দিল্লির শুক্রবারের অনুষ্ঠানে প্রথমবার শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ভাষণ দেবেন (Sheikh Hasina virtual meeting India)।

শেষ আপডেট: 23 January 2026 09:16
শুক্রবার দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লিগ নেত্রী শেখ হাসিনা (Mrs Sheikh Hasina, Ex PM of Bangladesh)।
২০২৪-এর ৫ অগস্ট থেকে দিল্লিতে রয়েছেন আওয়ামী লিগ নেত্রী (Awami league supremo)। দেশ ছাড়ার কয়েক মাস পর থেকেই তিনি ভার্চুয়াল মাধ্যমে দেশবাসী এবং আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন। হোয়াটস অ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং সিগন্যালের মত একাধিক প্লাটফর্মে তিনি নিয়মিত দলের তৃণমূল স্তরে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়া আওয়ামী লিগের ফেসবুক পেজের নিয়মিত অনুষ্ঠান দায়মুক্তি'তে অংশ নেন। তবে কোথাও তিনি ক্যামেরার মুখোমুখি হন না। তাছাড়া দিল্লিতে থাকলেও গত দেড় বছরে তিনি কখনও ভারতের কোনও অনুষ্ঠানে হাজির হননি।
দিল্লির শুক্রবারের অনুষ্ঠানে প্রথমবার শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ভাষণ দেবেন (Sheikh Hasina virtual meeting India)। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা এবং হাসিনার দল আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মীরা চাইছেন নেত্রী এবার ক্যামেরার সামনে হাজির হোন। তবে নিরাপত্তা কারণেই তাঁকে ভিডিওতে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাচ্ছে না বলে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির দাবি। তাদের বক্তব্য জঙ্গি সংগঠনগুলির কাছে ভিডিও অ্যানালিসিস করে বক্তার অবস্থান বের করে ফেলার প্রযুক্তি রয়েছে। যদিও হাসিনা ভিডিওতে আসুন এই আর্জি জানিয়ে সমাজ মাধ্যমে আওয়ামী লিগের তৃণমূল স্তরের নেতা কর্মীরা প্রবল সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
আওয়ামী লিগ নেত্রী শেষ পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে বসে ভাষণ যদি নাও দেন তাহলেও শুক্রবারের অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতিকে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়টি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আর দিন কুড়ি পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোট (Bangladesh Vote) নেওয়া হবে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে সেখানে বিএনপি'র ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি। যদিও প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়েত ইসলামীর সঙ্গে বিএনপি তুমুল লড়াই হবে বলে নানা সূত্রের খবর। এমনকী বড় ধরনের হিংসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। কোন পক্ষই এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ।
তবে ভারত ইতিমধ্যে বার্তা দিয়ে রেখেছে তারা খুশি হবে বিএনপি ক্ষমতায় এলে। জামাতের তুলনায় তারা বিএনপিকে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে। যদিও অতীতে বিএনপি সরকারের সময়ে ভারত বিরোধী, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলিকে মদত দেওয়ার অভিযোগ ছিল সদ্যপ্রয়াত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া (Khaleda Zia, Ex PM of Bangladesh and former BNP chairperson) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে।
সেই খালেদার শেষ যাত্রায় ভারতের প্রতিনিধি হয়ে বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর, তার আগে খালেদার আরোগ্য কামনা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বার্তা এবং বিএনপি নেত্রী প্রয়াত হওয়ার পর শোকবার্তায় নয়া দিল্লি বাংলাদেশের অন্যতম ওই দলটির সঙ্গে করমর্দনের বার্তা দিয়ে রেখেছে। খালেদা পুত্র তারেক রহমান (BNP Chairman Tareq Rahaman) আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি চেয়ারম্যান হওয়ার পর তাঁকে চিঠি পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। যা থেকে অনেকেই মনে করছেন ভারত এবার বাংলাদেশ নিয়ে তাদের সব ডিম বিএনপির ঝুড়িতে রাখতে চলেছে।
অতীতের বিএনপি সহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ ছিল ভারত শুধুমাত্র আওয়ামী লিগের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। নয়া দিল্লির ওই ভূমিকাকেই বলা হচ্ছিল যে তারা সব ডিম আওয়ামী লিগের ঝুড়িতে রেখে বাংলাদেশের বাকি দলগুলিকে উপেক্ষা ও অসম্মান করেছে।
প্রশ্ন হল, ভারত করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেও বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা নয়া দিল্লির প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কিনা। কারণ বিএনপি'র মধ্যে ভারত বিরোধী শক্তি যথেষ্ট সক্রিয়। তাছাড়া ওই দলটির জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তান ও তাদের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআইয়ের প্রভাব রয়েছে। তৃতীয়ত, বিএনপি ভারতের প্রতি নরম মনোভাব নিলে বাংলাদেশে তাদের পায়ের তলার মাটি জামাতসহ কট্টর ইসলামিক দলগুলি দখল নিতে পারে। তারিক রহমানের পক্ষে এই বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না।
