Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

শতবর্ষে গুরু দত্ত, বাস্তবের 'দেবদাস', দুই নারীতে বিভক্ত জীবন নেভে নিরাশা, নেশা আর রহস্যে

সকালে গুরুকে মৃত অবস্থায় পান বন্ধু পরিচালক আব্রার আলভী। গীতা খবর পেয়ে ছুটে যান সজল নয়নে। হাউহাউ করে কাঁদতে থাকা গীতাকে সামলাতে কেউ পারেনি সেদিন। গীতাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন 'সাহেব বিবি গুলাম' ছবির ছোট বৌঠান মীনা কুমারী। 

শতবর্ষে গুরু দত্ত, বাস্তবের 'দেবদাস', দুই নারীতে বিভক্ত জীবন নেভে নিরাশা, নেশা আর রহস্যে

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস

শেষ আপডেট: 9 July 2025 15:15

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়


শতবর্ষ জন্মদিনে কোনও লেজেন্ডের কথা বলতে বসা মানে শুধুই তাঁর প্রশংসা করা নয়। বরং নিরপেক্ষ ভাবে সেই মানুষটির বিচার করা, তাঁর কাজের উৎকর্ষ মূল্যায়ন করা এবং তাঁর কাজের সংরক্ষণ, আসল শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি হওয়া উচিত। আজ ৯ জুলাই, ২০২৫ সারা দেশ জুড়ে যে মানুষটির ১০০ তম জন্মদিন (100 years Birthday) পালন হচ্ছে তিনি কিংবদন্তি গুরু দত্ত (Guru Dutt)। যাঁর কথা এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানে না বললেই চলে। কিন্তু গুরু দত্তের জীবন সফর সিনেমার মতোই বর্ণময়। তেমনই তাঁর বানানো প্রতিটি কালজয়ী ছবি চিরন্তন সম্পদ।

গুরু দত্ত বাঙালি ছিলেন না। কিন্তু তাঁর নামটা শুনলেই বাঙালি মনে হয় আজও। অথচ বাংলা ভাষা আর কলকাতা শহর ছিল তাঁর প্রাণ। বিয়ে করেছিলেন বাঙালি গায়িকাকেই। যিনি তরুণ বয়সেই একাধারে সফল পরিচালক,অভিনেতা ও প্রযোজক হয়ে ওঠেন বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির। তাঁর অভিনীত ও নির্মিত ক্লাসিক ছবিগুলি আজও ফিল্ম শিক্ষার পাঠ্য বই হতে পারে। 

guru dutt cinema

তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল তাঁর পদবি এবং তাঁর স্ত্রী থেকে ছেলেমেয়েরাও সেই নাম তাঁদেরও পদবি হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। ব্যাপারটা বেশ অভাবনীয়।

গুরু দত্তর ছোটবেলায় আসল নাম ছিল বসন্ত কুমার শিবশঙ্কর পাড়ুকোন। কিন্তু ছোটবেলায় এক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তিনি। তাই বাড়ির লোকের মনে হয় বসন্ত কুমার শিবশঙ্কর নাম অশুভ। তাই তাঁর নতুন নামকরণ হয় গুরুদত্ত।অর্থাৎ গুরু প্রদত্ত।গুরুদত্ত এখানে এক কথা। কিন্তু ফিল্ম জগতে এসে গুরু আর দত্ত তিনি আলাদা করে নেন। কৈশোরে গুরু দত্ত কিছুদিন কলকাতায় ছিলেন। তাই তিনি বাংলা পরিস্কার বলতে পারতেন এবং বাঙালি সংস্কৃতিও পছন্দ করতেন। অনেকেই মনে করেন সেহেতু দত্ত যেহেতু বাঙালিদের পদবি হয় সেইভাবেই নিজের নামের অংশকে পদবি করে নেন গুরু দত্ত। 

Guru Dutt And Geeta Dutt's Love Story: Tragic And Untimely Death Of Two  Lovebirds Ends A Love Story


