বিজয়া রায়ের মুখে এমন কথা শুনে কিছুটা থমকে গিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। বিজয়া রায় জানতেন ঋতুপর্ণ সুপ্রিয়া দেবী, অপর্ণা সেন, শর্মিলা ঠাকুরের মতো সিনিয়র শিল্পীদের প্রকাশ্যে 'তুই' বলেই ডাকেন।

বিজয়া রায় ও ঋতুপর্ণ ঘোষ । গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 2 June 2025 17:23
বাংলা চলচ্চিত্রের দুই সময়ের দুই শ্রেষ্ঠ পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং ঋতুপর্ণ ঘোষ। ঋতুপর্ণর চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসার প্রেরণা কিন্তু ছিল সত্যজিৎ রায়ের ছবি। তাঁর সংগ্রহে সত্যজিতের সব কটি ছবির ডিভিডি ছিল। বারবার দেখে ছবিগুলির প্রতিটি ফ্রেম আত্মস্থ করতেন ঋতুপর্ণ। এক কথায় ঋতুপর্ণর চলচ্চিত্র গুরু সত্যজিৎ রায় ছিলেন। বার কয়েক সত্যজিতের সঙ্গে সাক্ষাতও হয়েছিল তাঁর। তখন অবশ্য ঋতুপর্ণ নামী পরিচালক হননি। বিখ্যাত পরিচালক হবার পর ঋতুপর্ণর সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় সম্পর্ক ঘটে সত্যজিৎ জায়া বিজয়া রায়ের। তারপর ঘটেছিল চমকপ্রদ ঘটনা। যা আজীবন মনে রেখেছিলেন ঋতুপর্ণ।
ঋতুপর্ণর বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন আর্টিস্ট মানুষ। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ছবি আঁকার জগতে তাঁর আর থাকা হয়নি। জীবিকার তাগিদে প্রাইভেট ফার্মে কাজ করতেন। তবে তিনি বেশ কিছু তথ্যচিত্র বানিয়েছিলেন। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের পরিচয় ছিল।বাংলা আর ইংরেজি লেখাতে ঋতুপর্ণর অসম্ভব পারদর্শিতা ছিল। আসলে, বইভক্ত বাবা সুনীল ঘোষ ছোট থেকেই ঋতুপর্ণকে সঙ্গে নিয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে যেতেন। বহু ছুটির দিন মানেই ছিল বাবা-ছেলের একসঙ্গে ন্যাশনাল লাইব্রেরি যাওয়া। চিলড্রেন লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ে ছুটির দুপুরগুলো কাটত ঋতুপর্ণর। আর শিশুবয়সে বাবা ছেলেকে মহাভারত পড়ে শোনাতেন। ঋতুর সাহিত্যের ওপর দখল তাঁর বাবা-ই তৈরি করে দিয়েছিলেন।

