ভোটের আগে কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব, এই দুই শব্দ পাশাপাশি চলে। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই রাজ্যের যুবসমাজের জন্য নতুন আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের ঘোষণা করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 5 February 2026 22:40
ভোটের মুখে রাজ্য বাজেট (State Govt) মানেই জনমুখী ঘোষণার ঝাঁপি। এ কথা নতুন নয়। এ বার সেই ঝাঁপির মধ্যেই নতুন ঘোষণা মাধ্যমিক পাশ (Madhyamik) করা বেকারদের (Jobless) হাতে দিনে ৫০ টাকা, অর্থাৎ মাসে ১,৫০০ টাকা ভাতা। প্রশ্ন হল, ভোটমুখী বাংলার (West Bengal Budget) বাস্তবতায় এই ঘোষণা কতটা আশাব্যঞ্জক? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কর্মসংস্থানের কথা না বলে ভাতা দিয়েই কি বেকারত্বের সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব? (State Budget 2026)
ভোটের আগে কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব, এই দুই শব্দ পাশাপাশি চলে। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই রাজ্যের যুবসমাজের জন্য নতুন আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের ঘোষণা করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ‘যুবশ্রী’-র আদলে তৈরি এই নতুন প্রকল্পের নাম ‘বাংলার যুবসাথী’। লক্ষ্য একটাই, মাধ্যমিক পাশ করেও যাঁরা কাজ পাচ্ছেন না, তাঁদের হাতে অন্তত ন্যূনতম সহায়তা তুলে দেওয়া।
বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বাজেট পেশ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানান, এই প্রকল্পে মাসে মাসে ১,৫০০ টাকা, অর্থাৎ দিনপ্রতি ৫০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন মাধ্যমিক পাশ বেকাররা। রাজ্য সরকারের দাবি, চাকরির সন্ধানে থাকা যুবসমাজকে আর্থিক দিক থেকে সামান্য হলেও ভরসা দিতেই এই উদ্যোগ।
বাজেট অনুযায়ী, মাধ্যমিক পাশ করা পশ্চিমবঙ্গের যুবক-যুবতীরা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন। বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। ২০২৬ সালের ১৫ অগস্ট থেকে এই প্রকল্প কার্যকর হবে। একটানা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত এই ভাতা পাওয়া যাবে। তবে এই সময়ের মধ্যে কেউ চাকরি পেয়ে গেলে, স্বাভাবিক ভাবেই প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, উচ্চশিক্ষার জন্য যাঁরা রাজ্য সরকার বা অন্য কোনও সংস্থার স্কলারশিপ পান, তাঁরাও এই প্রকল্পের বাইরে থাকবেন না। অর্থাৎ পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ না পাওয়া যুবক-যুবতীদের জন্যও এই ভাতা চালু থাকবে। রাজ্য বাজেটে জানানো হয়েছে, ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষে এই প্রকল্পের জন্য ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে বড় অঙ্ক।
এই নতুন ঘোষণার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্যও কম নয়। বর্তমানে রাজ্যে ‘যুবশ্রী’ প্রকল্প চালু রয়েছে, যেখানে অষ্টম শ্রেণি পাশ করে এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম নথিভুক্ত করলে মাসে ১,৫০০ টাকা ভাতা পাওয়া যায়। তবে সেই প্রকল্পে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ৪৫ বছর এবং নিয়মের কড়াকড়িও তুলনামূলক বেশি। নতুন ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পে লক্ষ্য আরও নির্দিষ্ট, মাধ্যমিক পাশ করা বেকার যুবসমাজ।