ভারতের জন্য আরও একটি বিপদের কারণ হলো আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া। শেখ হাসিনার দল নির্বাচনে না থাকায় বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ কার্যত একটি ভারত বিরোধী মঞ্চে পরিণত হতে চলেছে। নয়া দিল্লির বিদেশ মন্ত্রকের কর্তাদের এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করার জন্য আরও বেশি কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো উচিত ছিল। এই ব্যাপারে ভারতের কূটনৈতিক শিবির রীতিমতো অপরিপক্কতা এবং ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলা চলে। কারণ বিএনপি তথা তারেক রহমানের পক্ষে যে কোনও অবস্থাতেই ভারতের সঙ্গে খুব একটা সুসম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়, দিল্লির বর্তমান শাসকেরা সেই বিষয়টি অতীত অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত করলে ভাল করতেন।
আরও একটি গুরুতর বিষয় ভারতের শীর্ষ মহলের বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল। শেখ হাসিনার সময় নির্বাচনগুলি অবৈধ এবং ভারত সেই নির্বাচনগুলিকে স্বীকৃতি দিয়ে অন্যায় করেছে বলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং বিএনপি সহ একাধিক দলের অভিযোগ। হাসিনা জামানার নির্বাচন গুলির স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় থাকলেও স্পষ্ট করে বলা দরকার বাংলাদেশে কোন নির্বাচনই অবাধ ও শান্তিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ হয়নি। কিন্তু এটাও ঘটনা যে হাসিনা জমানায় জামায়াতে ইসলামী বাদে আর কোনও দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। জামায়াতে ইসলামী আদালতের রায়ে নিষিদ্ধ ছিল। অন্যদিকে বিএনপি সহ বেশ কিছু দল নির্বাচন বয়কট করে। এর বিপরীতে আওয়ামী লিগকে সন্ত্রাস দমন আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। ভারত সরকার যখন আওয়ামী লিগকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বারে বারে বলে এসেছে তখন তারা কী করে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অনুমোদন করতে পারে এ প্রশ্ন ওঠা সঙ্গত এবং নয়া দিল্লির উচিত এই ব্যাপারে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা। বৈধ-অবৈধ ভোটকে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচনকে কোন অবস্থাতেই ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশের পক্ষে বৈধতা দেওয়া হবে প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত।
ধরে নেওয়া যায় ভুল বুঝতে পেরেই নয়া দিল্লির কর্তারা এখন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লিগকে সক্রিয় হতে দিতে চাইছেন। দিল্লির কূটনৈতিক মহলের একাংশ আওয়ামী লিগ নেত্রীর শুক্রবারের কর্মসূচিকে সেই আলোকে দেখছে। নয়া দিল্লির অনুমোদন ছাড়া শেখ হাসিনার পক্ষে দিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া সম্ভব ছিল না।
দিল্লির অনুষ্ঠানটির আয়োজক ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রেস ক্লাবস। দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাব অফ সাউথ এশিয়ার অফিসে সন্ধ্যায় বাংলাদেশের চলতি পরিস্থিতি নিয়ে এক আলোচনা চক্রের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়ার কথা শেখ হাসিনার।
তাৎপর্যপূর্ণ হলো, আমন্ত্রণপত্রে উদ্যোক্তারা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ করেছেন
অনুষ্ঠানটির আমন্ত্রণপত্র বিলি শুরু হতেই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বাংলাদেশের বিদেশ উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার চায় না শেখ হাসিনা ভারতে বসে বিবৃতি দিন, কথা বলুন।
মাসকয়েক আগে দিল্লিতে জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করার কথা ছিল আওয়ামী লিগ নেতাদের। শেষ মুহূর্তে সেই সাংবাদিক সম্মেলন বাতিল করা হয়। পরে জানা যায় দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন এই ব্যাপারে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। যদিও সরকারিভাবে প্রেস কনফারেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও পক্ষই বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
