হয় যেত, নয় হারো। বাজবলে ড্রয়ের কোনও জায়গা নেই! ফলের জন্য ক্রিকেট খেলো। নিষ্কাম কর্ম, ম্যাকালাম দর্শনে, সোনার পাথরবাটি।

বাজবল
শেষ আপডেট: 13 June 2025 13:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নবাগত কোচের ডাকনাম আর একটি চালু অনুসর্গকে জুড়ে ধুয়োটা তুলেছিলেন জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইটের সম্পাদক অ্যান্ড্রু মিলার। পডকাস্টে হাসিমশকরার ছলেই ফট করে বলে ফেলেন: অকুতোভয়, বেপরোয়া ক্রিকেটার ব্রেন্ডন ম্যাকালাম যখন ইংল্যান্ড ক্রিকেট টিমের গদিতে বসেছেন, তিনি দলকে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে শেখাবেন। তিন ফর্ম্যাটের জল-অচল ভেদ যাবে ঘুচে।
কী নাম দেওয়া যেতে পারে এই স্টাইলের? ম্যাকালামের ডাকনাম ‘বাজ’। তাঁর কোচিংয়ে যে কায়দায় বল ঠ্যাঙাবেন বেন স্টোকস, জো রুটরা—তাকে ‘বাজবল’ বলতে ক্ষতি কী?
অ্যান্ড্রু মিলার সেদিন ঘুণাক্ষরে কল্পনা করেননি, তাঁর মুখ ফসকে বেরোনো শব্দবন্ধ আস্ত ‘কয়েনেজ’ হয়ে দাঁড়াবে! বাজবল আজ শুধুমাত্র একটি শৈলী নয়, প্রসারিত করেছে ক্রিকেটের দর্শন, ছড়িয়ে দিয়েছে আধুনিক টেস্টের জ্যামিতি। স্টোকস-ম্যাকালাম জুটির হাত ধরে যে শৈলী ২০২২ সালের মে মাসে আত্মপ্রকাশ করে, তা ইদানীং দাপিয়ে শাসন করছে লাল বলের ক্রিকেট। সাদরে, দু’হাত খুলে একে আগলে ধরেছে সমস্ত টেস্টখেলিয়ে দেশ।
ঠিক সাতদিন বাদে শুরু হতে চলেছে ইংল্যান্ড সিরিজ। প্রথম ম্যাচ লিডসে। আর প্রথম দিনের প্রথম সেশন থেকেই যে তাঁরা ‘বাজবল’ টেকনিক ধরে খেলবেন, সাংবাদিকদের সামনে সাফ করে দিয়েছেন ম্যাকালামও।
কিন্তু কী এই বাজবল? শুধুই কি চালিয়ে খেলার ধরন? দ্রুত রান তোলার বাসনা? আগ্রাসী ক্রিকেট? নাকি এর বাইরেও রয়েছে ভিন্ন তাৎপর্য? কী এর ইতিহাস? কীভাবে গৃহীত হয় বাইরের দেশে?
