বিকাশ রায় পরিচালিত প্রথম ছবি 'অর্দ্ধাঙ্গিনী' একেবারেই হারিয়ে গেছে। ছবিটির প্রিন্ট খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

বিকাশ রায় পরিচালিত প্রথম ছবি 'অর্দ্ধাঙ্গিনী'
শেষ আপডেট: 16 May 2025 15:44
স্বর্ণযুগে শ্রেষ্ঠ চরিত্রাভিনেতার কথা বললে যাঁর নাম প্রথমেই আসবে তিনি বিকাশ রায়। নায়কের পাশেও উজ্জ্বল তাঁর উপস্থিতি। কখনও ছবির মান দুর্বল হলেও, বিকাশ রায়ের অভিনয়ে খুঁত বার করা যেত না। তবে অভিনেতা বিকাশ রায় আমাদের সকলের চেনা হলেও, পরিচালক বিকাশ রায় আজও বেশিরভাগ দর্শকের কাছে প্রায় অজানা। 'বিকাশ রায় পরিচালক ছিলেন নাকি?' এমন প্রশ্নই আজকের বাঙালি করে বসবে হয়তো? আজ বিকাশ রায়ের জন্মদিনে বলব তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবির গল্প।
অভিনেতা বিকাশ রায়ের মনে হতে থাকল 'কাজ চলে, নাম যশ হয়, কিন্তু মন খুশি হয় না। কী যেন আমার করা হল না, কী যেন আমার দেবার আছে। মন ছটফট করে। একটা ছবিতে শুধু অভিনয় ছাড়া আমার আর তো কিছু করার থাকে না। তবু মনে হয় আমার আরও কিছু করার আছে। …'
ঠিক এই চিন্তা থেকেই তাঁর পরিচালনায় আসা।

চিত্রনাট্য রচনার মধ্যে দিয়ে তাঁর নতুন পদক্ষেপ শুরু হল। আত্মপ্রকাশ করলেন পরিচালক বিকাশ রায়। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি হল 'অর্দ্ধাঙ্গিনী'। বিকাশ রায় যতগুলি ছবি পরিচালনা করেন বেশিরভাগ তাঁরই প্রযোজনা। বন্ধু অসীম পাল ছিলেন অংশীদার প্রযোজক।
১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'অর্দ্ধাঙ্গিনী' ছবি ছিল একান্নবর্তী পরিবারের গল্প। বিশাল স্টার কাস্ট। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বউয়ের গল্প। হাসি, মজায় যৌথ পরিবারের গল্প। অভিনয়ে বড় ভাই পাহাড়ি সান্যাল-বড় বউ সুনন্দা দেবী, মেজো জীবেন বসু-ভারতী দেবী, সেজ বিকাশ রায়-মঞ্জু দে, ন ভাই অসিতবরণ-সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, ছোট নির্মল কুমার-সবিতা চট্টোপাধ্যায় বসু। এছাড়াও ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। বিকাশ রায় পরিচালিত প্রথম ছবি 'অর্দ্ধাঙ্গিনী' এতটাই সাড়া ফেলে যে এই বাংলা ছবি নিয়ে বিমল রায় হিন্দি ছবি 'পরিবার' বানান। 'পরিবার' হিন্দি ছবিতে বম্বের অভিনেতারা অভিনয় করলেও বাংলা থেকে একমাত্র সবিতা চট্টোপাধ্যায় বসুর কাস্টিং বদলাইনি। সবিতা বাংলা ও হিন্দি দুই ছবিতেই ছিলেন। তবে বাংলা 'অর্দ্ধাঙ্গিনী' সাড়া ফেললেও বক্সঅফিস সাফল্য পায়নি।

'অর্দ্ধাঙ্গিনী' ছবিতে পাঁচ ভাইয়ের বাচ্চাদের রোলে অনেকগুলো ছেলেমেয়ের দরকার ছিল। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় ছেলে গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন 'বিকাশ জ্যাঠা একদিন আমাদের বাড়ি এলেন বাবার সঙ্গে 'অর্দ্ধাঙ্গিনী' ছবি নিয়ে কথা বলতে। ছবিতে অনেক গুলো বাচ্চা দরকার! আমাদের তিন ভাইবোনকে দেখে বিকাশ জ্যাঠা আমাদেরই এই ছবিতে নিলেন। আমি,আমার ভাই পিনাকি,বোন ভুটি বাসবী তখন একদমই ছোট,আমাদের পাশের ভাড়াটিয়ার ছেলে চন্দন, আমাদের এক দিদি বুলি সবাই, 'অর্দ্ধাঙ্গিনী'তে অভিনয় করলাম। আমার প্রথম ছবিতে অভিনয় পরিচালক বিকাশ রায়ের হাত ধরেই। আমরা তখন খুব ছোট কিন্তু কত সহজ করে বিকাশ রায় আমাদের ডিরেকশন দেন। কটা স্টেপ এগোব সেটা উনি মেঝেতে চক দিয়ে গোল্লা কেটে কেটে বলে দিতেন। আমি বিকাশ রায় আর মঞ্জু দের ছেলের রোলে অভিনয় করেছিলাম। একটা সিন ছিল পাহাড়ি সান্যাল আমার জ্যাঠা,তাঁর ছেলের পৈতে। সেই অনুষ্ঠানে আমার কাকা জীবেন বোস সবাইকে লুকিয়ে কাটলেট খাচ্ছেন। আমি দেখে ফেলায় উনি আমাকে বলছেন 'কাউকে বলিসনা তোকে কাটলেট খাওয়াব'। কিন্তু আমি লুকিয়ে গিয়ে সেটা আরেক কাকা অসিতবরণকে বলে দিচ্ছি। তখন জীবেন বোস ধরা পড়ে যাচ্ছেন। এমন মজার দৃশ্যটা করতে পেরেছিলাম বিকাশ জ্যাঠার জন্যেই।আমরা সব বাচ্চারা মিলে সন্ধ্যা মুখার্জির একটা গানে লিপ দিয়েছিলাম 'এই স্বাস্থ্য এই স্বাস্থ্য, চকচকে দেহমন চাস তো, এক মন দুধ রোজ খাস তো'।

'অর্দ্ধাঙ্গিনী'র সাকসেস পার্টিতে আমি গেছিলাম। তখন সন্ধ্যা মুখার্জীকে প্রথম দেখেছিলাম। তবে বিকাশ জ্যাঠা নিজের ছেলেমেয়েদের ফিল্ম লাইনের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেননি। নিজের ছবি কিন্তু নিজের সন্তানদের নেননি। কারণ সবাই খারাপ চোখে দেখতেন ফিল্ম জগতকে। আমার বাবা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিক থেকে মুক্তমনা ছিলেন।'

অথচ বিকাশ রায় পরিচালিত প্রথম ছবি 'অর্দ্ধাঙ্গিনী' একেবারেই হারিয়ে গেছে। ছবিটির প্রিন্ট খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। স্বর্ণযুগের এত তারকার মেলা যে বাংলা ছবি, সেই ছবি আর দেখার সুযোগ নেই। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'অর্ধাঙ্গিনী' করার বহু আগেই বিকাশ রায় একই নামে তাঁর ছবি নির্মাণ করেন। তবে দুটি ছবির প্লট সম্পূর্ণ আলাদা। বিকাশ রায়ের এই ছবি পাওয়া গেলে এখনকার সংসার ভাঙনের কালে একান্নবর্তীর বার্তা পৌঁছত মানুষের মনে।