অনেকেই মুকুল রায়ের স্মৃতিচারণা করেছেন। এরই মধ্যে রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষের (Dilip Ghosh) কথা কারও কারও কানে বেজেছে।

দিলীপ ঘোষ ও মুকুল রায়
শেষ আপডেট: 23 February 2026 14:54
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সঙ্কটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মুকুল রায় (Mukul Roy)। বাকি মস্তিষ্ক বা শরীর কোনওটাই ঠিকমতো সাড়া দিচ্ছিল না। দেহে প্রাণটুকু শুধু ছিল। রবিবার মধ্যরাতে সেটুকুও বেরিয়ে যায় তাঁর শরীর থেকে।
গত দু’দশকের বাংলার রাজনীতির ইতিহাস মুকুল রায় (Mukul Roy Death) ছাড়া অসম্পূর্ণ। এদিন তাঁর মৃত্যুর পর তাই খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মুকুল রায়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee), নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সহ বহু নেতা ও নেত্রী। অনেকে স্মৃতিচারণাও করেছেন। এরই মধ্যে রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষের (Dilip Ghosh) কথা কারও কারও কানে বেজেছে।
দিলীপ ঘোষ এদিন বলেন, “বাংলার রাজনীতিতে মুকুল রায় খুবই চর্চিত ছিলেন। তৃণমূলকে দাঁড় করানোর জন্য তাঁর বিরাট বড় যোগদান আছে। বিজেপিতেও উনি সার্ভিস দিয়েছেন। এক জন বড় রাজনীতিক চলে গেছেন, খুব কষ্ট পেয়েছেন অনেক দিন ধরে...।”
‘বিজেপিতে উনি সার্ভিস দিয়েছেন—’ কথাটাই অনেকের কাজে বেজেছে। কারণ, তাঁরা মনে করেন, বাংলায় বিজেপিকে বড় জয়ের পথ দেখানোর অন্যতম কারিগর ছিলেন মুকুল রায়। তাঁর ক্ষুরধার রাজনৈতিক বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার কারণেই উনিশের লোকসভা ভোটে বাংলায় ১৮টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। এবং সেটাই ছিল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের মাইলফলক। যে ভিতের উপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী কালে বিজেপি আরও বড় হয়েছে এবং ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে ৭৭টি আসনে জিতেছিল।

'জিনকে কনভেনার রহেতে ভারতীয় জনতা পার্টি ৪২ মে সে ১৮ সিট প্রাপ্ত করা, অ্যায়সে হামারে মুকুল রায় জি'
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ-র (Amit Shah) একটি মন্তব্য এ প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। উনিশের লোকসভা ভোটে বড় সাফল্যের পর ২০২০ সালের মার্চ মাসে কলকাতার শহিদ মিনারে একটি সভা করেছিল বিজেপি। সেই মঞ্চে বক্তৃতা দিতে উঠে দিলীপ ঘোষকে জননায়ক বলে সম্মোধন করেছিলেন অমিত শাহ। তার পর মুকুল রায় প্রসঙ্গে বলেন, “লোকসভা ভোটের সময়ে যে মানুষটি আহ্বায়ক পদে থাকায় ভারতীয় জনতা পার্টি ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসন জিতে নিয়েছে, সেই মানুষটি—আমাদের মুকুল রায়... (জিনকে কনভেনার রহেতে ভারতীয় জনতা পার্টি ৪২ মে সে ১৮ সিট প্রাপ্ত করা, অ্যায়সে হামারে মুকুল রায় জি)।”
২০১৭ সালের অক্টোবর মাস নাগাদ মুকুল রায় যখন বিজেপিতে যোগ দেন, তখন দিলীপ ঘোষ ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। দিলীপ যে মুকুল রায়কে ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করতেন তা নয়। তবে অমিত শাহর সঙ্গে মুকুল রায়ের সখ্য ছিল অসাধারণ। এবং অমিত শাহর সুপারিশেই সর্বভারতীয় বিজেপিতে সহ-সভাপতি হয়েছিলেন মুকুল রায়। উনিশের লোকসভা ভোটে মুকুল রায়ের কৌশলের উপর বড় রকমের ভরসা করেছিলেন অমিত শাহ।
সৌমিত্র খাঁকে তৃণমূল থেকে নিয়ে এসে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর লোকসভা আসন থেকে জেতানো, নিশীথ প্রামাণিককে বিজেপিতে নিয়ে এসে কোচবিহারে প্রার্থী করা, খগেন মুর্মুকে সিপিএম থেকে নিয়ে এসে মালদহ উত্তর আসনে প্রার্থী করা—এ সবের নেপথ্যে ছিলেন মুকুল। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সমন্বয় রাখা, সেই অনুযায়ী ঘুঁটি সাজানো সবটাই তিনি করতেন এলগিন রোডে একটি বহুতল আবাসনের ফ্ল্যাটে বসে। স্বপন দাশগুপ্তর মতো বিজেপি নেতারা তা ভাল করেই জানতেন।
বস্তুত রাজ্য বিজেপিতে দিলীপ ঘোষের জমানাতেই মুকুল রায় ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। একুশের নির্বাচনের আগে শিবপ্রকাশ-দিলীপ ঘোষ জুটি মুকুলকে কোনওভাবেই জায়গা দিতে রাজি ছিলেন না। দলের কৌশল নির্ধারণের বৈঠকেও ডাকা হত না। তখন কোভিডের সময়ে। সল্টলেকে একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাটে ঘনিষ্ঠ নেতা কর্মী পরিবৃত থেকেও মুকুল তখন থেকেই নিঃসঙ্গ বোধ করতেন। বাংলার রাজনীতিতে চাণক্য বলে পরিচিত ছিলেন মুকুল। সেই নেতাকে একুশের ভোটে স্রেফ কৃষ্ণনগর উত্তরের প্রার্থীতে পরিণত করেন তৎকালীন রাজ্য বিজেপির ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী। রাজ্য রাজনীতিতে সেই থেকেই প্রাসঙ্গিকতা হারানো শুরু হয় মুকুলের। তার পর ক্রমশ হারিয়ে যান তিনি। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভুলে যান সব। অমিত শাহ, দিলীপ ঘোষ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—শেষ কয়েক মাসে হয়তো তাঁর স্মৃতিতেও আর ছিল না। কিন্তু ইতিহাস তো মোছার নয়। বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল ও বিজেপি দুই দলেই বড় অবদানের ইতিহাস রয়ে গেল মুকুলের।