গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক ছাড়লে মুখগহ্বরের ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, তবে পুরোপুরি শূন্যে নামে না।

তামাক ছাড়লেই কম ক্যানসারের ঝুঁকি!
শেষ আপডেট: 25 February 2026 15:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধূমপান বা যে কোনও রকম তামাক চিবোনোর ফলে তৈরি হওয়া ক্যানসারের ঝুঁকি কি অভ্যাস ছেড়ে দিলে সত্যিই কমে? বহুদিনের এই প্রশ্নের উত্তর মিলল ভারতীয়দের নিয়ে করা এক দীর্ঘ গবেষণায়। সমীক্ষা বলছে, তামাক ত্যাগ করলে ওরাল ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, যদিও তা কখনও সম্পূর্ণ শূন্যে নামে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ১০ বছর আগে ধূমপান ছেড়েছেন, তাঁদের মুখগহ্বরের ক্যানসারের ঝুঁকি বর্তমান ধূমপায়ীদের তুলনায় প্রায় ৬১ শতাংশ কমেছে। একইভাবে, যাঁরা তামাক চিবোনোর অভ্যাস ছেড়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এক দশক পরে ঝুঁকি প্রায় ৪২ শতাংশ কমে গেছে।
এই গবেষণাটি ভারতীয় জনসংখ্যার মধ্যে টোব্যাকো ছাড়ার যে প্রভাব, তা নিয়ে প্রথম এত বড় মাপের এক বিশ্লেষণ বলেই দাবি করছেন চিকিৎসকরা।
সারা বিশ্বে ওরাল ক্যানসারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগীই রয়েছেন ভারতে— যা বিশ্বের সর্বোচ্চ রোগীর দেশ হিসেবে তকমা দিয়েছে ভারতকে। এ দেশে পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় এমন প্রধান তিন ক্যানসারের মধ্যে এটি একটি। মহিলাদের মধ্যেও এর প্রকোপ উল্লেখযোগ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুখগহ্বরের ক্যানসার ধরা পড়ে প্রায় শেষ পর্যায়ে, যার ফলে মৃত্যুহারও তুলনামূলকভাবে বেশি।
তথ্য বলছে, প্রতি বছর ভারতে গড়ে প্রায় ১.৪ লক্ষ নতুন ওরাল ক্যানসারের রোগী শনাক্ত হন।
গবেষণায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এই ক্যানসারের প্রধান ঝুঁকির কারণগুলির মধ্যে রয়েছে—
ধূমপান
ধোঁয়াবিহীন তামাক, যেমন গুটখা, খৈনি, জর্দা
মদ্যপান
সুপারি চিবোনো
খারাপ ওরাল হেল্থ
গবেষকরা জানিয়েছেন, সব ধরনের তামাকই ক্ষতিকর। তবে তামাক ত্যাগ করলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। যদিও তা কখনও পুরোপুরি শূন্যে নামে না। তাই তামাক সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশ্যালিটি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট শুভদীপ চক্রবর্তী বুঝিয়ে বললেন, সবার সাধারণ ধারণা, সিগারেট খেলে শুধু ফুসফুসে ক্যানসার হয়। তা নয়। সিগারেট খেলে ওরাল ক্যানসার থেকে শুরু করে গলার ক্যানসার, চেস্টের ক্যানসার, প্যানক্রিয়াসের ক্যানসার এমনকি রেক্টাল ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। আর যদি ধরেও নিই যে ক্যানসার হল না, তাহলে অসংখ্য ক্রনিক ডিজিজ হতে পারে। ইনফার্টিলিটি, স্ট্রোক, রক্তচাপ, হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া হয়।
তাঁর ব্যাখ্যা, 'স্মোকিং তিন রকমের। অ্যাকটিভ আর প্যাসিভ আমরা জানি। নিজে খাওয়া, আর অন্য কেউ খেলে তার সামনে থাকা। প্যাসিভ স্মোকারের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ২০ শতাংশ বেশি। এর পরেও আরও একটা ক্ষতি আছে, থার্ড হ্যান্ড স্মোকিং। কোনও একটা ঘরে কেউ সিগারেট খেল, সেখান থেকে বেরিয়ে চলে গেল, পরে সেই রুমে যে গেল বা সাফ করল, সেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।'