গুরু দত্ত ছিলেন দক্ষিণ ভারতের মানুষ। জন্ম ৯ই জুলাই,১৯২৫। তাঁর বাবা ছিলেন প্রথমে স্কুলের হেডমাস্টার, পরে হন ব্যাঙ্ক কর্মী। মা ছিলেন গৃহবধূ কিন্তু তাঁর কবিতা,ছোট গল্পের লেখার হাত ছিল ভাল। স্বামীর একার রোজগারে সংসার টেনেটুনে চলত তাই তিনি নিজের লেখা বিক্রি করেও স্বাবলম্বী মহিলা ছিলেন। তাঁর যখন ১৬ বছর বয়স তখন গুরুর জন্ম।  গুরু দত্তর তিন ভাই আত্মারাম,দেবীদাস ও বিজয় এবং এক বোন লোলিতা। তবে বাবা মায়ের সম্পর্ক ভাল ছিলনা।গুরু দত্তের মামারা দ্বন্দ্ব বাধাতেন তাঁদের সংসারে।গুরু ছোটবেলা থেকে বারবার বাবা মায়ের ভয়ংকর ঝগড়ার শিকার হয়েছেন। যে কারণে শিশু বয়স সুখের ছিল না তাঁর। তবে মায়ের এক ভাইয়ের সঙ্গে গুরুর ভাল বন্ধুত্ব ছিল। তাঁকে গুরু বলতেন বকুট মামা। তাঁর আসল নাম বালকৃষ্ণ বেনেগল। যিনি সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। তাঁর মুখে সিনেমার গল্প শুনেই গুরুর চলচ্চিত্রের অনুরাগ তৈরী হয়। এই বকুট মামার ছোট ভাইয়ের ছেলে পরবর্তীকালে হন বিখ্যাত পরিচালক শ্যাম বেনেগল। 

গুরু দত্ত কৈশোরে কিছুদিন কলকাতায় পড়াশোনা করেন। কিন্তু বাবার দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে কলকাতায় পড়াশোনা এগোয় না। তবে সেসব ছেড়ে গুরু এসে ভর্তি হন আলমোরাতে উদয় শংকর ডান্স অ্যাকাডেমিতে। পুরুষ হয়ে নাচ শিখে সে যুগে 'পুরুষদের নাচ না শেখার' মিথ ভাঙেন তিনি। যদিও উদয় শংকর ছিলেন পথিকৃৎ। এখানে নাচের মাধ্যমে কাহিনি তুলে ধরার তালিমও হয়ে যায় গুরু দত্তর। কিন্তু ফিল্মে যখন গুরু এলেন অভিনেতা হয়ে,নাচের খুব একটা দৃশ্য তিনি পাননি। শাম্মি কাপুরের মতো ডান্সার হিরো হিসেবে গুরু দত্তকে দেখা যাইনি। বরং উল্টোটাই। গুরু মানে ভার গম্ভীর চরিত্রের নায়ক। 

Guru Dutt: Five unknown facts about Bollywood's iconic director

কিন্তু উদয় শঙ্কর ইন্ডিয়া কালচারাল সেন্টার থেকে গুরুকে বার করে দেওয়া হয় মহিলা ঘটিত কারণে। যা ছিল গুরুর চরিত্রের দোষ। ডান্স অ্যাকাডেমির এক মহিলা নৃত্যশিল্পীকে নিয়ে গুরু পালিয়ে যাবার ছক কষেন। যা জানাজানি হতেই গুরুকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।গুরু কাজ নেন টেলিফোন অপারেটরের। কিন্তু সৃষ্টিশীল গুরুর মন টেকেনা, তিনি তাঁর মামার সাহায্যে প্রভাত ফিল্ম কোম্পানিতে তিন বছরের চুক্তিতে যোগ দেন। এখানেই তাঁর জীবনের বাঁকবদল ঘটে। প্রভাত ফিল্ম কোম্পানিতে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় দেব আনন্দের। জীবনের শেষদিন অবধি গুরুর সঙ্গে দেবের বন্ধুত্ব ছিল। এই ফিল্ম কোম্পানিতে গুরু তৎকালীন পরিচালক অমিয় চক্রবর্তী ও জ্ঞান মুখার্জীর সহকারী হিসেবে কাজ করে পরিচালনার পাঠ শেখেন। প্রভাত ফিল্মের সঙ্গে চুক্তি শেষ হতে দশ মাস কর্মহীন ছিলেন গুরু। তখন তাঁকে দেব আনন্দ তাঁদের নবকেতন ফিল্ম কোম্পানীতে গুরুকে পরিচালক করে আনেন। নবকেতন থেকে মুক্তি পায় গুরু দত্তের কালজয়ী ছবি 'বাজি'। দেব আনন্দ-গীতা বালি জুটির 'বাজি' সুপারহিট করে। এই ছবিতেই গান গাইতে এসছিলেন বিখ্যাত কোকিলকন্ঠী গায়িকা গীতা রায়। গীতা রায়ের কন্ঠে গীতা বালির লিপে সুপার ডুপার হিট হল 'তদবির সে বিগড়ি হুয়ি তকদির’। গীতার গানের মাদকতায় ভেসে গেল সারা দেশ। ঝড় উঠল গুরু দত্তের মনেও।

