নারকেল ছাড়াও কাজু বাদাম ও কোকো উৎপাদনেও বিশেষ নজর রয়েছে নির্মলার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির কৃষিজ উৎপাদনে আলাদা করে প্রকল্প ঘোষণা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬ পেশের পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এই বাজেটের অর্থনৈতিক ভাষ্যের ভিতরেই লুকিয়ে রয়েছে একটি রাজনৈতিক ভাষ্য।
শেষ আপডেট: 1 February 2026 14:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিয়রে পাঁচ রাজ্যের ভোট। তাই রাজনৈতিক ধর্ম বজায় রেখেই রবিবার সংসদের বিশেষ অধিবেশনে লোকসভায় পেশ করা বাজেট প্রস্তাব (Union Budget 2026) ভাষণে ভোটমুখী বেশ কিছু ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (FM Nirmala Sitharaman)। নির্দিষ্ট বা স্পষ্ট করে বরাদ্দ প্রস্তাব সম্পর্কে বিস্তারিতে কিছু না বললেও তাঁর ঘোষিত প্রকল্পগুলির মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal), তামিলনাড়ু (Tamil Nadu) ও কেরলের (Kerala) মতো বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলির উন্নয়ন প্রস্তাব। বিশেষত নারকেল উৎপাদন (Coconut)। উপকূলীয় ও বদ্বীপ এলাকার এই রাজ্যগুলি দেশে নারকেল উৎপাদনে প্রথম সারিতে। এছাড়াও ভারত বিশ্বে নারকেল উৎপাদনে প্রথমস্থানে বলে নির্মলা এই উৎপাদনে জোর দিয়ে রাজ্যগুলির অর্থনীতিতে জোয়ার আনার ঘোষণা করেন।
নারকেল ছাড়াও কাজু বাদাম ও কোকো উৎপাদনেও বিশেষ নজর রয়েছে নির্মলার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির কৃষিজ উৎপাদনে আলাদা করে প্রকল্প ঘোষণা রয়েছে। বাজেট মানেই শুধু সংখ্যার খেলা নয়, বাজেট মানে রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন করে আঁচড় কাটা। সংসদে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের নবম কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬ পেশের পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এই বাজেটের অর্থনৈতিক ভাষ্যের ভিতরেই লুকিয়ে রয়েছে একটি রাজনৈতিক ভাষ্য। বিশেষ করে যেসব রাজ্যে চলতি বছর ভোট— পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal), তামিলনাড়ু (Tamil Nadu), কেরল (Kerala) এবং অসম (Assam)—সেই রাজ্যগুলির দিকে নজর দিলে বোঝা যায়, বাজেট কার্যত একটি নির্বাচনী বার্তার নথি।
২০২৫ সালে বিহারে ভোট থাকায় সেই বছরের বাজেটে বিহার (Bihar) ছিল বিশেষ ফোকাসে। তার আগেও ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল, অসম ও পুদুচেরি (Puducherry) নিয়ে ছিল একাধিক ঘোষণা। এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ভোটমুখী রাজ্যগুলিকে ঘিরে সাজানো হয়েছে বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেন্দ্রীয় বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছেন, দেশের নারকেল খাতকে শক্তিশালী করতে একটি বিশেষ ‘কোকোনাট প্রোমোশন স্কিম’ (Coconut Promotion Scheme) চালু করা হবে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হবে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। তার জন্য পুরনো ও কম ফলনশীল গাছ সরিয়ে নতুন, উন্নতমানের চারা রোপণের ওপর জোর দেওয়া হবে, বিশেষ করে প্রধান নারকেল উৎপাদক রাজ্যগুলিতে।
একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী কাজু (Cashew) ও কোকো (Cocoa) খাতের জন্যও একটি লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচির ঘোষণা করেছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কাঁচা কাজু ও নারকেল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে ভারতকে আত্মনির্ভর (Self-reliant) করে তোলা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা (Export Competitiveness) বাড়ানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতীয় কাজু ও কোকোকে বিশ্ববাজারে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড (Global Premium Brand) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের উদ্দেশ্য।
নতুন নীতিতে নারকেলের বিশেষ গুরুত্বকে আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে। ভারতে নারকেল শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ—আঞ্চলিক রান্না, স্বাস্থ্যচর্চা এবং ঘরোয়া ব্যবহারের সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে ভারত বিশ্বের শীর্ষ নারকেল উৎপাদক দেশগুলির অন্যতম। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দেশে প্রায় ১৫.৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন নারকেল উৎপাদিত হয়েছে, মোট চাষের জমি ছিল প্রায় ২৩.৩ লক্ষ হেক্টর। উন্নত সেচ ব্যবস্থা ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতির মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদন বেড়ে প্রায় ১৭.৬ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উৎপাদনের দিক থেকে কর্নাটক (Karnataka) বর্তমানে দেশের শীর্ষে। ২০২৪-২৫ সালে রাজ্যটি প্রায় ৬,১৫১ মিলিয়ন নারকেল উৎপাদন করেছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তামিলনাড়ু (Tamil Nadu), যার উৎপাদন প্রায় ৬,০৯১ মিলিয়ন। এই দুই রাজ্য মিলিয়ে দেশের মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি জোগান দেয়। কেরল (Kerala), অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh) ও তেলেঙ্গানাও (Telangana) গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক রাজ্য। তবে ধারাবাহিক নীতি সহায়তা (Policy Support) এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাষ (Technology-driven Farming)-এর ফলে কর্নাটক কেরলকে পিছনে ফেলে শীর্ষে উঠে এসেছে।