ঋতুপর্ণর লেখা একটি বাংলা প্রতিবেদন সুনীল ঘোষ একবার নিয়ে গিয়ে সত্যজিৎ রায়কে পড়িয়েছিলেন। ঋতুপর্ণর লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে যান সত্যজিৎ রায়। শুধু তাই নয়, এমন যার লেখার দখল, সেই প্রতিভাধর ছেলের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। তখন ঋতুপর্ণ সাউথ পয়েন্ট স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র। সুনীল ঘোষ বাড়ি এসে স্ত্রী ইরা ঘোষকে বললেন 'মানিকদা রিঙ্কুর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। রিঙ্কুকে রায়বাড়ি নিয়ে যেতে বলেছেন উনি।' ঋতুপর্ণর ডাক নাম ছিল রিঙ্কু। কিন্তু ইরা ঘোষ তীব্র ভাবে আপত্তি জানালেন। তিনি সুনীল ঘোষকে বললেন 'একদম সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি রিঙ্কুকে নিয়ে যেও না। তাহলে ওর পড়াশোনা লাটে উঠে যাবে। সব ছেড়েছুড়ে ছেলে সিনেমার পেছনে ছুটবে। সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা তাই একদম নয়।' মায়ের বারণে আর যাওয়া হল না। বহু পরে ঋতুপর্ণ এ ঘটনার কথা জানতে পেরেছিলেন।
পরে অবশ্য, নিউ এম্পার সিনেমাহলে 'পিকু' ছবির বিশেষ প্রদর্শনীতে সত্যজিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ঋতুপর্ণর। সত্যজিৎ অতদিন পর আর বোঝেননি এই ছেলের লেখা পড়েই তিনি তাঁর বাড়ি ডেকেছিলেন। ঋতুও আর তোলেননি পুরনো কথা।
বিজয়া রায়ের ঋজু ব্যক্তিত্ব ঋতুপর্ণর খুব পছন্দের ছিল। সত্যজিতের ছবির পোশাক থেকে ডিটেলিংয়ে স্ত্রী বিজয়া রায়ের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তরুণীবেলায় বিজয়া কয়েকটি ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। বিজয়া গায়িকা হিসেবেও কম ছিলেন না। তাঁর গানের ভক্ত ছিলেন দিলীপ রায়। বিজয়ার কণ্ঠে গান শুনে রবীন্দ্রনাথ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কুমারীবেলায় বিজয়া সুকুমার রায়কেও গান শুনিয়েছিলেন, দু'বাড়ির পরিচয় থাকার সুবাদে। পরবর্তীতে বিদুষী রূপে বিজয়া রায় পরিচিত ছিলেন।
এরপর সত্যজিৎ রায় তো চলেই গেলেন। ঋতুপর্ণর প্রথম ছবি 'হীরের আংটি'র শুরুর পুজো আবহ দেখলেই বোঝা যায়, সত্যজিৎ প্রভাব কতটা। 'উৎসব', 'উনিশে এপ্রিল', 'আবহমান', 'শুভ মহরৎ' সব ছবিতেই রয়ে গেছে সত্যজিতের ছবির ডিটেলিং।

ততদিনে ঋতুপর্ণ বেশ কিছু ছবি করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়ের সঙ্গে ঋতুপর্ণর সখ্যতা গড়ে উঠেছে। রায়বাড়িতে প্রথম পা রেখেই ঋতুপর্ণ বিজয়া রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আলাপের শুরুতেই বিজয়া রায় ঋতুপর্ণকে আদর মিশ্রিত ধমকের সুরে বলেছিলেন 'ঋতুপর্ণ তুমি আমাকে কিন্তু 'তুই' বলে ডাকবে না'। বিজয়া রায়ের মুখে এমন কথা শুনে কিছুটা থমকে গিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ।
বিজয়া রায় জানতেন ঋতুপর্ণ সুপ্রিয়া দেবী, অপর্ণা সেন, শর্মিলা ঠাকুরের মতো সিনিয়র শিল্পীদের প্রকাশ্যে 'তুই' বলেই ডাকেন। আর সেখানে বিজয়া রায় নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন শর্মিলা, অপর্ণাদের। আসলে ঋতুপর্ণ সুপ্রিয়া, অপর্ণাদের তুই করে বলতেন ভালবেসেই। ওঁদের সম্পর্কটা এতটাই নিবিড় হয়ে গিয়েছিল যে কোনও আড়াল ছিল না। অনেকেই জানেন না ঋতুপর্ণ কিন্তু অপর্ণা সেনকে প্রথম সাক্ষাতে আপনিই বলেছিলেন। সম্পর্কের নৈকট্য বাড়তে 'আপনি' থেকে 'তুমি' হয়ে 'তুই' হয়ে যায়।

বিজয়া রায়ের আদেশ শিরোধার্য রূপে মেনে নেন ঋতুপর্ণ। তবে বিজয়া রায়কে 'তুই' বলার অভিপ্রায়ও ঋতুপর্ণর ছিল না। আপনি করেই বলেছিলেন ঋতুপর্ণ। বিজয়া রায় কিন্তু ঋতুপর্ণর ছবির প্রশংসা করেছিলেন।

তবে আজও জানা যায়নি, ঋতুপর্ণর 'আবহমান' ছবিতে মমতা শঙ্কর অভিনীত দীপ্তির চরিত্র দেখে বিজয়া রায় কী মন্তব্য করেছিলেন। কারণ দীপ্তির চরিত্রটি ছিল বিজয়া রায়ের আদলেই তৈরি। যদিও ঋতুপর্ণ বলেছিলেন 'আবহমান' সত্যজিৎ-বিজয়া-মাধবীর কাহিনি বলছেন কেন? গুরু দত্ত-গীতা দত্ত-ওয়াহিদা রেহমানও তো হতে পারেন!