গীতার প্রেমে পড়লেন গুরু। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গুরু দত্তের সঙ্গে এরই মাঝে আরও দুই মহিলার সম্পর্ক হয়। লোকমতে শোনা যায় যা সহবাসে গড়ায়। কিন্তু সেসব নারীসঙ্গ ফেলে গুরু ছুটে এলেন গীতার বুকে। গীতা রায় ছিলেন ফরিদপুরের জমিদার বংশের মেয়ে। কিন্তু দেশভাগ আর ভাগ্যবিপর্যয়ে কলকাতা তারপর বম্বের এক কামরার ঘরে এসে ওঠেন গীতার পরিবার। খুব ছোট বয়স থেকেই গীতা প্লেব্যাকে নাম করেন।গুরু যখন গীতার প্রেমে পড়ছেন গীতা ততদিনে সুপারস্টার গায়িকা। বরং গুরু নবাগত। গীতা আকৃষ্ট হলেন গুরুর পৌরুষে। গীতার সেই প্রথম প্রেম গুরু দত্ত। গীতার গানের জন্যই গুরুর ছবি রিলিজ হবার আগে থেকেই হিট হয়ে যেত। গুরুর কাছে গীতা ছিলেন তুরুপের তাস।

Guru Dutt: The tragic life of an Indian cinematic genius

তবে দুই পরিবার চায়নি এই বিয়ে হোক। গুরুর পরিবার ছিল গোঁড়া  সারস্বত ব্রাহ্মণ, গীতাকে বিয়ে করলে যা তাঁদের হবে অসবর্ণ বিয়ে। আবার গীতা ছিলেন তাঁর পরিবারে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। গীতার বাড়ির লোক চাইনি গীতাকে বিয়ে দিয়ে টাকার উৎস খোয়াতে। কিন্তু গীতা-গুরু সব বাঁধা অতিক্রম করে সাত পাক ঘুরলেন। সেই বিয়ের সেলিব্রেশন ছিল দেখার মতো। বাঙালি মতে বিয়ে হয়েছিল তাঁদের। গীতা পরেছিলেন লাল বেনারসি আর গুরু শ্বেতশুভ্র ধুতি পাঞ্জাবি, মাথায় টোপর। এই বিয়ের সব দায়িত্ব সামলান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির স্টারেরা। গীতা বালি সাজিয়েছিলেন গীতা দত্তকে। গীতা বালি পরে শাম্মি কাপুরকে বিয়ে করেন। গীতার বিয়েতে লতা মঙ্গেশকর আনন্দে মেতে মুখ ভেচকে এক্সপ্রেশন দেন ফটোগ্রাফার দের। কিশোর কুমার পত্নী রুমা গুহঠাকুরতা সব এয়ো স্ত্রীর কাজ সেরেছিলেন। বলিউডের গ্র্যান্ড বিয়ে ছিল চর্চায়। 

Singer Geeta Dutt Story; Lata Mangeshkar | Guru Dutt Waheeda Rehman Affair  | लता मंगेशकर थीं गीता दत्त की फैन: अफेयर के शक में पति की जासूसी कराई, नशे  में डूबीं, आखिरी

