যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রাচীন বা আগের প্রজন্মের সঙ্গে অতি আধুনিকতার বিলাসে অভ্যাসে অভ্যস্ত নয়ের দশকের শেষ থেকে ২০০০ সালের গোড়ার দিকে পৃথিবীর আলো দেখা প্রজন্মের ঐকান্তিক ইচ্ছাই হচ্ছে জীবন ক্ষণস্থায়ী। এখন আছে তো এখন নেই।

মাথার উপর ছাদ নেই, পকেটে আইফোন, রাস্তায় পার্ক করা গাড়ি।
শেষ আপডেট: 12 July 2025 12:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাথার উপর ছাদ নেই। কিন্তু, পকেটে আইফোন আছে। ভাড়াবাড়িতে ট্যাঁকের কড়ি খসিয়ে পড়ে থাকা। কিন্তু, রাস্তার ধারে পার্ক করা বাইক বা গাড়ি আছে। গ্রামের পুরনো পৈতৃক বাড়ি বেচে দিয়ে শহরে এসে ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকলেও সেখানেই এসি রয়েছে। বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির সাফল্য বা দুর্ভাবনা যাই হোক না কেন, এটাই আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনকে উপভোগ করার পদ্ধতি।
যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রাচীন বা আগের প্রজন্মের সঙ্গে অতি আধুনিকতার বিলাসে অভ্যাসে অভ্যস্ত নয়ের দশকের শেষ থেকে ২০০০ সালের গোড়ার দিকে পৃথিবীর আলো দেখা প্রজন্মের ঐকান্তিক ইচ্ছাই হচ্ছে জীবন ক্ষণস্থায়ী। এখন আছে তো এখন নেই। তাই যেটুকু সময় হাতে আছে, গতিময় এই জীবনের দুপাশে ছড়িয়ে থাকা যাবতীয় সুখ, বিলাস, আরাম, প্রমোদ উপভোগ করে নাও।
সেখানে বিশাল সুদ দিয়ে আইফোন কিনলেও আজীবন ঋণের জালে জড়িয়ে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা বোকামির লক্ষণ। আর এই মানসিকতার জন্যই সহজ কিস্তিতে ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, পার্সোনাল লোনের একাধিক প্রকল্পে ফেঁসে যাচ্ছে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। ২ বছর থেকে ৫ বছরের মধ্যে অল্প অল্প করে ধার শোধ হয়ে গেলেও যে প্রচুর পরিমাণে সুদের ছুরিতে রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে, তাতেও কুছ পরোয়া নেই এই প্রজন্মের।
একটা সময় ছিল, নিজের জমি, নিজের ঘরের স্বপ্ন দেখত মানুষ। আজীবনের কড়ি বাঁচিয়ে, গয়নাগাটি বিক্রি করে একটা জমি কিনে বাড়ি তৈরি করত। পরে প্রমোটিংয়ের যুগে পৈতৃক পুরনো বাড়ি বা জমি ডেভেলপারের হাতে তুলে দিয়ে ফ্ল্যাট নিয়ে বসে থাকত। যখন ব্যাঙ্ক সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গৃহঋণ প্রকল্প শুরু করল, তখন তো ফ্ল্যাট বা বাড়ি তৈরির হিড়িক পড়ে গেল।

কিন্তু, এই যুগের ছেলেমেয়েদের উপলব্ধি হল, জীবনের পুরো সঞ্চয় এভাবে একটি জায়গায় কেন বিনিয়োগ করবে? সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা বলছে, একেবারে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ভোগবিলাসী জীবনের কাছে একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ি একেবারেই তুচ্ছ। বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত ঘরের তরুণ প্রজন্মের বক্তব্য হচ্ছে, ২০-২৫ বছরে গৃহঋণের সুদ-আসল মিলিয়ে যত খরচ পড়বে, তাতে অন্তত নিজের জীবনে জগতের সমস্ত বিলাস উপভোগ করা যেতে পারে। যেভাবেই জীবন কাটুক না কেন, একটি বাড়ি-ফ্ল্যাটের চেয়ে অনেক গুণ কম খরচ পড়বে।
আর এই সুখের ইঁদুর দৌড়ে যেতে গিয়ে একাধিক অদৃশ্য ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা। সরকারি স্থায়ী চাকরির অভাবে বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই এখন উচ্চশিক্ষায় না গিয়ে সামান্য মূল্যের হলেও হাতের কাছে যা চাকরি পাচ্ছে তাতেই ঢুকে পড়ছে। তখনই তার মধ্যে স্বয়ম্ভর হওয়ার আত্মগরিমা চলে আসে, বলছেন মনস্তত্ত্ববিদরা।