ডক্টর চক্রবর্তী বলেন, একটা স্টাডি বলছে, এরকম ক্ষতিকর পার্টিকেলগুলো ৬ মাস পর্যন্ত থেকে যায়। স্মোকারদের মধ্যে প্রবণতা থাকে, বাচ্চা আছে হয়তো বাড়িতে, তার সামনে না করে অন্য ঘরে করছে। কিন্তু ক্ষতি কিন্তু হচ্ছে বাচ্চা ওই রুমে বা বারান্দায় গেলে। পার্টিকেলগুলো ওর ক্ষতি করছে। আপনি আপনার অজান্তে ক্যানসারের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। তাই কোনওভাবেই তামাক গ্রহণ করবেন না।
তাঁর কথায়, 'তামাকের (Tobacco) সেফ লেভেল বলে কিছু নেই। এমন কোনও অঙ্ক নেই, কতটা খেলে হবে বা কতটায় হবে না। ওর তো এত খেয়ে হয়নি, আমার কম খেয়েও হল কেন-- এরকম কোনও হিসেব নেই। তামাকে মোট ৭২টা কার্সিনোজেনিক উপাদান আছে, যা ক্যানসারের কারণ। এটা কার কতটা ক্ষতি করবে সেটার মাপকাঠি ঠিক করা মুশকিল।'
উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলেন, 'আমার এক পেশেন্ট ২৭ বছর বয়সে এসেছিল জিভের ক্যানসার নিয়ে। সে স্মোক করত না। কোনও নেশাও ছিল না। তবে তদন্ত করে বেরোল, ১৮ বছর বয়সে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছিল, সেই হতাশা কাটাতে পানমশলা, গুটখা খেয়েছিল। কয়েক মাসের জন্য। তার পরে সে কাটিয়ে উঠেছিল এই নেশা। কিন্তু তার প্রভাব রয়ে গেছে এত বছর ধরে। এত দিন পরে ক্যানসার হল, স্টেজ ওয়ান ছিল যদিও, অপারেশন করে সফল হলাম আমরা। কিন্তু তার পরেও ফের ফিরে আসে ক্যানসার। ফলে আবার অপারেশন হয়। এভাবে মোট ৫ বার অপারেশন হয়। কেমো, রেডিয়েশন সব চলে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি ছেলেটিকে। ওই কয়েক মাসের চরম ফল ভুগতে হল এত অল্প বয়সেই।'
তাঁর কথায়, 'আমি বলতে চাই, মুখের ক্যানসার নিয়ে সতর্ক থাকুন, আর এটা এড়াতে তামাক এড়িয়ে চলুন। কারণ টোব্যাকোর সবটাই ক্ষতি। কোনও একটিও লাভ নেই। এটা বন্ধ করুন। অনেকের ক্ষেত্রে এমনও দেখি, ক্যানসার ধরা পড়লে, অপারেশন হওয়ার আগে আরও বেশি করে খেয়ে নেন। আর তো খেতে পারবেন না, এই ভেবে। কিন্তু এর ফলে অপারেশনের প্রভাব কিন্তু খারাপ হয়। থেরাপির সাইড এফেক্ট বেড়ে যায়। তাই কোনও কারণেই খাবেন না।'
এই পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণাটি দেশের একাধিক কেন্দ্রে পরিচালিত হয়। প্রায় ৪,৬০০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২,৩০০ জন ছিলেন মুখের ভিতরের অংশের (বুকাল মিউকোসা) ক্যানসারে আক্রান্ত।
অংশগ্রহণকারীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল—
১. ধূমপায়ী বা তামাক চিবোনো ব্যক্তি
২. যাঁরা কখনও তামাক ব্যবহার করেননি
৩. যাঁরা অন্তত এক বছর আগে তামাক ত্যাগ করেছেন
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যাঁরা অন্তত ১০ বছর আগে তামাক চিবানো ছেড়েছেন, তাঁদের ঝুঁকি কমলেও, কখনও তামাক ব্যবহার না করা ব্যক্তিদের তুলনায় এখনও প্রায় ১২.৫ গুণ বেশি ঝুঁকি রয়ে গেছে।
অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল— যাঁরা সুপারি ও তামাক একসঙ্গে ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তামাক ব্যবহারকারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি ঝুঁকি দেখা গেছে।
গবেষণার সঙ্গে যোগ করা হয়েছিল নেশা ছাড়ানোর পরিষেবাও। সেখানে বছরে ২ লক্ষের বেশি ফোন আসে। কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক ভাবে পদক্ষেপ করা সম্ভব হয়।
তাঁদের মধ্যে আবার ২৫ শতাংশ নিয়মিতভাবে প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করেন। অর্থাৎ তামাক ত্যাগের ইচ্ছা থাকলেও কার্যকরভাবে ছাড়ার ক্ষেত্রে এখনও বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
গবেষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তামাক ছাড়লে ঝুঁকি কমে, কিন্তু তা কখনও পুরোপুরি অদৃশ্য হয় না। অতএব, ঝুঁকি না রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল, তামাক ব্যবহার না করা এবং শুরু না করা।