দেব আনন্দের দেখাদেখি গুরু বাড়ি কেনেন পালি হিলের ওপরে। সস্ত্রীক সেখানে উঠে আসেন গুরু। কিন্তু গীতার সে বাড়িতে মন বসল না। এত নিস্তব্ধ জায়গায় গীতার মনে হত কবরখানায় বসে আছেন। গুরু দত্ত বাড়ি কিনেও গীতার মন পাননি। গীতার দমবন্ধ হয়ে আসত এমন জায়গায়। শেষ অবধি দুঃখে গুরু দত্ত পালি হিলের অত বিশাল বাড়ি ভেঙে ফেলেন। পরে গিয়ে উঠেছিলেন হোটেলে। গীতা ভাবেননি তখন গুরু এমন পদক্ষেপ নেবেন।

How Guru Dutt Discovered Waheeda Rehman

গুরু যত বড় পরিচালক যত বড় অভিনেতা চারিত্রিক গুণাবলীতে তত বড় ছিলেন না। গুরু তাঁর ছবিতে দেখাতেন নায়িকা রোজগার করছেন,সংসার পেরিয়ে নারীবাদের কথা শোনাতেন গুরু। অথচ নিজের ঘরে তাঁর চরিত্র ছিল একদম বিপরীত। গীতার বাইরে গান গাওয়া বন্ধ করে দেন গুরু। শুধুমাত্র গুরুর ছবিতেই গীতা গাইবেন এমন শর্ত আরোপ করেন। গীতা বলেন "বছরে তোমার কটা ছবি হবে তাতে গান গেয়ে আমার ক্যারিয়ারের কী হবে?" বিয়ের আগের রূপ আর বিয়ের পরের রূপে বদলে যান গুরু দত্ত।  গুরুকে নায়ক রূপে অভিনয় করান গীতা বালি তাঁর প্রোডাকশনের 'বাজ' ছবিতে। গুরু দত্তের ভরা পৌরুষ নায়ক রূপে হিট করে। কিন্তু গুরু নিজেকে অভিনেতা হিসেবে ভাল মনে করতেন না। তাই নিজের প্রোডাকশনের ছবিতে দিলীপ কুমারকে ভেবেছিলেন। দিলীপ না করায় গুরু নিজে নায়ক রূপে ছবিতে আসেন। 'সিআইডি' ছবিতে ইতিমধ্যে গুরু দক্ষিণ ভারত থেকে খুঁজে আনেন এক নতুন নায়িকা ওয়াহিদা রেহমান। 

এরপর গুরু দত্তর আইকনিক ছবি 'পিয়াসা'। নায়ক গুরু নিজেই। দুই নায়িকা মালা সিনহা আর ওয়াহিদা রেহমান। গুরু তাঁর জীবনে পেলেন নতুন চাঁদ ওয়াহিদা। আর সেই চাঁদ গীতার সংসারে ঘনালো চন্দ্রগ্রহণ।  নারীসঙ্গে দুর্বল গুরু বাঁধা পড়লেন ওয়াহিদার আঁচলে। 'পিয়াসা' ছবিতে গীতার গান কতটা কার লিপে থাকবে এই নিয়ে ওয়াহিদা নির্দেশ দিতেন। কেউ প্রতিবাদ করলে বলতেন গুরুর নির্দেশ। কিন্তু মালা যেহেতু কলকাতার নায়িকা ছিলেন গীতার পক্ষ নিয়েই সবসময় কথা বলতেন। অথচ গীতার গান ছাড়া ওয়াহিদার উপস্থিতি ছিল শূন্য। গুরুর সব সমর্থন ছিল ওয়াহিদার প্রতি। যা মানতে পারেননি স্ত্রী গীতা।

Guru Dutt & Waheeda Rehman


পিয়াসা ছবিতে গীতা দত্তকে দিয়ে কীর্তন হিন্দিতে গাওয়ালেন শচীন দেব বর্মণ। গীতার গান আবহে  ‘আজ সাজন মুঝে অঙ্গ লাগা লে’ আর পর্দায় ওয়াহিদা প্রেমরসে কাতর হয়ে ছুটে আসছেন সিড়ি দিয়ে ছাদে গুরু দত্তকে একবার পাবার জন্য। গুরু পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে সিগারেট। গীতার গানে যেন গুরুর প্রতি প্রেম উপচে পড়ছিল কিন্তু পর্দায় গীতার সেই গান তাঁর ঘর ভাঙছে যে সেই ওয়াহিদার লিপে। 'পিয়াসা' স্থান করে নিল ক্লাসিক ছবির তালিকায়।