শুরুর কথা:
তখন কোভিড চলছে। আর সবকিছুর মতোই ক্রিকেট টুর্নামেন্টও বন্ধ। কোথাও কোথাও সিরিজের আসর বসলেও গ্যালারি দর্শকশূন্য। এই সময় ইংল্যান্ড টিমও এক অদ্ভুত নৈরাশ্যের মুখ দেখেছিল। বিশেষ করে, টেস্ট ক্রিকেটে। তখন দলের অধিনায়ক জো রুট। সতেরো টেস্টে মাত্র একটিতে জিতে তিনি মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েন যে, নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে জানান। অনেক বোঝানো সত্ত্বেও নিরস্ত করা যায়নি।
একটা বদল দরকার ছিল, এটা ঠিক। কিন্তু সেটা দলের তারকা ক্রিকেটারকে অবসাদে ঠেলে নয়। রুটের পাশে দাঁড়ান ম্যানেজিং ডিরেক্টর রব কি। আলোচনা চলে। তারপর অধিনায়কের সিদ্ধান্তই মেনে নেন। কুর্সির মালিক বদলে যায়। আসনে বসেন বেন স্টোকস। কিন্তু তিনি একা নন। পরিবর্তন আসে কোচের চেয়ারেও। দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তন খেলোয়াড় ব্রেন্ডন ম্যাকালামের হাতে। যিনি ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর আগ্রাসনের জন্য পরিচিত ছিলেন।
এই দুই বদলই পালটে দেয় ইংল্যান্ডের এ যাবৎকালের ক্রিকেটীয় দর্শন। কোচের কুর্সিতে বসে প্রথম একাদশ বাছাইয়ে খুব একটা বদল আনেননি ম্যাকালাম। কিন্তু খেলার কৌশলগত খোলচলচে পালটে দেন। বোলাররা সামনে দাঁড়িয়ে বাড়তি দায়িত্ব হাতে তুলে নেয়। ছয় টেস্ট ম্যাচের প্রতিটি ইনিংসে প্রতিপক্ষকে অল আউট করতে থাকে। ব্যাটসম্যানরা তুলে যায় রান… ঝড়ের গতিতে।
যে দল সতেরো টেস্টের একটিতে জিতেছিল, তারাই সাত ম্যাচের ছটিতে জিতে সবার নজরে চলে আসে। বিশ্বক্রিকেট নড়েচড়ে বসে, বিশেষজ্ঞেরা কারণ খুঁজতে চশমা সাফ করা শুরু করেন। আর ঠিক তখনই ‘বাজবলে’র তত্ত্ব সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
মুছে যাক সীমারেখা:
বাজবলের মোদ্দা কথাই হচ্ছে: একদিনের ক্রিকেট আর টেস্ট ক্রিকেটের সীমারেখা ঘুচিয়ে দেওয়া। দুটোকেই প্রায় এক পঙক্তিতে টেনে আনা। ওয়ান ডে ম্যাচ খেলার সময় একজন ব্যাটসম্যান যে স্টাইলে শট নির্বাচন করেন, যেভাবে বলকে উইকেটকিপারের হাতে যেতে দেন—সেই একই ধাঁচের প্রয়োগ কেন টেস্টে করা যাবে না?
প্রশ্নটা ইংল্যান্ড টিমের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বৈঠকে খেলোয়াড়দের সামনে রেখেছিলেন কোচ ব্র্যান্ডন ম্যাকালাম। খেলোয়াড় হিসেবে কয়েক বছর আগে যিনি টেস্টে দ্রুততম শতরানের নজির গড়ে ফেলেছেন! সওয়াল তুলে ক্রিকেটারদের নজর মাপছিলেন।
ঠিক সেই সময় সবার আগে কোচের বক্তব্যকে সমর্থন জানান অধিনায়ক স্টোকস। পরে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সত্যি তো… কোচের কথা শুনে আমার মাথায় একটাই প্রশ্ন ধাক্কা মারে: কেন নয়? এটা হলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামার চাপও যায় কেটে। কোচ ঋষভ পন্থের উদাহরণ টেনেছিলেন। যিনি বাজবলের কিচ্ছুটি না জেনেও কিছুদিন আগে একশোরও বেশি স্ট্রাইক রেটে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। টেস্ট ক্রিকেটের নেতিবাচক ধারণা দিয়েছেন মুছে। এটা তো স্রেফ খেলা নয়, দর্শকদের মনোরঞ্জনও ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে। ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই। কিন্তু দর্শকদের আমোদ দেওয়াও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।‘
