২০২৪ এর ৫ অগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ প্রচার করে আসছে 'শেখ হাসিনা বীরের বেশে, আসবে ফিরে বাংলাদেশে।

শেষ আপডেট: 22 January 2026 19:17
'মায়ের বয়স হয়েছে। দলের শীর্ষ পদ থেকে তিনি সরে যাবেন। আগামী দিনে দল সরকার গড়লেও প্রধানমন্ত্রী হবেন অন্য কেউ।'
শেখ হাসিনার (Sheikh Hasina) পুত্র সজীব ওয়াজেব জয়ের (Sajeeb Wazed) এমন মন্তব্য ঘিরে বাংলাদেশে আওয়ামী (Bangladesh Awami Leauge) সব স্তরে তুমুল জল্পনা শুরু হয়েছে। সমাজ মাধ্যমে অনেকেই হাসিনা পুত্রের মন্তব্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। কিছু কিছু প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লিগ (Awami Leauge) নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
সাক্ষাৎকারে জয় যা বলেছেন তার সঙ্গে আওয়ামী লিগের (Awami Leauge) দলীয় অবস্থানের মিল নেই। ২০২৪ এর ৫ অগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ প্রচার করে আসছে 'শেখ হাসিনা বীরের বেশে, আসবে ফিরে বাংলাদেশে।' হাসিনা নিজেও নিয়মিত দলীয় সভায় বলছেন, আমি দেশে ফিরে যাব। তারপর আওয়ামী লিগের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনকারীদের বিচার করব। হাসিনা আরও বলছেন, '৫ অগস্ট যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তাতে তাঁর বেঁচে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু আল্লাহ নিশ্চয়ই তাঁকে দিয়ে কোন বড় কাজ করাবেন বলে ওই বিপদেও রক্ষা করেছেন।' হাসিনা বলেছেন ওই দিন গণভবন থেকে বের হতে মিনিট কুড়ি দেরি হলে তাঁর এবং বোন রেহানার মৃত্যু অনিবার্য ছিল।
শুধু তাই নয়, দিন চারেক আগে দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বিগত সরকারের বিদেশ মন্ত্রী হাসান মাহমুদ এবং শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল দাবি করেন খুব শিগগিরই তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে ফিরে যাবেন। আগামীকাল শুক্রবার দিল্লিতেই একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা শেখ হাসিনার। সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন সন্ধিক্ষণে সজীব ওয়াজেদ জয় আওয়ামী লিগের সভাপতি পদে শেখ হাসিনার ইনিং সমাপ্তির ইঙ্গিত দেওয়ায় দলের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং তৃণমূল স্তরে জল্পনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লিগের প্রতিপক্ষ দলগুলিও এই ব্যাপারে হাসিনার দলের অন্দরমহলের খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। এই ব্যাপারে অস্বস্তি এতটাই যে বহু নেতা প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি হননি। কারণ সজীব ওয়াজেদ জয় আজ হোক বা কাল আওয়ামী লিগের নেতৃত্বে আসতে পারেন সে ব্যাপারে নেতাদের মধ্যে কোন সংশয় নেই। যদিও জয় এবং হাসিনা কেউই পরবর্তী সভাপতি কি হবেন সে বিষয়ে কোন আভাস দেননি। দুজনেই বলেছেন এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার দল নেবে। যদিও নেতারা জানেন এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন স্বয়ং শেখ হাসিনা।
তবে সজীব ওয়াজের জয়ের সাক্ষাৎকার নিয়ে দলের অন্তরে বিভ্রান্তি এবং জল্পনা শুরু হওয়ায় আওয়ামী লিগ হাসিনা পুত্রের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেছে। সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বক্তব্য, সজীব ওয়াজে জয়ের সাক্ষাৎকারের একাংশ শুনে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না যে তিনি কী বলতে চেয়েছেন। তাঁর পুরো সাক্ষাৎকারটি শুনলে বোঝা যাবে কোন প্রেক্ষাপটে তিনি নেতৃত্ব বদলের কথা বলেছেন। নওফেলের কথায়, স্বয়ং শেখ হাসিনা একাধিকবার দলীয় সভায় বলেছেন তিনি আর সভাপতি থাকতে চান না। কিন্তু দল তাঁকে অব্যাহতি দেয়নি পার্টির প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রেখে। সজীব ওয়াজের জয় তার মায়ের কথাই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন। সেই সঙ্গে নওফেল হাসিনার দলীয় সভাপতি পদ থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনাও এক প্রকার নস্যাৎ করেছেন।
আওয়ামী লিগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিগত কয়েক মাস যাবত গণমাধ্যমের সামনে আসছেন চট্টগ্রামের এই সাবেক সাংসদ তথা হাসিনা সরকারের শিক্ষামন্ত্রী। শব্দ চয়নে সংযত কিন্তু যুক্তিপূর্ণ ধারালো ভাষণে পটু এই নবীর নেতা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকারের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই প্রসঙ্গে তিনি বিএনপি'র সদ্যপ্রয়াত নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনেছেন। নওফেল বলেন, খালেদা জিয়া বহুবছর অসুস্থ ছিলেন। সক্রিয়ভাবে দলের কোন কাজে তিনি অংশ নিতে পারছিলেন না। কিন্তু বিএনপি তাঁকে পার্টির চেয়ারম্যানের পর থেকে কখনও অব্যাহতি দেয়নি। খালেদা জিয়া আমৃত্যু দলের চেয়ারম্যান ছিলেন। সেখানে শেখ হাসিনা সম্পূর্ণ সুস্থ সবল এবং পাঁচ অগস্ট (২০২৪) তাঁকে যে হত্যা করতে পারেনি এবং তিনি নিরাপদে আছেন এটাই আওয়ামী লীগের কোটি কোটি কর্মী সমর্থকের কাছে সবচেয়ে আনন্দদায়ক খবর।