 

ওয়াহিদাকে শুধুমাত্র দোষীর ভাগী করা যায়না। কারণ গুরু ভুল নারীসঙ্গে বাস করতেন। বহুগামিতা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ওয়াহিদা তখন নতুন অভিনেত্রী তিনি গুরুর মতো পরিচালক প্রযোজককে তাঁর ক্যারিয়ারে ওঠার সিড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। পরপর গুরুর ছবি সাইন করলেন ওয়াহিদা। 

 অন্যদিকে গীতার সংসারে পরকীয়ার ঘুন ধরল। অনেক ছবিতে গুরু দত্ত প্রযোজক পরিচালক রাজ খোসলা বা আব্রার আলভী। এই আব্রার আলভী ছিলেন 'সাহেব বিবি গুলাম' কালজয়ী ছবির ডিরেক্টর। কিন্তু তাঁর স্বভাব ছিল মন্থরার মতো। গুরুর বন্ধু সেজে গুরু আর গীতা দুজনের কানেই দুজনের নামে বিষ ঢালতেন। গীতাকে বলে বসলেন গুরু এখন ওয়াহিদার সাথে ওখানে আছেন। গীতা একবার ওয়াহিদার নাম ভাড়িয়ে গুরুকে ডেট করেন। গুরু এসে হাজির হলে গীতা এসে গুরুকে তীব্র ভাবে অপমান করেন। 

No photo description available.


গীতার গানের মতোই তাঁর সংসার সংগীতে বাজল বিষাদ সুর 'মেরা সুন্দর সপনা বীত গয়া’ । ওমন যার মিষ্টি গানের গলা সেই গীতার সংসারের মতো গানের ক্যারিয়ারও পুড়ছিল। গীতাকে বাদ দিচ্ছিলেন বাকি মিউজিক ডিরেক্টররা। গীতার জায়গা নিচ্ছেন লতা মঙ্গেশকর আর আশা ভোঁসলে। গীতার অনুপস্থিতি দুই বোনের ক্যারিয়ার গড়ে দিচ্ছিল। 'হাওড়া ব্রিজ' ছবিতে নায়িকা মধুবালার লিপে জায়গা পেলেন আশা। ও পি নাইয়ারের কাছের মানুষ হয়ে আশা ভোঁসলে পাচ্ছেন সব নায়িকার লিপে গান। শক্তি সামন্তর 'হাওড়া ব্রিজ'-এও তাই হল। কিন্তু গীতা নর্তকীর লিপে গাইবেন শুনে ওপি নাইয়ার গীতাকে বললেন "আপনাকে এমন গান দেব যে গান গীতা দত্তকে পৃথিবী যতদিন থাকবে লোকে মনে রাখবে"। তাই হল। সুপার ডুপার হিট করল হেলেনের লিপে গীতার গান "মেরা  নাম চিন চিন চু '।

গুরু দত্ত বানালেন 'কাগজ কে ফুল'। ছবির প্লট যেন গীতা গুরু আর ওয়াহিদার গল্প পর্দায় উঠে এল। কিন্তু ছবি সেভাবে সফলতা পেলনা বক্সঅফিসে। তবে গীতার আকুতি ভরা কন্ঠে গান "ওয়াক্ত নে কিয়া কেয়া হাসিন সিতম' দুলিয়ে দিল সারা ভুবন। 

অভিনেতা হিসেবে গুরু দত্তর আর একটি উল্লেখযোগ্য ছবি 'সতেলা ভাই'। এটি ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বৈকুন্ঠের উইল' অবলম্বনে হিন্দি চলচ্চিত্র। বাঙালি চরিত্রে বারবার ফিরে এসেছেন গুরু। এই রোল পরে বাংলা ছবিতে দুবার জহর গাঙ্গুলি,সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় করেছিলেন। 

