যৌনতার প্রকাশ ছিল স্বপ্নের মধ্যে। ঘোড়ার গায়ের সাদা রং আর বিদেশিনীর উজ্জ্বল ত্বকের রং মিলে খুব সেনসুয়াস লাগছিল।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 18 September 2025 14:06
অপর্ণা সেন (Aparna Sen) তাঁর ছবিতে একাকীত্বর গল্প বলেছেন বারবার। '৩৬ চৌরঙ্গী লেন' থেকে 'পারমিতার একদিন' প্রায় সব ছবিতেই একাকীত্বকে নানা ভাবে দেখিয়েছেন পরিচালক (Director) অপর্ণা। তাঁর সবথেকে স্বতন্ত্র ছবি 'সতী'। অষ্টাদশ শতাব্দীতে কৌলিন্য প্রথার কুফল থেকে সতীদাহ প্রথার অভিশাপ, সেই সময়ের ভয়ংকর সমাজ ব্যবস্থা ও নারীদের অস্তিত্ব সংকটের জান্তব কান্না উঠে এসেছিল 'সতী' (Sati) ছবিতে।
কী ভাবে পরিচালক অপর্ণা সেনের ভাবনা আসে 'সতী' বাংলা ছবির চিত্রনাট্য লেখার? আজ শাবানা আজমির (Shabana Azmi) জন্মদিনে (Birthday) 'সতী' ছবি তৈরি হবার গল্প।
অপর্ণা সেনের থেকেই শোনা সেই স্বপ্নের গল্প। তিনি বলেছিলেন ' 'সতী' ছবির ভাবনা এসেছিল একটা চিত্রকল্প হয়ে। ঘুমের মধ্যে একটা মায়াময় স্বপ্ন দেখেছিলাম। একটা সাদা ঘোড়া, তার অদ্ভুত সুন্দর কেশর, তার গায়ে মুখ ঠেকিয়ে বসে আছে সোনালী চুলের এক শ্বেতাঙ্গিনী। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যৌনতার প্রকাশ ছিল স্বপ্নের মধ্যে। ঘোড়ার গায়ের সাদা রং আর বিদেশিনীর উজ্জ্বল ত্বকের রং মিলে খুব সেনসুয়াস লাগছিল। বিদেশিনী ছিল মূক। দু'জন মূক জীবের মধ্যে এক আদান-প্রদানের সৃষ্টি হচ্ছিল। সকালে উঠেই কিছুতেই মন থেকে স্বপ্নটাকে ভুলতে পারছিলাম না। বারবার তাড়া করে বেড়াচ্ছিল স্বপ্নটা।'
আর এই স্বপ্ন থেকেই ছবি করার ভাবনা এল অপর্ণা সেনের। তাঁর মা সুপ্রিয়া দাশগুপ্তকে জিজ্ঞেস করলেন 'এই স্বপ্ন থেকে কী ভাবে ছবি বানানো যায় বলো তো?'

নানারকম প্লট ভাবতে ভাবতে অপর্ণার হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের দেশে একসময় মেয়েদের সঙ্গে গাছের বিয়ে দেওয়া হত। গাছ হত মেয়েটির স্বামী। কোনও মেয়ের বিয়ে না হলে তাঁর শেষ আশ্রয় হত গাছ। অন্যদিক থেকে গাছের সঙ্গে বিয়ে দিলে মেয়েটির বিধবা হবার পরিস্থিতি কম। তাকে অল্প বয়সে সতীদাহর বলি হতে হবে না। অনেক সময় সংসারের বাতিল মেয়েদেরকেও এভাবে গাছের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হত। সেই একটা সূত্র পেলেন অপর্ণা।
তারপর তার থেকে চিত্রনাট্য ক্রমশ গড়ে উঠতে লাগল। শাবানার চরিত্রের নাম ছিল উমা। বোবা মেয়ে। বাংলা ছবিতে শাবানা আজমি। যেহেতু বোবা মেয়ের চরিত্র বাংলায় শাবানার সংলাপ বলার ব্যাপার ছিল না। যদিও বাংলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত খুবই ভাল গাইতে পারেন শাবানা আজমি। অপর্ণার কয়েক বছর আগে রিলিজ 'সোনাটা' ছবিতেই শাবানা বাংলায় রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন। সতীর প্লটে অষ্টাদশ শতাব্দীর নানা প্লট নিয়ে এলেন অপর্ণা। ফলে ছবিটা বিরাট এক ব্যাপ্তি পেয়ে গেল। সতীদাহ প্রথার ভয়ংকর নারকীয় দৃশ্য দিয়েই সতী ছবির শুরু।
কৌলিন্য সমাজের ব্রাহ্মণরা এত বিয়ে করতেন যে নানা জায়গায় করা নিজের বউদের নিজেরাই পরে চিনতে পারতেন না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিভীষিকা রূপ তুলে আনেন অপর্ণা সেন। ততোধিক ভাল অভিনয় করেছিলেন
শাবানা আজমি ছাড়াও 'সতী' ছবিতে অভিনয় করেছিলেন কেতকী দত্ত, অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, শকুন্তলা বড়ুয়া, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়, লাবনী সরকার ও অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সংগীত পরিচালক ছিলেন অপর্ণা সেনের বাবা চিদানন্দ দাশগুপ্ত ও চন্দন রায়চৌধুরী। এন এফ ডি সি প্রযোজনা করে ছবিটি। যদিও প্রযোজক সংস্থার থেকে অনেক অসুবিধে পেতে হয় অপর্ণাকে। ১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় অপর্ণা সেনের 'সতী'। শাবানা আজমির কেরিয়ারে আজও মাইলফলক 'সতী'।