নওফেলের বক্তব্য সব দলেই কিছু পথ থাকে যেগুলির বিষয়ে ব্যক্তির ইচ্ছার চেয়ে দলের স্বার্থকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা নিজের ইচ্ছায় আওয়ামী লিগের সভাপতি পদে বসে নেই। দল মনে করছে তাঁর কোন বিকল্প নেই। তিনি দলের ইচ্ছায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সেই সঙ্গে নওফেল বলেছেন, সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় যে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন তাতে তার নেতৃত্বের গুণাবলী স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি আগামী দিনের স্বাভাবিক নেতা এ নিয়ে কোন সংশয় নেই।
এই প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তথা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন। তাঁর মতে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লিগের সব স্তরের নেতাকর্মী উজ্জীবিত। কামালের কথায়, সমাজ মাধ্যমে 'মুজিব থেকে সজীব' বলে দলের তৃণমূল স্তরের নেতা কর্মীরা যে প্রচার শুরু করেছেন তাতেই স্পষ্ট সজীব ওয়াজেব জয় নেতা হিসেবে তাদের হৃদয় জয় করতে পেরেছেন। আওয়ামী লিগের এই নেতা সেই সঙ্গেই যোগ করেন, দলে শেখ হাসিনা হলেন আস্থার ঠিকানা। বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী সময়ে অনেক জনপ্রিয় নেতা আওয়ামী লিগের শীর্ষ পদে বসেছেন। কিন্তু তাঁরা দলকে অটুট রাখতে পারেননি। সেই কারণেই শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থানকালে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। তিনি দেশে ফিরে দলকে সংগঠিত করেন, গোষ্ঠী বাজি মুক্ত করেন এবং একাধিকবার পার্টি সরকার গঠন করেছে। কামাল হোসেনের কথায়, শেখ হাসিনা যেদিন সভাপতি পথ ছেড়ে দেবেন সেদিন কে ওই পদে বসবেন তা আগে তিনি ঠিক করে দেবেন। সেই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, শেখ পরিবারেরই কেউ সভাপতি হবেন এ নিয়েও কোন সন্দেহ নেই। তাঁর কথায়, শেখ পরিবারের বাইরের কেউ শীর্ষ পদে বসলে দল অটুট রাখা কঠিন হবে। এই ব্যাপারে দলের কোনও স্তরেই কোন দ্বিমত নেই।
তিনি আরও বলেন, শুধু আওয়ামী লিগের নেতাকর্মীরাই নন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ মনে করেন শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনা। তিনি দেশের ঐক্য সংহতি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা রক্ষা করতে পারেন। ফলে তাঁর বিকল্প সন্ধানের প্রশ্ন ওঠেনা।
প্রসঙ্গত জয়ের দাদু তথা শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান যিনি কিনা আওয়ামী লিগের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের একজন, তিনি দলের সভাপতি হয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন তিনি। তিনি শীর্ষ নেতা থাকাকালে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করে। শেখ মুজিবুরের পর দলের সভাপতি হন আবুল হাসনাত মোঃ কামরুজ্জামান। তিনি মাত্র এক বছর দলীয় সভাপতি পদে ছিলেন। এরপর দু'বছর দল এতটাই ছন্নছাড়া ছিল যে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই দলে সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। ১৯৭৭ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তাহাজ উদ্দিন এর পত্নী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন আওয়ামী লিগের ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। পরের বছর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন আব্দুল মালেক উকিল। ওই সময় দলে বড় ধরনের বিভাজন দেখা দিলে ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লিগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৩। সেই থেকে ৪৫ বছর তিনি আওয়ামী লিগের সভাপতি পদে রয়েছেন।
কামাল হোসেনের কথায়, 'সজীব ওয়াজেদ জয় অন্তরালে বহুদিন ধরে দলের হয়ে কাজ করছেন। ফলে আওয়ামী লিগের তার অবদানকে বাইরে থেকে দেখে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সেই ২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে তিনি পার্টির হয়ে ঘাম ঝরিয়ে চলেছেন। আবার হাসিনা সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা হিসেবে তিনি দেশের সেবা করেছেন বহু বছর। হোলির দল এবং প্রশাসন দুই ব্যাপারে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।'
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো সজীব ওয়াজেদ জয় আওয়ামী লিগের পরবর্তী সভাপতি হতে পারেন বলে জল্পনা শুরু হতেই তাঁর বোন সাইমা ওয়াজে পুতুলের নামও দলের তৃণমূল স্তরে নেতাকর্মীদের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে। ঠিক যেমনটি ভারতে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নিয়ে হয়েছিল। আওয়ামী লিগের অনেক নেতাকর্মী সমাজমাধ্যমে শেখ হাসিনার প্রতি আর্জি জানিয়েছেন, তিনি যেন কন্যা সায়মা ওয়াজে পুতুলকে দলের কাজে আরো বেশি করে নিয়োজিত হতে বলেন। কেউ কেউ এখনই পুতুলকে আওয়ামী লিগের 'সেকেন্ড ইন কমান্ড' করারও পক্ষপাতী। এই প্রসঙ্গে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে কামাল হোসেন বলেছেন, 'আমরা মনে করি শেখ হাসিনা আওয়ামী লিগে আস্থার ঠিকানা। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন তার দলের মঙ্গলের জন্য নেবেন এবং সেটাই চূড়ান্ত।'