তারা হামেশাই ঋণের খপ্পরে পড়ে যাচ্ছে জীবনশৈলীর মান ধরে রাখতে। ছোট ছোট স্বাদ-আহ্লাদ থেকে বড় বড় সুখের হাতছানিতে তারা ঋণের ভুবনজোড়া ফাঁদে পা দিচ্ছে। আইফোন কিংবা খুব দামি অ্যান্ড্রয়েড কেনা থেকে বিদেশ ভ্রমণও এই শখ-আহ্লাদের মধ্যে রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন। এক বিশেষজ্ঞের বক্তব্য উদ্ধৃত করে সমীক্ষা বলছে, মধ্যবিত্তদের অন্তত ৫৫ শতাংশ মানুষ ব্যাঙ্ক লোন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। কিন্তু, তা বাড়ি কেনা বা তৈরি করার জন্য নয়।
এই ঋণের অধিকাংশ টাকাই খরচ হচ্ছে প্রধানত জীবনে সুখ-বিলাস উপভোগ করার জন্য। দামি মোবাইল, বাইক কেনা বা বদল, নতুন গাড়ি কেনা অথবা পুরনোটি বেচে ফের গাড়ি কেনার জন্য। মধ্যবিত্ত পরিবারে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সুখ ও আরামের আনন্দ উপভোগ করতে তাদের বিভিন্ন ধরনের শখ মেটাতে আইফোন, বাইক, গাড়ি কিংবা অন্যান্য মহার্ঘ্য সামগ্রী কিনছে ঋণ নিয়ে। কেননা, এখন প্রায় প্রতিটি ঋণেরই শর্তাবলি খুবই সহজ। কিন্তু, এই আপাত সহজ কিস্তির ফাঁদেই লুকিয়ে রয়েছে জটিলতম অঙ্ক।
পকেটে একটি টাকা না থাকলেও চলবে। জিরো ডাউন পেমেন্টেও দামি জিনিস কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। দোকানেই সেই ব্যবস্থা রয়েছে। আর ক্রেডিট কার্ড তো এই কাজের সবথেকে উপযোগী অস্ত্র। এই কারণেই এদেশে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার সবথেকে বেশি বেড়ে গিয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে ক্রেডিট কার্ডের খরচা ১৩ গুণ বেড়ে গিয়েছে। আগে যা ১.২ লক্ষ কোটি টাকা, এখন তা হয়েছে ১৫.৬ লক্ষ কোটি টাকা।
পার্সোনাল ফিনান্স বিশেষজ্ঞদের কথায়, ভারতে গার্হস্থ্য ঋণের পরিমাণ দ্রুতহারে বাড়ছে। অথচ, এই ঋণের মাধ্যমে কোনও সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে না। পুরোটাই বাজার গিলে খাচ্ছে। বিজনেস টুডে নামে একটি সংবাদমাধ্যমকে অর্থ বিশেষজ্ঞ প্রাঞ্জল কামরা বলেন, ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ গড়ে ২৩ শতাংশ বেড়েছে। আর এই বৃদ্ধির হার মাত্র ২ বছরের মধ্যে হয়েছে। আর এই ঋণের অর্ধেকের বেশিই খরচ হয়েছে ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, কোভিড পূর্ববর্তী (আর্থিক বছর ০৯-১৯) বছরগুলিতে ক্রেডিট কার্ড থেকে ঋণ সংগ্রহ হয়েছে ১২.১ শতাংশ, ব্যক্তিগত ঋণ ১৫.১, গাড়ি ঋণ ১৬.৫ ও গৃহঋণ ছিল ১৯.০ শতাংশ। অথচ কোভিড পরবর্তী (অর্থবছর ১৯-২৪) বছরগুলিতে সেগুলিই যথাক্রমে ২১.০ শতাংশ, ১৮.২ শতাংশ, ১৪.৮ এবং ১৫.৫ শতাংশ হয়েছে। প্রাঞ্জল কামরা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এর মূল কারণই হল মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই প্রজন্ম চায় তাৎক্ষণিক সুখ। যা আগের প্রজন্মের ভাবনাচিন্তার চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত। সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াও ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর বিপদ নিয়ে সতর্ক করেছে। সাধারণ মানুষ ঋণের ফাঁদে জর্জরিত হয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। মাসের প্রথম তারিখেই স্যালারি থেকে কেটে যাচ্ছে কিস্তির টাকা। ফলে বাকি মাস কীভাবে চলবে তা নিয়ে হিমশিম খেতে হতে হচ্ছে সদ্য বিবাহিত দম্পতিদের।
সমীক্ষায় এও দেখা গিয়েছে, বিয়েতে জৌলুস ও ধুমধাম এবং বলিউড স্টাইলের বিয়ে করতে গিয়েও বহু যুবক-যুবতী বিশাল ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। অগ্নিসাক্ষী করে সাতপাকে বাঁধা পড়ার মতো দিব্য অনুষ্ঠানের আগে থেকে এখন প্রিওয়েডিং আউটডোর ফটো শ্যুট, মেহেন্দি, সঙ্গীত, অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া, খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন ও দূর প্রবাসে হানিমুন করার ক্ষণিকের সুখে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখ-কষ্টকে ডেকে আনছে এ যুগের মধ্যবিত্ত প্রজন্ম।