A tribute to the genius of Geeta Dutt, whose 86th birth anniversary was  celebrated last week. - The Hindu


গুরুর আরো কটি ছবি 'আর পার','মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ৫৫'। 'চৌধভি কা চাঁদ' ছবিতে ওয়াহিদা রহমানের বিপরীতে গুরু দত্তের অভিনয় ভারতীয় সিনেমায় অভিনয়ের মাস্টারক্লাস। 

এরপর গুরু প্রযোজনা করলেন 'সাহেব বিবি গুলাম'। এই ছবি বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রবেশাধিকার পেল। গীতা আর গুরুর সঙ্গে বার্লিন সফরে গেলেন ওয়াহিদা। তবে বিদেশী ফিল্ম সমালোচকরা বাঙালি সেন্টিমেন্ট বুঝতে অপরাগ হলেন। তাঁরা বললেন বাড়ির ছোট বউ সুরাপান করলে সেটা কেন অপরাধ হবে? কেনই বা স্ত্রীকে মদ খেয়ে স্বামীকে ঘরে আটকে রাখতে হবে? আসলে সাহেবদের কাছে মহিলাদের মদাসক্ত হওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। 

ওয়াহিদার সঙ্গে গীতার সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। গুরু দত্তর বাইরের প্রোডাকশনে ওয়াহিদার লিপে গীতার কাছে গান গাইবার অফার এলে গীতা পত্রপাঠ বিদায় জানালেন। 

চমকপ্রদ বিষয়,ওয়াহিদা কিন্তু ছিলেন সেসময় দেব আনন্দের-ও নায়িকা। দেব আনন্দ সেই সুরাইয়া থেকে জিনাত আমন তাঁর সমস্ত নায়িকাদের সঙ্গেই সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বা ফ্লার্ট করতেন। কিন্তু দেব আনন্দ কখনও ভুলেও ওয়াহিদার সঙ্গে প্রেম করেননি। দেব আনন্দের বন্ধু ছিলেন যে গুরু দত্ত। তাই দেব ওয়াহিদার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। 

গুরু দত্ত যত বড় প্রতিভাধর ছিলেন সেভাবে কিন্তু তিনি পুরস্কার পাননি। সেই নিয়ে তাঁকে নৈরাশ্য ঘিরে ধরতে থাকে। গুরু দত্তের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন সারা ইন্ডাস্ট্রির চর্চার বিষয় হয়ে উঠল। যা তাঁর ক্যারিয়ারে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল।

 Photos] Rare glimpses of Guru Dutt's last unfinished movie 'Baharen Phir  Bhi Aayengi'


গীতা আর গুরুর তিক্ততা চরমে উঠলে, তিন সন্তান দুই শিশু পুত্র  আর এক শিশু কন্যাকে নিয়ে স্বামীর ঘর ছাড়লেন গীতা। কিন্তু গুরুকে ডিভোর্স দিলেন না গীতা। স্ত্রী,সন্তান, কেরিয়ার হারানো গুরু ওয়াহিদার স্পর্শ চাইলেন। কিন্তু সেদিন ওয়াহিদা গুরুকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন গীতাকে ডিভোর্স না দিলে তিনি গুরুর জীবনের 'আদার ওম্যান' হয়ে বাঁচবেন না। কেরিয়ার গড়ে নিয়ে গুরুকে তিরস্কার করলেন ওয়াহিদা। গুরুর জীবনতরী যেন ভরাডুবি হতে থাকল। 


অবশ্য গীতার সঙ্গে সম্পর্ক ফেরাতে গুরু গীতাকে নায়িকা করে অনেক আগেই 'গৌরী' বাংলা ছবি করতে চলেছিলেন। 'গৌরী' তিনটি ভাষার ছবি চর্চিত থাকলেও গৌরী ছিল বাংলা ছবি। গীতা দত্ত বলে গেছিলেন "আমার হিন্দি সংলাপ অত দর ছিলনা,তাই গৌরী বাংলা ছবি করছিলেন নির্মাতা গুরু দত্ত'। সেই ছবির কয়েকটা গানের দৃশ্য শ্যুট হলেও ছবি আর এগোয়নি পরে। 'গৌরী'র সুরকার ছিলেন শচীন দেব বর্মণ। গীতার গান শচীন দেব পরবর্তী কালে নিজের গলায় বেসিক রেকর্ড করলেন 'বাঁশি শুনে আর কাজ নাই,সে যে ডাকাতিয়া বাঁশী'। 

