ভোটের আগে বাংলার বাজেট মানেই অঙ্কের চেয়ে রাজনীতির হিসাব বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠা। কে কত টাকা পেল, তার থেকেও বড় প্রশ্ন, কোন ভোটব্যাঙ্ককে ছোঁয়া হল, আর কাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করা হল।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 6 February 2026 11:39
ভোটের আগে বাংলার বাজেট মানেই অঙ্কের চেয়ে রাজনীতির হিসাব বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠা। কে কত টাকা পেল, তার থেকেও বড় প্রশ্ন, কোন ভোটব্যাঙ্ককে ছোঁয়া হল, আর কাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করা হল। সদ্য ঘোষিত ‘বাংলার যুবসাথী’ (Yuba Saathi) প্রকল্পকে সেই দৃষ্টিতেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। কারণ এই প্রকল্প শুধু একটি ভাতা প্রকল্প নয়, বরং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-নির্ভর (Lakshmir Bhandar) জনমুখী প্রকল্পের মধ্যেই নতুন করে যুব ভোটব্যাঙ্ককে যুক্ত করার কৌশল।
রাজ্য বাজেট অনুযায়ী, মাধ্যমিক পাশ করা পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal Budget) যুবক–যুবতীরা ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে দিনপ্রতি ৫০ টাকা, অর্থাৎ মাসে ১,৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ২০২৬ সালের ১৫ অগস্ট থেকে কার্যকর হবে এই প্রকল্প। সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত এই সুবিধা মিলবে, তবে তার আগেই চাকরি পেলে ভাতা বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি ভাষায় এটি বেকার যুবসমাজের জন্য সাময়িক সহায়তা কিংবা বলা যেতে পারে রাজনৈতিক ভাষায়, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে একটি আশ্বাস।
এখানেই তুলনা চলে আসে রাজ্যের (West Bengal News) সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর সঙ্গে। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি মহিলাদের জন্য এই প্রকল্পে সাধারণ শ্রেণিভুক্তরা মাসে ১,০০০ টাকা এবং তফসিলি জাতি–জনজাতিভুক্তরা ১,২০০ টাকা করে পান। অর্থাৎ বছরে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার ৪০০ টাকা। সদ্য ঘোষিত রাজ্য বাজেটে আরও ৫০০ টাকা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। সে দিক থেকে যোগ্যতার শর্ত কঠোর হলেও প্রকল্পটির সামাজিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। তার উপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ২৫ বছর থেকে আজীবন পাওয়ার পথেই এগোচ্ছে।
এই প্রেক্ষিতেই প্রশ্ন উঠছে—মেয়েরা কোন দিকে ঝুঁকবে? এক দিকে ২১ বছর থেকেই যুবসাথীতে ১,৫০০ টাকা, অন্য দিকে ২৫ বছরের পর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা। আপাত দৃষ্টিতে দ্বন্দ্ব থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই প্রকল্প আসলে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।
হিসেবটা খুব সরল। ২১ বছর বয়সে যে যুবতী যুবসাথীর জন্য আবেদন করবেন, তিনি জানেন এই ভাতা পাঁচ বছরের বেশি নয়। অর্থাৎ ২৬ বছর বয়সে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ। তার পরেই নিয়ম মাফিক লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দরজা খোলা। ফলে যুবসাথী হয়ে উঠছে এক ধরনের ‘ট্রানজিট স্কিম’। সহজ করে বললে, কন্যাশ্রী থেকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাঝখানের ফাঁকটা ভরাট করার ব্যবস্থা।
তবে বাস্তব ছবিটা একরৈখিক নয়। অনেকেই ভাববেন এত কাগজপত্র, বয়সসীমা, শর্ত মানার ঝামেলা না করে সরাসরি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জন্য আবেদন করাই ভাল। বিশেষ করে যাঁদের বয়স ২৫ ছুঁইছুঁই, তাঁদের কাছে যুবসাথীর আকর্ষণ তুলনামূলক কম হতে পারে। ফলে এই প্রকল্প সর্বজনগ্রাহ্য না হয়ে নির্দিষ্ট বয়সের যুবসমাজেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনাও থাকছে।
তা হলে প্রশ্ন, এত কিছু জেনেও কেন যুবসাথী প্রকল্প? এখানেই রাজনীতির আসল চাল। এত দিন রাজ্যের জনমুখী প্রকল্প মানেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী-কেন্দ্রিক। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। তার ফল মিলেছে ভোট বাক্সেও। কিন্তু ভোটমুখী বাজেটে পুরুষ বা ছেলেদের ভোটব্যাঙ্ক পুরোপুরি উপেক্ষা করা ঝুঁকির। ‘যুবসাথী প্রকল্প’ সেই শূন্যস্থানেই আঘাত করেছে। নামকরণই তার প্রমাণ। ‘যুবসাথী’, অর্থাৎ যুবসমাজের পাশে থাকার বার্তা।
অর্থনীতির দৃষ্টিতে দিনপ্রতি ৫০ টাকা কোনও সমাধান নয়। কর্মসংস্থানের বিকল্পও নয়। কিন্তু রাজনীতির দৃষ্টিতে এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে, রাজ্য সরকার অন্তত বেকার যুবকদের কথা ভাবছে, তাদের হাতে কিছু তুলে দিতে চাইছে। ভোটের অঙ্কে এই স্বীকৃতিটাই অনেক সময় টাকার অঙ্কের থেকেও বেশি মূল্যবান।
সব মিলিয়ে, এটুকু বলা যায়, যুবসাথী প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তারই সম্প্রসারিত ছায়া। এক দিকে নারী ভোটব্যাঙ্কের অটুট বন্ধন, অন্য দিকে যুব ভোটে ঢিল ছোড়া— এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটমুখী সামাজিক প্রকল্পের রাজনীতি।