মাধ্যমিক পাশ বেকারদের (Jobless) জন্য দিনপ্রতি ৫০ টাকা, শোনাতে জনমুখী হলেও, এই সিদ্ধান্ত আদৌ কি স্কুলছুটের স্রোত আটকাতে পারবে, না কি উল্টে সেই প্রবণতাকেই প্রশ্রয় দেবে, তা নিয়ে সংশয় ক্রমশ জোরালো হচ্ছে (Yuba Saathi)।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 6 February 2026 15:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত বেকার যুবকদের মাসিক ১,৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার কথা বলেছে রাজ্য সরকার (State Government)। বাজেটের এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আপাতত রাজ্য রাজনীতিতে আশার আলো যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনই উঠছে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন। মাধ্যমিক পাশ (Madhyamik Pass) বেকারদের (Jobless) জন্য দিনপ্রতি ৫০ টাকা, শোনাতে জনমুখী হলেও, এই সিদ্ধান্ত আদৌ কি স্কুলছুটের স্রোত আটকাতে পারবে, না কি উল্টে সেই প্রবণতাকেই প্রশ্রয় দেবে, তা নিয়ে সংশয় ক্রমশ জোরালো হচ্ছে (Yuba Saathi)।
পরিসংখ্যানই এই সংশয়ের প্রথম ইঙ্গিত দিচ্ছে। মধ্যশিক্ষা পর্ষদের দেওয়া তথ্য বলছে, নবম শ্রেণিতে নাম নথিভুক্ত করা পড়ুয়ার সংখ্যা আর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে ফারাক ক্রমেই বাড়ছে। নবম শ্রেণিতে যেখানে প্রায় ১০ লক্ষ ৭৯ হাজার পড়ুয়া রেজিস্ট্রেশন করেছিল, সেখানে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসছে প্রায় এক লক্ষ কম। অর্থাৎ নবম শ্রেণির পরেই লক্ষাধিক পড়ুয়া শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে যাচ্ছে। এই ছবিটা শুধু মাধ্যমিকেই নয়, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও একই রকম। মাধ্যমিক পাশ করা ছাত্রছাত্রীর তুলনায় উচ্চ মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা আরও প্রায় দেড় লক্ষ কম। স্কুলশিক্ষার প্রতিটি ধাপে এই ‘লিকেজ’ চোখে পড়ার মতো।
প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকে মিড-ডে মিল বহু পড়ুয়াকে স্কুলমুখী করে রেখেছিল, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু নবম শ্রেণিতে পা দিতেই সেই সুবিধা বন্ধ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক-শিক্ষিকার দীর্ঘদিনের ঘাটতি। যার ফলে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, পড়াশোনার প্রতি অনীহা এবং শেষ পর্যন্ত স্কুলছুট— একটা গোটা বৃত্ত। এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, মাসিক ১,৫০০ টাকার ভাতা কি স্কুলে ফেরার প্রেরণা জোগাবে, না কি পড়াশোনা ছেড়ে ‘অপেক্ষমান বেকার’-এর তালিকায় নাম লেখানোকে আরও সহজ করে তুলবে?
ভাষাবিদ পবিত্র সরকার (Pabitra Sarkar) এই প্রকল্পের সময় নির্বাচনকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ভোটের আগে নয়, ভোটের পরে এই ঘোষণা এলে সেটিকে নিছক জনমুখী নীতিগত সিদ্ধান্ত বলা যেত। কারণ, যখন শিক্ষাব্যবস্থা নিজেই নিয়োগ দুর্নীতি, শিক্ষক-সংকট এবং অনিশ্চয়তায় জর্জরিত, তখন স্কুলে ফিরলেই বা ভবিষ্যৎ কোথায়, এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। অর্থনৈতিক সহায়তা তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কাঠামোগত সংকট না মেটালে তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বলেই তাঁর মত।
অন্য দিকে, কবি-সাহিত্যিক সুবোধ সরকার (Subodh Sarkar) দেখছেন বিষয়টির মানবিক দিকটি। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের (Employment Exchange) দীর্ঘ লাইন, অনিশ্চিত অপেক্ষার স্মৃতি টেনে তিনি মনে করছেন, চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত ন্যূনতম সহায়তা দেওয়া অন্যায় নয়। তাঁর মতে, এই ভাতা অন্তত বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কিছুটা সহায়ক হবে।
সরোজিনী কলেজের অধ্যাপক আজিজুল বিশ্বাস এই প্রকল্পকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখছেন। তাঁর কথায়, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের ধারণার সঙ্গেই এই প্রকল্পের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনও ভাবনা নয়, বরং পুরনো ব্যবস্থারই এক আধুনিক সম্প্রসারণ। অধ্যাপকের কথায়, "জনমুখী প্রকল্পে এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বরাবরই ছিল। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্প তার উদাহরণ।" সেই ধারাবাহিকতায় যুবসাথীও প্রশংসনীয় বলেই মনে করেন তিনি। সঙ্গে তিনি এও জানান, "এই প্রকল্প বিশেষ করে সমাজের প্রান্তিক অংশ, যাঁরা চাকরি বা কর্মপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের পাশে থাকার একটি স্পষ্ট বার্তাও দেয়।"
স্কুলছুট প্রসঙ্গে আজিজুলবাবুর বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, জনগণনা না হওয়ায় প্রকৃত চিত্র এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন সমীক্ষা ও সার্ভের ভিত্তিতে বলা যায়, আগের তুলনায় স্কুলছুটের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ভাতার কারণে পড়ুয়ারা স্কুল ছেড়ে দেবে— এমন সরল সমীকরণ টানা ঠিক নয়। বরং যাঁরা ইতিমধ্যেই কাজের সন্ধানে লড়াই করছেন, তাঁদের জন্য এই ভাতা কিছুটা হলেও সুরাহা দিতে পারে।