গুরু দত্তর জীবনের সব আলো যেন এক এক করে নিভে যাচ্ছিল। গুরু বলতেন সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে দিতে চাইতেননা গীতা। আসলে গীতা চাননি নেশাতুর বাবার কাছে শিশু সন্তানদের পাঠাতে। একাকীত্বে নিজের বাড়িতে দিন কাটছিল একা গুরু দত্তের। ভালবাসার কাঙাল গুরু দত্ত তাঁর বুক ভরা হাহাকার মেটাতে খেতে থাকলেন পিপে পিপে মদ। হয়তো তাঁর এটাই ভবিতব্য ছিল কারণ তিনি তাঁর জীবনে কোন নারীকেই সম্মান দেননি। ওয়াহিদা নিজের রাস্তা দেখে নিলেও গীতা সত্যি গুরুকে ভালবেসে জ্বলে পুড়ে গেলেন। বাংলা ছবিতেও গীতা সুচিত্রা সেন,মালা সিনহাদের লিপ সুপারহিট। কিন্তু সেখানেও গীতা রেকর্ডিং এর ডেট ফেল করতে লাগলেন। 

Bollywoodirect on X: "Geeta Dutt offers tributes to husband Guru Dutt on  his birth anniversary. Geeta Dutt breathed her last on July 20, 1972. She  was 41. Guru Dutt had died 8


এক রাতে গুরু দত্ত সুরা পান করে গীতাকে ফোন করে বাচ্চাদের পাঠাতে বললেন তাঁর কাছে। গীতা জানিয়ে দিলেন 'বাচ্চারা ঘুমোচ্ছে ওরা কাল সকালে যাবে'। কিন্তু রাগান্বিত হয়ে গুরু গীতাকে বললেন "বাচ্চাদের না পাঠালে আমার মরা মুখ দেখবে!" এরকম কথা তো গীতার কাছে নতুন কিছু ছিল না। গুরু দত্ত গীতার গায়ে হাত অবধি তুলতেন। ঠিক একরকম পজেশিভ গুরু দত্ত ওয়াহিদার ওপর ছিলেন। ওয়াহিদাকে শেষদিকে অন্য পরিচালকদের ছবিতে কাজ করতে বারণ করতেন গুরু। যা মেনে নেননি ওয়াহিদা। এখানেই গীতা আর ওয়াহিদার পার্থক্য। ওয়াহিদা স্টার হতে পেরেছিলেন গীতা দত্তর গান আর গুরু দত্তর লিড নায়িকা হতে পেরেছিলেন বলেই। 

গীতা সে রাতে বাচ্চাদের পাঠাননি। ফোন ছেড়ে গুরু দত্ত অত্যাধিক মদ্যপান করেন। তাতেও তাঁর ঘুম না আসায় অত্যাধিক ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন তিনি। ১০ই অক্টোবর ১৯৬৪ নেশা আর ঘুমের ওষুধ এক হয়ে গুরু দত্তের জীবন প্রদীপ নেভে ভোর রাতেই। বেশিরভাগ জন বলেন গুরু দত্ত আত্মহনন করেছিলেন। কারণ তিনি আগে দুবার আত্মহননের চেষ্টা করেন। যদিও গুরু দত্তর ছেলেরা অরুন দত্ত ও তরুণ দত্ত বলেছিলেন "বাবার সুইসাইড করার মতো কারণ তো ঘটেনি। মা তো বলেছিলেন আমাদের সকালে পাঠাবেন। আগে যে কবার সুইসাইডের চেষ্টা বাবা করেন কোন সুইসাইড নোট লিখে রেখে যেতেন। মৃত্যুর দিন কোন নোট তিনি লিখে যাননি "।