দিল্লির প্রেসক্লাবের সেই প্রস্তাবিত সাংবাদিক বৈঠকের তুলনায় শুক্রবারের অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অনেক বেশি শেখ হাসিনা থাকবেন বলে। মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে বাংলাদেশের একটি ট্রাইবুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিষয়টি জানিয়ে বাংলাদেশ সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফিরিয়ে দিতে ভারত সরকারের কাছে আর্জি জানিয়ে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে খোদ দিল্লিতে কোন অনুষ্ঠানে হাসিনার উপস্থিতি নয়া দিল্লির তরফে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের পাশে থাকার বার্তা বলেই মনে করা হচ্ছে।
দিন পাঁচেক আগে দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টকে নস্যাৎ করে একটি পাল্টা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। আওয়ামী লিগের দু'জন সাবেক মন্ত্রী সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। যদিও দলের তরফে বলা হয় ওই অনুষ্ঠানের আয়োজক আওয়ামী লিগ ছিল না। রাষ্ট্রসংঘের আঞ্চলিক অফিস আছে এমন সব দেশেই তারা ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করছে। দিল্লিতে রাষ্ট্রসংঘের আঞ্চলিক অফিস থাকায় সেখানেও রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়।
শুক্রবারের অনুষ্ঠানে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সেক্রেটারি জেনারেল ইঞ্জিনিয়ার মহম্মদ এ সিদ্দিক, হাসিনা সরকারের সাবেক তিন মন্ত্রী মহম্মদ আলি আরাফাত, একে আব্দুল মোমেন এবং মহিবুল হাসান চৌধুরীর নওফেল ভাষণ দেবেন। অন্যতম বক্তা বাংলাদেশের অভিনেত্রী এবং সমাজকর্মী রোকেয়া প্রাচী এবং ফ্রান্সের কোট দ্য জুর ইউনিভার্সিটি সাম্মানিক ফেলো এবং বাংলাদেশের জগন্নাথ ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রাক্তন ডিন অধ্যাপক এস এম মাসুম বিল্লাহ।
বাংলাদেশে আর মাত্র ২৪ দিনের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে আওয়ামী লিগকে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। নির্বাচনের প্রাক্কালে দিল্লির অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল উপস্থিতির সিদ্ধান্ত ঘিরে কূটনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ভারত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া হাসিনা এই অনুষ্ঠানে হাজির থাকার ব্যাপারে সায় দেননি। আজকের অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে দলের অভিমত তুলে ধরবেন বলে মনে করা হচ্ছে। আওয়ামী লিগ ইতিমধ্যেই ওই নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। শেখ হাসিনা ডাক দিয়েছেন 'নো বোট নো ভোট'। বোট বা নৌকা হল আওয়ামী লিগের নির্বাচনী প্রতীক। দলের সভায় হাসিনা বলেছেন, 'ব্যালটে নেই নৌকা, বুথ থাকবে ফাঁকা।' দলের সমর্থকদের বলেছেন, ভোট বয়কট করতে।
প্রশ্ন হলো মাস ছয়েক আগে আওয়ামী লিগ নেতাদের দিল্লির অনুষ্ঠানে শেষ পর্যন্ত সায় না দেওয়া ভারত সরকার কেন শুক্রবার স্বয়ং শেখ হাসিনাকে বিদেশি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দিতে চলেছে। মাস তিনেক হোলো, শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। এখনও পর্যন্ত 'দ্য ওয়াল'-সহ কুড়িটির বেশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। সব সাক্ষাৎকারেই তাঁর মূল কথা, আওয়ামী লিগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হোক। জনগণ যে দলকে বেছে নেবে তারা সরকার গড়বে। দু'দিন আগে তিনি প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, 'সাহস থাকলে বাংলাদেশের যে কোনও আসনে আমার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন। আমি প্রস্তুত। দেখি মানুষ কাকে বেছে নেন।'
এই বক্তব্য আসলে ভারত সরকারেরও। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ নিয়ে বলে আসছিল যে সেখানে দ্রুত নির্বাচন করে একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা জরুরি। সেই সঙ্গে ভারত বারে বারে বলেছে, নির্বাচন হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তিমূলক। এর অর্থ আওয়ামী লিগকে নিয়েই নির্বাচন হওয়া দরকার। লক্ষণীয় হলো, ভারত এই দাবি যত জোরদার করেছে, বাংলাদেশ সরকার ততই আওয়ামী লিগের উপর দমন পীড়ন বাড়িয়ে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাস দমন আইনে আওয়ামী লিগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না।
কূটনৈতিক দিক থেকে বলা চলে বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত এবং বিএনপি সহ সমস্ত দলের তাতে সায় দেওয়া ভারত সরকারকে উপেক্ষা করার শামিল। মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশের নির্বাচনের দিন কুড়ি আগে শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে ঢাকাকে নয়া দিল্লির পরামর্শ উপেক্ষা করার পাল্টা বার্তা দিতে চাইছে। সে দিক থেকে শুক্রবারে সভা হাসিনাকে নিয়ে ভারত সরকারের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি ভারতে আসার কয়েক মাস পর থেকেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে ভাষণ দিচ্ছেন। গত বছর নভেম্বরের গোড়া থেকে তিনি ই-মেলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিয়ে চলেছেন। এবার তাঁকে খাস দিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের মাঝে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দিয়েছে নয়া দিল্লি।
