জুড়োয় অরিজিৎ সিংয়ের গান 'বোবা রাত'।
আর এই দিন গুণতে গুণতেই বিরহের মাঝে বেলা রূপে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর আবির্ভাব। বেলা বিলেতে গিয়ে সবটা নিজে চোখে জানতে চায়। কেন তাঁর প্রতি বরের অসম্মান আর অবহেলা। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে সেই বিপদের মাঝেই নিজের মনের যুদ্ধ নেভাতে বেলা ছুটে যায় লন্ডনে। বেলাকে দেখে স্বামীর কোনও আনন্দ হয় না। বেলার স্বামী হীরেনের চরিত্রে ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়। বেলা জানতে পারে তাকে অন্ধকারে রেখে হীরেন বিয়ে করেছে মার্গারিটাকে। ডাক্তার অধ্যাপক হীরেনের কাছে স্ত্রীর থেকেও জরুরি ছিল ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠা।প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক হাসপাতালের অধিকার সমেত রাজকন্যা মার্গারিটাকে তুলে দেয় হীরেনকে। বরের মেম বউ দেখে বেলার যেন চাবুক পড়ে হৃদয়ে।
'দেখো সখা ভুল করে ভালোবেসো না।
আমি ভালোবাসি বলে কাছে এসো না।
তুমি যাহে সুখী হও তাই করো সখা,
আমি সুখী হব বলে যেন হেসো না।'

যন্ত্রণা থেকে নবজন্ম হয় বেলার। বিলেতের মাটিতে দাঁড়িয়ে বেলা প্রতিজ্ঞা করে সে নিজের স্বীকৃতি নিজেই তৈরি করবে। আর তখনই লন্ডনে বেলার সঙ্গে দেখা হয় বিট্রিশ আর্মি অফিসারের স্ত্রী মিসেস আরভিনের। তিনি বেলাকে মনের জোর দিয়ে বলে 'জীবনটা হেরে যাওয়ার নয়, বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার পরেও ভালবাসা থাকে'। একক ভালবাসা নয়, সারা দেশ তাকে ভালবাসবে একদিন। হীরেনকে সে বুঝিয়ে দেবে সে হেরে যায়নি। মিসেস আরভিনকে 'মাদার' বলে ডাকে বেলা। তার কাছেই বেলার রান্নার হাতখড়ি। শুধু রান্না নয়,'হোম সায়েন্স', সংসার চালানোর বিজ্ঞানের পাঠ বিলেতে নিতে শুরু করে বেলা। এই 'হোম সায়েন্স' হয়ে ওঠে বেলার জনপ্রিয়তার প্রধান চাবিকাঠি। কিন্তু মায়ের শরীর খারাপ জেনে দেশে ফিরতে হয় বেলাকে। তারপর? বাবা কিন্তু মেয়ের পাশে দাঁড়ান। মেয়ের ইচ্ছা রেডিওতে যোগ দেবে। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের হাত ধরে বেলার আকাশবাণীর 'মহিলা মহল' অনুষ্ঠানে প্রবেশ। সেখানেই একে একে ইন্দিরা দেবী, নীলিমা সান্যাল, লীলা মজুমদারদের সঙ্গে বেলা দে হয়ে ওঠেন আকাশবাণীর প্রধান মুখ। বিলেতের মাদারের শেখানো রেসিপি বেলা জুড়ে দেয় আমাদের দৈনন্দিন রান্নায়। কম খরচে উপাদেয় খাবার। আদৌ কী বেলা হীরেনকে বোঝাতে পারে সে হেরে যায়নি?
'বেলা' ছবিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এল যে মেয়েদের রেডিওতে কাজ করাও সে যুগে পতিতাবৃত্তির ন্যায় মনে করা হত। বেলার দাদাদের মুখ পোড়ে বেলার রেডিও চাকরিতে। শ্বশুরবাড়িতে তাঁদের মান থাকে না। অন্যদিকে বেলার শেষ হয়ে যাওয়া শ্বশুরবাড়ির রায়বাহাদুর শ্বশুর চিঠি পাঠায় তাদের বাড়ির বউ যেন রেডিওর চাকরি ছেড়ে দেয়। কিন্তু সব ছিছিক্কারের ধুলো ঝেড়ে বেলা বুঝিয়ে দেয়
'আপন বিরহ লয়ে আছি আমি ভালো,
কী হবে চির আঁধারে নিমেষের আলো।
আশা ছেড়ে ভেসে যাই, যা হবার হবে তাই,
আমার অদৃষ্ট-স্রোতে তুমি ভেসো না।'

'বেলা' প্রথম ফিচার ফিল্ম হিসেবে অনিলাভ চট্টোপাধ্যায় দুর্দান্ত ছবি বানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর লেখা চিত্রনাট্য আর সংলাপ ছবির বুনোট ধরে রাখে। যখন বেলা বলে 'দে বাড়ির বৌ আর ঘোষ বাড়ির মেয়ে হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারি, কিন্তু আমি যে হারিয়ে যাব।নাম,যশ,প্রতিপত্তির বাইরে আর একটা পরিচয় থাকে, স্বীকৃতি আর আত্মসম্মান।' অনিলাভর কলমের ধারে লোকমুখে এই ছবি মানুষ দেখবে। পিরিয়ড ড্রামা এবং এতগুলি ঐতিহাসিক নস্টালজিক চরিত্রকে বাস্তবে নিখুঁত ভাবে তুলে ধরেন অনিলাভ।