জাতীয় স্তরে ভারতের নারকেল উৎপাদনশীলতা গড়ে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৯,৬৮৭ থেকে ৯,৮৭১টি নারকেল, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম উচ্চ। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিই মূলত এই শিল্পের মেরুদণ্ড। এই খাত সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের জীবিকা জোগায় এবং কয়ার (Coir), নারকেল তেল (Coconut Oil) ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ (Food Processing)-এর মতো সহায়ক শিল্পকে শক্তি জোগায়।
এর পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী ৫০০টি জলাধার ও ‘অমৃত সরোবর’ (Amrit Sarovar)-এর সমন্বিত উন্নয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্য মূল্যশৃঙ্খল (Fisheries Value Chain) শক্তিশালী করা এবং স্টার্ট-আপ (Start-up), মহিলা পরিচালিত গোষ্ঠী (Women-led Groups) ও ফিশ ফার্মার প্রোডিউসার অর্গানাইজেশন (FFPO)-এর মাধ্যমে বাজার সংযোগ (Market Linkage) তৈরি করা।
প্রাণিসম্পদ খাতেও (Animal Husbandry Sector) বড় ঘোষণা এসেছে। এখানে ঋণ-সংযুক্ত ভর্তুকি (Credit-linked Subsidy Programme), গবাদি পশু খামারের আধুনিকীকরণ (Modernisation), দুগ্ধ ও পোলট্রি কেন্দ্রিক সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খল (Integrated Value Chains) এবং লাইভস্টক ফার্মার প্রোডিউসার অর্গানাইজেশন (Livestock FPO) গঠনে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ঘোষণাগুলি শুধু উন্নয়ন নয়, স্পষ্টভাবে শিল্প, কৃষি উৎপাদন ও পরিবহণের দিকে ইঙ্গিত করে। ডানকুনি (Dankuni) থেকে সুরাত (Surat) পর্যন্ত নতুন ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর (Dedicated Freight Corridor) তৈরির প্রস্তাব কার্যত পূর্ব ও পশ্চিম ভারতের শিল্প ক্ষেত্রকে যুক্ত করার কৌশল। একই সঙ্গে দুর্গাপুরকে (Durgapur) কেন্দ্র করে পূর্ব উপকূলীয় শিল্প করিডর (East Coast Industrial Corridor) গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এর রাজনৈতিক অর্থ স্পষ্ট— শিল্পহীনতার অভিযোগে জর্জরিত রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকার উন্নয়নের পতাকা তুলে ধরতে চাইছে।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও ‘পুর্বোদয় রাজ্য’ (Purvodaya States) হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে সামনে এনে পাঁচটি পর্যটন কেন্দ্র এবং চার হাজার ই-বাস (e-bus) চালুর ঘোষণা আসলে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মোড়কে নির্বাচনী বিনিয়োগ। উত্তরবঙ্গ থেকে সুন্দরবন— সব অঞ্চলকেই এতে রাজনৈতিকভাবে ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা রয়েছে।
তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে বাজেটের ভাষ্য আরও কৌশলী। এখানে একদিকে হাইস্পিড রেল করিডর (High Speed Rail Corridor)— চেন্নাই (Chennai) থেকে বেঙ্গালুরু (Bengaluru), চেন্নাই থেকে হায়দরাবাদ (Hyderabad)। অন্যদিকে, তামিলনাড়ু-অন্ধ্রপ্রদেশ সীমানা সংলগ্ন পুলিকাট লেক (Pulicat Lake)-এ বার্ড ওয়াচিং ট্রেল (Birdwatching Trail)। অর্থাৎ পরিকাঠামো এবং পরিবেশ— দুটোকেই একসঙ্গে তুলে ধরা। পাশাপাশি টিয়ার টু ও টিয়ার থ্রি শহরের (Tier 2, Tier 3 cities) পরিকাঠামোর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ, যার মধ্যে মন্দির শহরগুলিও রয়েছে। এটি সরাসরি সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক বার্তা।
কেরলের ক্ষেত্রে মূল ফোকাস দুষ্প্রাপ্য খনিজ সম্পদ (Critical Minerals) এবং পরিবেশ। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুর সঙ্গে কেরলকে এক সারিতে রেখে খনিজ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র তৈরির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কচ্ছপ সংরক্ষণ প্রকল্প (Turtle Nesting Sites) কেরলের পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় উপস্থিতি জোরদার করার চেষ্টা। কেরলে যেখানে কেন্দ্রের রাজনৈতিক জমি দুর্বল, সেখানে উন্নয়নকে হাতিয়ার করেই গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কৌশল স্পষ্ট।
অসমের ক্ষেত্রেও ২০ হাজার কোটি টাকার পরিকাঠামো বরাদ্দ একই রাজনৈতিক সূত্র মেনে চলে। মন্দির শহর (Temple Town) উন্নয়নের মাধ্যমে ধর্মীয় পর্যটন এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে সামনে এনে বিজেপির রাজনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করার পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাজেটে। উত্তর-পূর্বে কেন্দ্রীয় সরকারের দীর্ঘদিনের অবহেলার অভিযোগ ভাঙতেই এই ঘোষণাগুলি কার্যত একটি রাজনৈতিক বিনিয়োগ।
বাজেট তাই শুধু আর্থিক নথি নয়, এটি ২০২৬ সালের রাজ্য নির্বাচনের প্রাক-প্রচারপত্র। সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই রাজনৈতিক ভাষ্যই আসলে সীতারামনের বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। যা নিয়ে বিরোধী দলগুলি এতটুকুও খুশি হয়নি।