বৈঠকের মূল লক্ষ্য, সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারতের উপর তার কী প্রভাব পড়তে পারে, তা মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা।

পশ্চিম এশিয়া সংঘাত ভারতের ইন্টারনেট পরিষেবাকেও প্রভাবিত করতে পারে
শেষ আপডেট: 27 March 2026 13:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিম এশিয়ায় বাড়তে থাকা সংঘাত ভারতের ইন্টারনেট পরিষেবাকেও প্রভাবিত করতে পারে, এই আশঙ্কায় টেলিকম সংস্থাগুলিকে সতর্ক করল কেন্দ্র (India internet disruption subsea cables)। সমুদ্রতলের কেবল পরিকাঠামোয় সম্ভাব্য ঝুঁকি খতিয়ে দেখে বিকল্প ব্যবস্থা (DoT telecom contingency plan) তৈরি করতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ইকোনমিক টাইমস।
এই প্রেক্ষিতে টেলিমকমিউনিকেশন দফতর (DoT) টেলিকম সংস্থা ও সাবসি কেবল অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। মূল লক্ষ্য, সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত (West Asia war internet risk India) হলে ভারতের উপর তার কী প্রভাব পড়তে পারে, তা মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা।
বিশেষ করে ইরানের তরফে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা। তাঁদের মতে, হরমুজ প্রণালী ভারতের পশ্চিমমুখী ডেটা ট্রাফিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রুট দিয়েই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ডেটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে যায়।
যদিও বিকল্প হিসেবে সিঙ্গাপুর হয়ে কিছু ট্রাফিক ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই পথের ক্ষমতা সীমিত এবং খরচ অনেক বেশি। উপরন্তু অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস-এর মতো বড় সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক ব্যান্ডউইথের বড় অংশ ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, প্রশান্ত মহাসাগর ঘুরে বিকল্প রুট ব্যবহার করলে পথ অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়, ফলে ডেটা প্রসেসিংয়ে দেরির (latency) সমস্যা বাড়তে পারে এবং পরিষেবা ধীরগতির হয়ে পড়তে পারে।
কী এই সাবসি কেবল?
সাবসি বা সমুদ্রতলের কেবল হল ফাইবার-অপটিক কেবল, যা সমুদ্রের তলায় বসানো থাকে এবং বিশ্বের ৯৫ শতাংশেরও বেশি ইন্টারনেট ট্রাফিক বহন করে। আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড ডেটা, ইমেল থেকে শুরু করে স্ট্রিমিং পরিষেবা - সব কিছুই এই কেব্লের উপর নির্ভরশীল।
ভারতের মতো দেশে এই কেবলগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ - আইটি পরিষেবা, গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (GCC), আর্থিক লেনদেন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ভিত্তিই এগুলি। ফলে কোনও বিঘ্ন ঘটলে পেমেন্ট ব্যবস্থা থেকে ই-কমার্স সব ক্ষেত্রেই বড় প্রভাব পড়তে পারে।
শিল্পমহলের আশঙ্কা
সিফাই টেকনোলজিস-এর নেটওয়ার্ক ব্যবসার প্রধান হর্ষ রাম জানিয়েছেন, সরকার ইতিমধ্যেই সাবসি কেব্লের উপর নির্ভরতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে শিল্পমহলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।
তাঁর কথায়, “কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে আর্থিক লেনদেন, সোশ্যাল মিডিয়া, ই-কমার্স এবং আইটি পরিষেবায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে নেটওয়ার্কে বিকল্প ব্যবস্থা থাকায় পুরোপুরি ব্ল্যাকআউটের সম্ভাবনা কম।”
একটি সাবসি কেবল সংস্থার আধিকারিকের কথায়, সাধারণ সমস্যার জন্য কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতা রাখা থাকে ঠিকই, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না।
মেরামতেও বাধা, ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক
সংঘাতের জেরে সাবসি কেবল মেরামতের কাজও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মেরামতির জাহাজ কাজ বন্ধ রেখেছে, যার প্রভাব পড়ছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কে।
ভারতী এয়ারটেল-এর SEA-ME-WE 4 ও I-ME-WE কেবল, এবং ফ্ল্যাগ টেলিকম-এর FALCON নেটওয়ার্ক জেদ্দার কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এছাড়াও টাটা কমিউনিকেশনস-এর TGN-Gulf এবং এয়ারটেলের Africa Pearls সিস্টেমও ঝুঁকির মুখে। একই করিডর দিয়ে রিলায়েন্স জিও এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলির নতুন কেবল বসানোর কাজ চলছে। ফলে পরিকাঠামো সুরক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
ডেটা সেন্টার পরিকল্পনাতেও ধাক্কা?
দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে ভারতের প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও ধাক্কা খেতে পারে। কারণ এই শিল্প পুরোপুরি সাবসি কেব্লের উপর নির্ভরশীল।
আগামী দিনে মেটা প্ল্যাটফর্মস ও গুগল-এর মতো সংস্থার বড় প্রকল্প ভারতে আসার কথা - তাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
কূটনৈতিক উদ্যোগের পরামর্শ
এই পরিস্থিতিতে শিল্পমহল সরকারের কাছে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগ রেখে সাবসি পরিকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আর্জি জানিয়েছে।
তবে কিছুটা আশার খবরও রয়েছে, চলতি উত্তেজনার মাঝেও ভারতের দিকে আসা কিছু জাহাজকে হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের প্রভাব যে শুধুই সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ডিজিটাল জগতেও তার ছায়া পড়তে পারে - এই আশঙ্কাই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।