কিন্তু শেখ হাসিনার জন্য ভারত সরকারের তরফে এটুকুই যথেষ্ট কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। হাসিনা সরকারের পতন এবং বাংলাদেশে অস্থিরতা, ভারত বিরোধিতা যখন চরমে, তখন ভারতে আওয়ামী লিগ ও শেখ হাসিনাকে সক্রিয় রাজনীতি করতে দেওয়া হচ্ছে না। যদিও নানা সূত্রের খবর, দেশ ছেড়ে আসা আওয়ামী লিগের নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সাংসদদের সিংহভাগ ভারতে অবস্থান করছেন।
ভারত সরকার তাদের মুক্তভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে না দিলেও পৃথিবীর বহু দেশে আওয়ামী লিগ সক্রিয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি সহ ইউরোপ, আমেরিকা এবং আরব দুনিয়ার বহু দেশে আওয়ামী লিগের শাখা রয়েছে। শাখা আছে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশে। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলিতে আওয়ামী লিগ নিয়মিত তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকী লন্ডনে এবং নিউইয়র্কে প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসকে ঘিরে বিক্ষোভ করে আওয়ামী লিগ। এই ধরনের কোনও ঘটনাতেই ঘটনাতেই বাংলাদেশ সরকার ওইসব দেশের কাছে জোরালো আপত্তি জানায়নি। অথচ শেখ হাসিনা সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাষণ দিলেও ঢাকার তরফে জোরালো আপত্তি তোলা হচ্ছে। এমনকী, আওয়ামী লিগ নেতারা কোথাও জড়ো হয়ে ঘরোয়া বৈঠক করলেও আপত্তি তোলে ঢাকা।
প্রশ্ন হল, বিএনপি নেতা তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর সময় যদি নিয়মিত রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন তাহলে শেখ হাসিনা কেন ভারতে বসে সেই একই কাজ করতে পারবেন না? গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানদণ্ডে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে কোন ফারাক করার অবকাশ নেই। তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বাংলাদেশে জনসভা এবং দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দিনের পর দিন বৈঠক করেছেন। লন্ডনে থাকাকালীনই তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ থাকায় বস্তুত লন্ডনে বসেই তারেক রহমান দল পরিচালনা করছিলেন।
সেটা তিনি করেছিলেন বলেই খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও বিএনপি দল হিসাবে অটুট থেকেছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং প্রাসঙ্গিক থাকতে পেরেছে। শেষ বিচারে তারা হাসিনা সরকারের পতন ঘটানোয় ভূমিকা নিয়েছে গণঅদ্যুত্থানকে সমর্থন জানিয়ে।
বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবেই আওয়ামী লিগের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও কর্মসূচির সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জড়িয়ে আছে। আওয়ামী লিগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক। সেই যুদ্ধের ময়দানে মিশে আছে ভারতীয় সেনার রক্ত এবং এ দেশের কোটি কোটি মানুষের সমর্থন, সহযোগিতা। আওয়ামী লিগ এবং শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং অপশাসনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগগুলিকে বিবেচনায় রেখেও বলতে হয় দলটির রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের কারণে ভারতের ততদিন তাদের পাশে থাকা জরুরি যতদিন না বাংলাদেশে আইনের শাসন পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে। আওয়ামী লিগ নেতাদেরও মনে রাখা দরকার তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এবং দায়ের হওয়া প্রকৃত অপরাধ এবং ন্যায্য অভিযোগ গুলির বিচারের মুখোমুখি হওয়া তাদের নৈতিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক কর্তব্য। শেখ হাসিনা একাধিক ভাষণে বলেছেন, পরিস্থিতি অনুকূল হলে তিনি দেশে ফিরে যেতে চান। আমার মনে হয় আওয়ামী লিগের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়া বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থার প্রত্যাবর্তন কঠিন। নির্বাচন যদি ভালই ভালই হয় তাহলে ভোটের পর বিএনপি এবং তাদের প্রতিপক্ষ দলগুলির মধ্যে আওয়ামী লিগকে রাজনীতির অঙ্গন থেকে দূরে রাখার প্রশ্নে সমঝোতা হওয়া অসম্ভব নয। তাতে অসম্ভব নয় বাংলাদেশে অস্থিরতা জনযুদ্ধের রূপ নেওয়ার। যেমন অসম্ভব নয় ভারতের পূর্ব প্রান্তে ফের একটি পাকিস্তান গড়ে ওঠার। ফলে বিপদটা যেমন আওয়ামী লিগের, ভারতেরও। এই পরিস্থিতিতে উপমহাদেশের রাজনীতিতে কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষায় শেখ হাসিনার প্রকাশ্য ও সক্রিয় রাজনীতি এবং আওয়ামী লিগকে প্রাসঙ্গিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।