শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে রোম্যান্টিক গান হয়ে ক্যাবারে গান ...সঙ্গীতের সব প্রান্ত ছুঁয়ে গেলেন রাহুল দেব বর্মণ। কিশোর গাইলেন উত্তমের লিপে 'তবু বলে কেন সহসাই থেমে গেলে'।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 27 June 2025 13:48
উত্তমকুমারের গান মানেই ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। পাঁচের দশকের বাংলা ছায়াছবিতে সুপারহিট ছিল উত্তম-হেমন্ত জুটি। এরপরে ষাটের দশকে উত্তমকুমারের লিপে হিট গান দিলেন শ্যামল মিত্র আর মান্না দে। ভূপেন হাজারিকা 'সাগর সঙ্গমে' উত্তমের ঠোঁটে গাইলেও গান হিট হলেও, পর্দায় উত্তমকুমারের লিপে ভূপেন বেমানান ছিলেন। এরপর সাতের দশকে তখন হিন্দি ছবির মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ভোলবদল হয়ে গিয়েছে। ততদিনে পশ্চিমী সুরের প্রভাব এসে গিয়েছে বলিউডে। সেই নতুন প্রজন্মের সুর নিয়ে এসেছেন যিনি ...তিনি পঞ্চম। শচীন দেব বর্মণের ছেলে আর ডি বর্মণ।
ত্রিপুরার মানুষ তাঁরা আদতে। কিন্তু পঞ্চমের ছেলেবেলা কেটেছিল কলকাতার ঢাকুরিয়ার বাড়িতে। মনে প্রাণে বাঙালি হয়েও পশ্চিমী সুরের জাদুকর তিনি।
১৯৩৯ সালের ২৭শে জুন কলকাতায় জন্ম হয় আর ডি বর্মণের। প্রথমে বাবার অর্কেস্ট্রার সদস্য ছিলেন তিনি। আর ডি বর্মণকে পরিচিতি এনে দেয় 'সর যো তেরা চকরায়ে...' গানের সুর।

বম্বেতে পঞ্চমের একের পর এক হিট গানে এল সাফল্য। কিন্তু বাবা শচীন দেব বর্মণ চাইতেন ছেলে পঞ্চম বাংলা ছবির গানে সুর দিক। সুযোগ আর আসে না।
ছয়ের দশকের শেষদিকে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তমকুমার তখন মধ্যগগনে। সলিল সেন ছবি করছিলেন 'রাজকুমারী'। উত্তমের বিপরীতে বম্বের তনুজা। সলিল সেন আর উত্তম চেয়েছিলেন শচীন দেব বর্মণ সুর দিক এই ছবিতে।
কিন্তু শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতে তিনি উত্তমকুমারকে অনুরোধ করলেন 'আমি তো অনেক অনেক কাজ করেছি। আপনার কোনও ছবিতে যদিও সুর দেবার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু আমার ছেলে পঞ্চমকে একবার সুযোগ দিয়ে দেখুন।' কথা রাখেন উত্তমকুমার।

পঞ্চম বাংলা ছায়াছবিতে প্রবেশের সুযোগ উত্তমকুমারের হাত ধরেই। তবে আর ডি বর্মণ উত্তমকুমারের লিপে নিয়ে আসলেন কিশোর কুমারকে। এরআগে উত্তমের লিপে 'সাবরমতী' ছবিতে একটাই মাত্র গান গেয়েছিলেন কিশোর। সে গান অসাধারণ হলেও বিশাল হিট করেনি।
'রাজকুমারী' তে আর ডি বর্মণ উত্তমের লিপে আনলেন কিশোর কুমারকে আর তনুজার লিপে আশা ভোঁসলেকে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে রোম্যান্টিক গান হয়ে ক্যাবারে গান ...সঙ্গীতের সব প্রান্ত ছুঁয়ে গেলেন রাহুল দেব বর্মণ। কিশোর গাইলেন উত্তমের লিপে 'তবু বলে কেন সহসাই থেমে গেলে'। পিয়ানো বাজিয়ে উত্তমের ঐ নায়কোচিত আমেজ দুরন্ত। কিন্তু হেমন্ত মান্না পরিচিত কণ্ঠে বাঙালি উত্তমকে পেল না। যে কারণে কিশোর গলা উত্তমের ঠোঁটে বেশির ভাগ বাঙালি নিতে পারল না। ছবি হল থেকেই উঠে গেল।

কিন্তু পুজো রিলিজ ছবি ছিল সলিল সেনের 'রাজকুমারী'। ছবি রিলিজের আগে গান রিলিজ করে। পাড়ার পুজোর মাইকে মাইকে 'রাজকুমারী'র গানের হিট। এদিকে ছবি চলল না। খুব হিট করেছিল কিশোর-আশার ডুয়েট 'বন্ধ দ্বারের অন্ধকারে থাকব না'। উত্তম-তনুজার অভিনয়ে এই গানে উত্তমকুমার নিজের গাড়ি চড়েই শুটিং করেন।
'রাজকুমারী' দ্বিতীয় বার কদিন পর রিরিলিজ করা হয়। তখন কিন্তু এই ছবি হিট করে। তবে উত্তম-তনুজার 'দেয়া-নেয়া' বা 'অ্যান্টনী ফিরিঙ্গী'র মতো 'রাজকুমারী' সাফল্য পায়নি। অথচ ছবিটি গানে অভিনয়ে কোন অংশে কম ছিল না।
তবে উত্তমকুমারের ছবি দিয়েই আর ডি বর্মণের বাংলা ছবিতে সফর শুরু হল। আশির দশক জুড়ে বাংলা ছবিতে চলেছিল আর ডি যুগ। উত্তমকুমারের অবদান আর ডি বর্মণ কোনদিনও ভোলেননি।