মেয়ের দেহ পেতে প্রশাসনিক কাজকর্মের প্রতিটি ধাপে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন তিনি।

ছবি - এআই
শেষ আপডেট: 30 October 2025 14:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একমাত্র মেয়ের মৃত্যুর পর শোকটুকু সামলানোর সময় পাননি হতভাগ্য বাবা (daughter's death)। মেয়ের দেহ পেতে প্রশাসনিক কাজকর্মের প্রতিটি ধাপে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন তিনি। সেই পোস্ট ভাইরাল (viral post) হতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। বেঙ্গালুরুর অবসরপ্রাপ্ত ওই কর্পোরেট কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা কাঁপিয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে।
ঘটনার সূত্রপাত বেঙ্গালুরুর কেএস শিবকুমার নামে এক ব্যক্তির পোস্ট থেকে। তিনি নিজেকে ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (BPCL)-এর প্রাক্তন চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার (CFO) হিসেবে পরিচয় দেন। লিঙ্কডইনে একটি দীর্ঘ পোস্টে তিনি জানান, তাঁর ৩৪ বছর বয়সি একমাত্র মেয়ে অক্ষয়া মারা যাওয়ার পর সরকারি নথিপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে কীভাবে একের পর এক দফতরে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
অক্ষয়া ছিলেন উচ্চশিক্ষিতা, চাকুরে - কম্পিউটার সায়েন্সে বি.টেক এবং আইআইএম আহমেদাবাদ থেকে এমবিএ ডিগ্রিও ছিল তাঁর। প্রায় ১১ বছর চাকরি করেছেন, যার মধ্যে আট বছর যুক্ত ছিলেন গোল্ডম্যান স্যাকসে। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, ব্রেন হেমারেজে হঠাৎই মৃত্যু হয় তাঁর।
পোস্টে বাবা শিবকুমার লেখেন, “সম্প্রতি আমার একমাত্র সন্তান মারা গিয়েছে, মাত্র ৩৪ বছর বয়সে। অ্যাম্বুল্যান্স, পুলিশ - এফআইআর বা পোস্টমর্টেম রিপোর্টের জন্য, শ্মশানে রসিদ পেতে, এমনকী বিবিএমপি অফিসে ডেথ সার্টিফিকেট হাতে পাওয়ার জন্য - প্রত্যেকেই খোলাখুলি ঘুষ চেয়েছে।”

ডিলিট হওয়ার আগের ওই লিঙ্কডইন পোস্ট, (পাশে) শিবকুমার
তিনি আরও লেখেন, পুলিশ স্টেশনে গিয়ে FIR ও পোস্টমর্টেম রিপোর্টের কপি পেতে তাঁকে নগদ টাকা দিতে হয়েছে।
“চার দিন পর পুলিশ কপির জন্য দেখা করল, সেখানেই খোলাখুলি নগদ টাকাই চাওয়া হল। আমি দিয়েছি। একমাত্র মেয়েকে হারানো বাবার প্রতি কোনও সহানুভূতিও নেই। আমার কাছে টাকা ছিল, তাই দিতে পেরেছি - কিন্তু গরিব মানুষ, যাঁদের সেই সামর্থ্য নেই, তাঁরা এই পরিস্থিতিতে পড়লে কী করতেন?”
শিবকুমার জানান, মেয়ের দেহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুল্যান্স চালকও ৩ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করে। তিনি লেখেন, “পুলিশের কি পরিবার নেই? যাঁরা শোকাহত, তাঁদের সঙ্গে এমন আচরণ করতে লজ্জা হয় না?”
বিবিএমপি অফিস থেকে মেয়ের ডেথ সার্টিফিকেট পেতে শিবকুমারকে পাঁচ দিন ধরে দফতরে দৌড়াতে হয়। তাঁকে জানানো হয়, কর্মীরা 'জাতি সমীক্ষা'য় ব্যস্ত, তাই কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত এক সিনিয়র আধিকারিকের হস্তক্ষেপে সার্টিফিকেট পান তিনি - তাও আবার সরকারি ফি-এর বেশি টাকা দিয়ে।
পোস্টের শেষে তিনি আক্ষেপ করে লেখেন, “নারায়ণ মূর্তি, আজিম প্রেমজি, কিরণ মজুমদার - এই শহরের বিলিয়নিয়াররা কি এমন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারেন না?”
এই পোস্ট ভাইরাল হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন নেটিজেনরা। বিষয়টি নজরে আসতেই বেঙ্গালুরুর হোয়াইটফিল্ড পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, “ঘটনার অভিযোগের ভিত্তিতে বেলান্দুর থানার এক সাব-ইনস্পেক্টর (PSI) ও এক কনস্টেবলকে অবিলম্বে সাসপেন্ড করা হয়েছে। কোনও অবস্থাতেই এই ধরনের অশোভন বা অনৈতিক আচরণ সহ্য করা হবে না।”
কিন্তু এই পোস্ট পরে ডিলিট করে দেওয়া হয়।
— DCP Whitefield Bengaluru (@dcpwhitefield) October 30, 2025
বিজেপির রাজ্য সহ-সভাপতি মালবিকা অয়নাশও শিবকুমারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রথমেই আমি শিবকুমারজির প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। তিনি কেবল ব্যক্তিগত শোকে জর্জরিত, তাই নয়, পাশাপাশি প্রশাসনিক উদাসীনতার শিকারও হয়েছেন।”
তিনি কংগ্রেস সরকারকে দায়ী করে বলেন, “গত দু’বছর ধরে কর্নাটকে কংগ্রেস ক্ষমতায়। তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুত ‘ফ্রি স্কিম’গুলো পূরণ করতে ব্যর্থ, আর প্রশাসনিক যন্ত্রও প্রায় বিকল। দেখুন, বিবিএমপি কীভাবে এক শোকাহত বাবাকে হয়রানি করেছে, যখন তিনি শুধু মেয়ের শেষকৃত্য করতে চেয়েছিলেন।”
মালবিকা আরও প্রশ্ন তোলেন, “উন্নয়ন মন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রী ডি.কে. শিবকুমার এখন ব্যাখ্যা দিন - কেন এমন ঘটল? কেন এই উদাসীনতা? কেন একজন নাগরিককে এমন কষ্ট পেতে হচ্ছে? আর সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, কে তাঁকে পোস্টটি মুছে ফেলতে বলেছে?”
কেএস শিবকুমারের এই লেখা মুছে ফেলা হলেও, তাঁর যন্ত্রণা দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। কর্পোরেট দুনিয়ার এক প্রাক্তন কর্মকর্তা যেভাবে নগর প্রশাসনের দুর্নীতি ও মানবিক শূন্যতা তুলে ধরেছেন, তা শুধু বেঙ্গালুরু নয়, সমগ্র দেশের জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার মুহূর্ত।