স্টোকসের বক্তব্যকে সহমত জানান প্রাক্তন পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রা। তুলনা টানেন নয়ের দশকের অস্ট্রেলিয়া টিমের সঙ্গে। যারা ইংল্যান্ডের মতোই ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলায় সিদ্ধহস্ত ছিল।
বাজবলের সপ্তনীতি:
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ ও কলাম-লিখিয়ে ক্রিস স্টোকস বাজবলের সাতটি প্রবণতা বেঁধে দেন। তাঁর চোখে, এই কয়েকটি নীতি মেনেই দলকে একসূত্রে বেঁধে রাখেন কোচ। সেগুলি হল:
১. নিস্তরঙ্গতার বদলে চনমনে ড্রেসিং রুম
২. নেগেটিভ কথা চালাচালি পুরোপুরি বন্ধ
৩. যে কোনও পরিস্থিতিতে জয়লাভের তাড়না
৪. ব্যর্থতার ভয় মুছে ফেলা
৫. ছোটখাট জিনিসেও প্রশংসা
৬. সহজ কথা সহজ ভাবে বলা
৭. মানসিক মুক্তি ও যে কোনও ম্যাচ আনন্দের সঙ্গে খেলা
দলের একদা সদস্য স্টুয়ার্ট ব্রডও মেনে নেন, ম্যাকালামের মন্ত্র তাঁদের প্রগতিশীল করে তুলেছে। সাজঘরের পরিস্থিতি, শরীরী ভাষা আরও ইতিবাচক। মোট কথা: সংঘবদ্ধ ‘টিম ইংল্যান্ড’।
বাজবলের দামামা:
১. সফল রান চেজ: ২০২২-এর গ্রীষ্মে চারটি টেস্ট খেলতে নামে ইংল্যান্ড। রান চেজ করতে হয় চতুর্থ ইনিংসে। আর জেতে প্রতিটিতে। রানের টার্গেটও কিন্তু কম কিছু ছিল না। ২৭৭, ২৯৯, ২৯৬ এবং ৩৭৮—যে কোনও দেশে, যে কোনও পিচে চ্যালেঞ্জিং টার্গেট। প্রতিটি লক্ষ্য সফলভাবে তাড়া করেন বেন স্টোকসরা। পরপর আড়াইশোর উপর রান চেজ করে টেস্ট জেতা দল হিসেবে রেকর্ড বুকে নাম তোলে ইংল্যান্ড।
এই সময় থেকেই টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন অধিনায়ক স্টোকস। সাধারণত, পিচ চতুর্থ ইনিংসে ভেঙে যায় বলে সচরাচর কোনও দলই ব্যাট করতে চায় না। অথচ বাজবলের কী মহিমা! রান তাড়া করে ম্যাচ জেতার নেশায় এই প্রথাবিরুদ্ধ নীতিই বেছে নেয় ম্যাকালামের ইংল্যান্ড।
২. দ্রুতগতিতে রান তোলা: তথ্য বলছে, বাজবলের স্টাইল বেছে নেওয়ার পর থেকে ২০২৩-এর জুন মাস পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ব্যাটিং রান রেট ৪.৬৫। দু’নম্বর দল অস্ট্রেলিয়া। স্টিভ ওয়ার নেতৃত্বে অজিদের রান রেট ছিল ৩.৬৬। এই আগ্রাসনের নমুনা ফুটে ওঠে ২০২২-এর ১ ডিসেম্বর। লর্ডসের ময়দানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাত্র একদিনেই ৪ উইকেট হারিয়ে ৫০৬ রান তোলে ইংল্যান্ড। তাও ৯০ ওভার খেলা হয়নি। সাকুল্যে ৭৫ ওভার খেলা চলে। তাতেই ৬.৭৫-এর গড়ে রান তুলে প্রথম দিনেই ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেয় ইংরেজ বাহিনী। ক্রিকেটের ইতিহাসে যা রেকর্ড।
কিন্তু শুধু নজির গড়েই ক্ষান্ত থাকেননি স্টোকসরা। টি-২০ ক্রিকেটে যে ধরনের স্ট্রোক প্লে দেখতে দর্শকরা অভ্যস্ত, পাকিস্তানি পেসারদের বিরুদ্ধে লাল বলের ক্রিকেটেও একই ধাঁচের শট আমদানি করেন। পেসারদের হাত খুলে রিভার্স র্যাম্প শট মারেন জো রুট, হাত বদলে বাঁহাতি ব্যাটারের ভূমিকাতেও তাঁকে খেলতে দেখা যায়। সবদিক দিয়ে ব্যাকরণ না মানার ফতোয়া জারি করে বুক চিতিয়ে দাপট দেখায় ইংরেজ টিম।
৩. তড়িঘড়ি ডিক্লেয়ার:
দ্রুত বেশি রান তোলার আরেকটা দিক হচ্ছে দ্রুত ডিক্লেয়ার। যাতে দিনের শেষ কয়েক ওভার, যখন পিচ ভাঙতে শুরু করেছে, আলো আসছে কমে, তখন ক্লান্ত প্রতিপক্ষের টপ অর্ডারকে বিড়ম্বনায় ফেলা যায়!