সকালে গুরুকে মৃত অবস্থায় পান বন্ধু পরিচালক আব্রার আলভী। গীতা খবর পেয়ে ছুটে যান সজল নয়নে। হাউহাউ করে কাঁদতে থাকা গীতাকে সামলাতে কেউ পারেনি সেদিন। গীতাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন 'সাহেব বিবি গুলাম' ছবির ছোট বৌঠান মীনা কুমারী। কে জানত ভালবাসার কাঙালিনী মীনা, গীতা সবার জীবন ছোট বৌঠানের মতো শেষ হবে যৌবনেই সুরায়-সুরায়। 

Will Guru Dutt's story be told? - Lexology


গুরু দত্তর নায়ক হিসেবে শেষ ছবি ছিল 'বাহারে ফির ভি আয়েগি'। এই ছবির প্রযোজক গুরু দত্ত। গুরুর শ্যুট করা কিছু দৃশ্য ছিল। তখন বাকিরা ঠিক করেন গুরুর অংশ রাখতে গেলে ছবি রিলিজ করা যাবে না। অনেক রোল নায়কের বাকি। নতুন নায়ক লাগবে। সেসময়কার কোন নায়ক মরা নায়কের রোল করতে চাননি। শেষ অবধি স্ট্রাগল করা নায়ক ধর্মেন্দ্র নায়ক হন মালা সিনহা আর তনুজার। তিনজনকেই অপূর্ব মায়াবী লেগেছিল ছবিতে। 

গুরুর রহস্য মৃত্যু সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিল। প্রতিটি সংবাদপত্রের পাতায় গীতা-গুরু-ওয়াহিদার চর্চা। 

ঘরে বাইরে কেচ্ছার কালি গীতার গানের ক্যারিয়ার শেষ করে দিচ্ছিল। তবু গীতা দত্ত সন্তানদের মুখ চেয়ে ফাংশন করতেন। কলকাতায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গান করতে উঠলেন মদাসক্ত গীতা। হারমোনিয়ামের ওপর মাথা রেখেই ঢলে পড়লেন গীতা। দর্শক সামলাতে হেমন্ত একাই গাইলেন তাঁদের ডুয়েট গান 'নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়'। কানু রায়ের সুরে গুলজারের 'অনুভব' ছবিতে গীতা গাইলেন জীবনের শেষ অশেষ গান 'মেরি জান, মুঝে জান না কাহো মেরি জান'। 

এমনকি গুরু দত্তর মৃত্যুর পর গীতা টাকা রোজগারের জন্য 'বধূবরণ' বাংলা ছবির নায়িকা হয়েছিলেন। গীতা প্লে ব্যাকও করেন। গীতার বিপরীতে নায়ক ছিলেন প্রদীপ কুমার। কিন্তু সুপার ফ্লপ করে এই বাংলা ছবি। নায়িকা রূপে গীতা দত্ত আলোর মুখ দেখলেন না।

L'Assoiffé - Festival des 3 Continents

গুরু দত্তকে কিছুতেই ভুলতে পারলেন না গীতা। ততদিনে প্লেব্যাকে গীতার জায়গা হয়েছে নায়িকা থেকে সহ-নায়িকার লিপে। ফুরিয়ে গেলেন নেশার কবলে গীতা। সিরোসিস অফ লিভার ধরা পড়ল। গীতা বুঝে গেলেন তিনি শেষ। শেষদিন গুলো গীতা গুরুর উপহার দেওয়া কাঁচের চুড়ি একটা একটা করে ভেঙে ফেলতে লাগলেন। আর একটা নিজের গানই রেকর্ড প্লেয়ারে চালিয়ে বার
বারবার শুনতেন 'কত গান হারালাম তোমার মাঝে, আজ কেন গো বলো সেই গান দোলা দেয় সকাল-সাঁঝে'। গীতা দত্ত সুরলোকে পাড়ি দেন ২০ শে জুলাই ১৯৭২।  গুরু-গীতার তিন সন্তান তরুন,অরুণ,নীনাকে মানুষ করেছিলেন গীতার ভাই মুকুল রায়। 

'তুমি নেই সুর নেই কাঁদে যে আকাশ 
ফুলেদের মনে নেই অলির বিলাস 
তবু কেন সেদিনের দখিন বাতাস 
ধরা দিয়ে যায় আজও সকল কাজে ... ' 


```