প্রশ্ন উঠছেই, দিনপ্রতি ৫০ টাকা কি সত্যিই বেকারত্বের যন্ত্রণায় থাকা যুবকদের জন্য যথেষ্ট? সরকার বলছে, এটি কোনও স্থায়ী সমাধান নয়, বরং চাকরির খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার পথে সাময়িক সহায়তা। সমালোচকেরা বলছেন, ভাতা নয়, চাকরিই আসল চাহিদা। তবু বাস্তব রাজনীতিতে এই প্রকল্প যে ভোটের আগে যুবসমাজের মন পেতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্প রাজ্যের বেকারত্ব সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান না হলেও, অন্তত একটি বার্তা স্পষ্ট, যুবসমাজকে আর একেবারে উপেক্ষা করতে চাইছে না নবান্ন। এখন দেখার, এই ঘোষণার বাস্তব রূপ কতটা দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছ ভাবে মাটিতে নামানো যায়।
এক দিকে দেখতে গেলে, এই ঘোষণায় নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির ছোঁয়া আছে। রাজ্যের বহু যুবক-যুবতী মাধ্যমিক পাশ করেও বছরের পর বছর কাজের সন্ধানে ঘুরছেন। তাঁদের হাতে কোনও রকম নিয়মিত আয় নেই। সেই জায়গা থেকে মাসে ১,৫০০ টাকা, চা-খরচ, যাতায়াত, ফর্ম ফিলাপ, ইন্টারনেট— এই ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে কিছুটা সহায়তা দিতে পারে। রাজ্যের যুক্তিও সেখানেই। চাকরির খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার সময় অন্তত পুরোপুরি অসহায় যেন না থাকতে হয়। যদিও এ বিষয়ে বিরোধীরা খোঁচা দিয়ে জানাচ্ছে, বেকারদের হাতে দিনপ্রতি ৫০ টাকা করে ধরিয়ে দিলেও চিঁড়ে ভিজবে না।
কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় এখানেই। বিশ্লেষকরা বলাবলি করছেন, দিনপ্রতি ৫০ টাকা আসলে কীসের প্রতীক? সহানুভূতির, না কি অসহায়তার স্বীকৃতি? এই ভাতা কোনও ভাবেই জীবিকা নয়, জীবনধারণও নয়। এটি বড়জোর ‘বাঁচিয়ে রাখার’ ব্যবস্থা। ফলে প্রশ্ন ওঠে, রাজ্য কি কার্যত মেনে নিচ্ছে যে আপাতত এই বিপুল সংখ্যক যুবকের জন্য চাকরি নেই, তাই ভাতা দিয়েই পরিস্থিতি সামলানো হবে?
আবার অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে ভোটমুখী বাংলার রাজনীতিতে এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যুবসমাজই সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে অস্থির ভোটব্যাঙ্ক। কাজ নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, এই ক্ষোভ রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। সেই ক্ষোভকে কিছুটা প্রশমিত করতেই ভাতার এই কৌশল হতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই নীতি কতটা স্বাস্থ্যকর? ভাতা নির্ভরতা তৈরি করে, দক্ষতা নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে কর্মসংস্থান তৈরি না হলে যুবসমাজ ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকবে মাসিক সাহায্যের জন্য। এতে আত্মনির্ভরতার বদলে নির্ভরশীলতা বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আর্থিক সহায়তা সামাজিক সুরক্ষার অঙ্গ হতে পারে, কিন্তু তা যদি কর্মসংস্থানের বিকল্প হয়ে ওঠে, তা হলে সমস্যা আরও গভীরে যায়।
আরও একটি প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই ভাতা কি বেকারত্ব কমাবে, না কি বেকারের সংখ্যা নথিভুক্ত করবে? প্রকল্পের আওতায় নাম নথিভুক্ত হলে রাজ্য জানবে, কত জন বেকার। প্রশাসনিক ভাবে তা সুবিধাজনক। কিন্তু কাজের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি না হলে সেই সংখ্যার বাস্তব পরিবর্তন হবে না।
সব মিলিয়ে বলা যেতে পারে, দিনপ্রতি ৫০ টাকার ঘোষণা ভোটের আগে রাজনৈতিকভাবে চতুর, মানসিকভাবে একরকম বরাভয় হলেও অর্থনৈতিক ভাবে সীমিত। অর্থাৎ,'বাংলার যুবসাথী' বেকারত্ব সমস্যার সমাধান তো নয়ই, বরং সমস্যাকে সাময়িকভাবে প্রশমিত করার চেষ্টা মাত্র।