এর প্রথম প্রমাণ মেলে ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩-এ। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যাট করতে নেমে অধিনায়ক স্টোকস প্রথম দিনেই ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এর আগে এত তাড়াতাড়ি সেভাবে কোনও দলই ডিক্লেয়ারের রাস্তায় হাঁটেনি। বেন স্টোকসের ওই সিদ্ধান্ত যে স্রেফ একটি ইনিংসের জন্য নয়, এবার থেকে এটাই হতে চলেছে টিম ইংল্যান্ডের নয়া দর্শন, তার প্রমাণ মেলে পরের বছর অ্যাসেজে। অজিদের বিরুদ্ধে মাত্র ৭৮ ওভার খেলেই ডিক্লেয়ার দেন স্টোকস। ক্রিজে তখনও রুট ১১৮ রানে অপরাজিত! মাইকেল আথারটনের মতো ক্রিকেটারের চোখে এই সিদ্ধান্ত ‘যুগান্তকারী’। টেস্ট ক্রিকেট যে ফলাফলহীন দ্বৈরথ নয়, এবার থেকে টানটান থ্রিলারের তকমা পেতে চলেছে, বাজবল এসে তা সাফ বুঝিয়ে দিয়েছে।
৪. হার হোক চায় জিত… ফলাফল চাই:
বড় ঝুঁকি নাও, বড় সাফল্য আসবে—ম্যাকালামের বার্তা খুব পরিষ্কার। কোনও রকম ধোঁয়াশা ছাড়াই খেলে যেতে হবে আগ্রাসী ক্রিকেট। তবে আগ্রাসন মানেই বল্গাহীন, অন্ধের মতো খেলে চলা নয়। এমন ভাবে ব্যাটিং, বোলিং করতে হবে যাতে একটা ফলাফল আসে। যদি এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচ দাঁড়িয়ে থাকে, যেখান থেকে হার-জিতের তুল্যমূল্য সম্ভাবনা, সেখানে ‘অল আউট’ জয়ের লক্ষ্যেই এগিয়ে যাবে দল। বুঝিয়ে দেন নবাগত কোচ। হয় যেত, নয় হারো। বাজবলে ড্রয়ের কোনও জায়গা নেই! ফলের জন্য ক্রিকেট খেলো। নিষ্কাম কর্ম, ম্যাকালাম দর্শনে, সোনার পাথরবাটি।
৫. রাতের শিকারি পাখি:
টেস্টে নাইটওয়াচম্যান চালু শব্দ। যার অর্থ: দিনের শেষ কয়েক ওভার বাকি থাকা অবস্থায় কোনও টপ অর্ডার ব্যাটার যদি ড্রেসিং রুমে ফিরে যান, তাহলে মিডল অর্ডারের কেউ নন, বদলে ব্যাট হাতে নামবেন টেলএন্ডাররা।
বাজবল এই তকমাই বদলে দিয়েছে। ‘ওয়াচম্যান’ পালটে জুড়ে দিয়েছে ‘হক’ (Hawk)। অর্থ: শিকারী বাজপাখি। কখনও স্টুয়ার্ট ব্রড, কখনও রেহান আহমেদ। বোলাররা অবতীর্ণ হন পিঞ্চহিরাটের ভূমিকায়। দিনের আলো যখন ক্রমশ মরে আসছে, তখন টিকে থাকার বদলে প্রতি আক্রমণ করে নিজেরা কোণঠাসা না থেকে বিপক্ষকে চেপে ধরে ইংল্যান্ড। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ড সিরিজ কিংবা পরের বছর পাকিস্তান… রাতের শিকারিপাখির বেশে ব্যাট হাতে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন ইংরেজ বোলাররা।
এভাবেই টেস্ট ক্রিকেটের ব্যাকরণ বদলে দিয়েছে বাজবল। শুধু ব্যাটিংয়ের কলাকৌশল নয়। বদলে গিয়েছে আস্ত দর্শন, হার-জিতের আদত রাসায়ন।