ছবির প্রাণপ্রতিমা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। তরুণ মজুমদারের 'আলো'র পর এমন ঋতুপর্ণাকে আবার পেলাম। স্নিগ্ধ শান্ত অভিনয়ে যেন সেই বেলা দে। দাগ কেটে গেল ভারতবর্ষ স্বাধীনতার রাতে বেলা ঋতুর সংলাপ 'স্বাধীনতা যদি না পাওয়া যায়, তাহলে তা কেড়ে নিতে হয়!' ঠিক যেমন ভাবে দেশ স্বাধীন হবার মধ্যরাতে দাদাদের বারণ অমান্য করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেলা রেডিও অফিসে এসেছিলেন। বেলা দে বেরিয়েছিলেন বলেই পরের যুগের ছন্দা সেন, চৈতালি দাশগুপ্ত, শাশ্বতী গুহঠাকুরতারা রাতে বেরতে পেরেছিলেন। তবে কিছু জায়গায় ঋতুপর্ণাকে ঋতুপর্ণাই লাগে, বেলা দে নয়। কিছু জায়গায় ঋতুর আধুনিকতা বেলার আটপৌরে ব্যাপার কমিয়ে দেয়। যদিও দ্বিতীয় ভাগ থেকে গল্পের পরতে পরতে ঋতুপর্ণাই বেলা হয়ে উঠতে পেরেছেন।
ঋতুপর্ণার বিপরীতে ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় বলিষ্ঠ অভিনয় করেছেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ধুলো পড়ার মুহূর্তগুলিতে দু'জনেই সেরা। এখানে হীরেন দে ভাস্বর ধূসর চরিত্রে। তবু এমন চরিত্র তাঁর জীবনে নতুন পালক যোগ করল। বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায় নীলিমা সান্যালের চরিত্রে অনবদ্য। তেমনই ভাল লাগল নির্মলদার চরিত্রে সৌরভ চক্রবর্তীকে। অনেকদিন পর বেলার বাবার চরিত্রকে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীকে ফিরে পেলাম। মা ভদ্রা বসু অতুলনীয়। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র রূপে দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত অনবদ্য। ভাল লাগল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর চরিত্রে স্বর্ণযুগের অভিনেত্রী রোমি কাবেরীকে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর গার্স্টিন প্লেস আপিসে ভূতে পাওয়া লেখিকা নীলা দত্ত চরিত্রে মানসী সিনহার কমিক টাইমিং দারুণ। বেলার দুই দাদা পদ্মনাভ ও দেবদূত যথাযথ। দুই বৌদির রোলে বেশ রাজন্যা ও বুলবুলি। বিশেষত বেলা যখন বাপেরবাড়ি ছাড়বে জানায় তখন একমাত্র বৌদি বুলবুলি ননদের পাশে দাঁড়ায়। সবথেকে নজর কাড়ল বেলার তরুণীবেলায় শ্রী ভট্টাচার্যর অভিনয়। ততটাই সুন্দর তরুণ হীরেন আরিউন ঘোষ।
ছবিতে তিনটি গানে অসাধারণ সংগীত পরিচালনা করেছেন রণজয় ভট্টাচার্য।
রণজয়ের সুরে তমোঘ্ন চ্যাটার্জীর কথায় 'বোবা রাত' গানটি ছবির প্রাণ। সোমলতার কণ্ঠে 'নিজেকে বেসেছি বড় ভাল' মনের জোর বাড়ায়। ঈকশিতা মুখোপাধ্যায়ের গানটিও বেশ নতুন। পিরিয়ড ছবিতে সরাসরি রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহার করেননি রণজয় ও অনিলাভ। কিন্তু ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যগুলিতে 'সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান,সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মাণ' আবহ অনির্বচনীয়। দুর্দান্ত সঙ্গীত আয়োজনে অরিজিৎ সিং।
ভাল লাগে সাবর্ণী দাসের ঋতুপর্ণার পোশাক। বিশেষত প্রবীণ বেলার পোশাকে। তবে বিলেতে ঋতুপর্ণার প্রসাধন বেশ চড়া, যা বেলা দে করতেন না। কলকাতা লন্ডন মিলিয়ে চোখ জুড়োনো সিনেমাটোগ্রাফি। রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ খবরে রেডিও চালাতেই গান শুরু হয়ে যাওয়া একটু কৃত্রিম লাগে। তখনকার দিনে একটু সময় নিয়ে রেডিও চালু হত।
আগেকার মহিলারা ঘরে থাকা সরঞ্জামেই কী দারুণ সব রান্না আবিষ্কার করতেন যাঁর পুরোধা বেলাদি। পালং শাক পেয়াঁজ-রসুন দিয়ে ভেজে তার ওপর অমলেট কুঁচিয়ে নারকেল কোড়া দিয়ে অমৃত। শুধু রান্না নয়, বেলার কথায় গর্ভনিরোধ টিপস,মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়া সমাজের প্রান্তিক স্তরে সচেতনতা বাড়ায়। অনিলাভর এই ছবি পাটভাঙা ধুতি-শাড়ি থেকে জিনস-হট প্যান্ট সবার মন ছুঁয়ে যাবে। ঋতুপর্ণা বেলা দে কে নতুন করে জীবন্ত করলেন এযুগে। এখনও কান থেকে সরছে না প্রাক্তন স্বামীকে নিজের লেখা রান্নার বই উপহার দিয়ে বেলার সংলাপ ' এতদিন আমি আপনার দে পদবীর ভার বহন করেছি, এবার আপনি আমার সই করা বইটার ভার বয়ে বিলেতে নিয়ে যান'।