কিন্তু হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় ভাঙল তাঁদের মিলনমেলা। সন্ধ্যানীড় থেকেই বেরিয়ে যেতে হয় তরুণ মজুমদারকে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 4 July 2025 17:35
'যৌবনসরসীনীরে মিলনশতদল
কোন্ চঞ্চল বন্যায় টলোমল টলোমল॥
শরমরক্তরাগে তার গোপন স্বপ্ন জাগে,
তারি গন্ধকেশর-মাঝে
এক বিন্দু নয়নজল॥'
তরুণ মজুমদারের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে, গম্ভীর মুখের সঙ্গে রোম্যান্টিক ইমেজ একেবারেই যায় না। তাঁর হাসিমুখ কদাচিৎ দেখেছে মানুষ। সেই তরুণ মজুমদার প্রেমে পড়লেন বাংলা ছবির লক্ষ্মীপ্রতিমা সন্ধ্যা রায়ের। নায়িকা স্ত্রী আর পরিচালক স্বামী, বাংলা ছবির ইতিহাসে এসেছে বারবার। কানন দেবী-হরিদাস ভট্টাচার্য থেকে তপন সিনহা-অরুন্ধতী। তাঁদেরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য জুটি তরুণ মজুমদার-সন্ধ্যা রায়।

'পলাতক' ছবিতে প্রথম একসঙ্গে কাজ করেন সন্ধ্যা রায় আর তরুণ মজুমদার। এক ছবিতেই বাজিমাৎ করে এই জুটি। তবে তরুণ-সন্ধ্যার ছবিতে আরও দুই ম্যাজিক কার্ড ছিলেন অনুপ কুমার ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
এরপর 'আলোর পিপাসা', 'নিমন্ত্রণ, 'সংসার সীমান্তে', 'ফুলেশ্বরী' 'খেলার পুতুল' একের পর এক ছবিতে তরুণ মজুমদারের ছবিতে সন্ধ্যা হিট। কখন যে তাঁদের মন বিনিময় হয়ে গেল তা দুঁদে সাংবাদিকরাও জানতে পারেননি।

কেমন ছিল তরুণ-সন্ধ্যার বিবাহ বাসরের রাত। এই বিয়ের অন্যতম কাণ্ডারী ছিলেন বাগীশ্বর ঝা। বাংলা সিনেমার নামকরা পিআরও ছিলেন বাগীশ্বর ঝা। বহু সুপারহিট বাংলা সিনেমার প্রচারের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো তারকাদের প্রিয় পাত্র ছিলেন ঝা। তাঁর প্রচার সংস্থায় শিক্ষানবিশ হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছিলেন তরুণ মজুমদার। তিনি তরুণকে ভীষণ স্নেহ করতেন। এমনকি সন্ধ্যার যোগ্য তরুণ সেই ঘটকালি বাগীশ্বর ঝা করেছিলেন।
ইন্ডিয়ান ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে হয়েছিল দু’জনের বিয়ের প্রীতিভোজ। ধুতি-পাঞ্জাবিতে সেজেছিলেন তরুণ মজুমদার। সন্ধ্যা রায়ের পরনে ছিল বেনারসি। কে ছিলেন না সেই প্রীতিভোজের আসরে। প্রায় গোটা টলিউড তাঁদের বিয়েতে যোগ দিয়েছিল। এসেছিলেন উত্তমকুমার, সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহার মতো ব্যক্তিত্বরা। পরে সুচিত্রা সেনও এসেছিলেন রাতের দিকে। উত্তমকুমার তরুণ আর সন্ধ্যা, দু'জনকে দুটো হীরের আংটি উপহার দিয়েছিলেন।

তখন বেশিরভাগ বাঙালি পরিবারের বিয়েতে মাংস হত না। তরুণ-সন্ধ্যার বিয়েতেও মাংস হয়নি, সব নানারকম মাছের আইটেম হয়েছিল। পাতপেড়ে বসে সকলে খেয়েছিলেন ভূরিভোজ। বাসর রাতে ছিল রবীন্দ্র সঙ্গীত। সন্ধ্যার তৈরি 'সন্ধ্যানীড়' বাড়িতেই থাকতেন তরুণ মজুমদার।
ষাটের দশক থেকে নয়ের দশকের শুরু অবধি প্রায় সব ছবিতেই হিট দিয়েছেন তাঁরা। নিঃসন্তান দম্পতি একের পর এক নবাগতদের সন্তানসম স্নেহ দিয়ে স্টার বানিয়েছেন। অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, তাপস পাল, মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী রায়ের মতো নতুনদের মাটির তাল থেকে তারকা বানিয়েছিলেন তরুণ সন্ধ্যা। তরুণ মজুমদারের প্রতিটি ছবিতে সন্ধ্যা যেমন ছিলেন বক্সআর্টিস্ট তেমন ছবির পেছনেও ছিল সন্ধ্যার বিশাল অবদান।
কিন্তু হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় ভাঙল তাঁদের মিলনমেলা। সন্ধ্যানীড় থেকেই বেরিয়ে যেতে হয় তরুণ মজুমদারকে। সম্পর্কের গুঞ্জন থেকে নানা রহস্য গুঞ্জরিত হয়েছিল সেসময়। বামপন্থী তরুণ মজুমদারকে ছেড়ে সন্ধ্যা চলে যান বিরোধী দলে। দু'জনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল।

হাসপাতালে ভরতি হওয়ার দু’দিন আগেও তরুণ মজুমদার জানতে চেয়েছিলেন সন্ধ্যা রায় কেমন আছেন। তরুণ মজুমদারের অসুস্থতার খবরে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন সন্ধ্যা রায়। অভিমানের মেঘ সরে গিয়ে উঁকি দেয় ভালবাসা। মৃত্যুর পর তরুণ মজুমদারকে শেষ দেখা দেখতে পারেননি সন্ধ্যা। সেদিন মিস্টার মজুমদার বলে তরুণকে সম্বোধন করেছিলেন সন্ধ্যা। স্বামীর জন্য আলাদা করে পারলৌকিক ক্রিয়াও করেন সন্ধ্যা।